স্বাগত ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পহেলা বৈশাখের উৎসব ও ঐক্যের সন্ধান

মো. আবদুল মান্নান
  প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০১:০৭| আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০১:১৭
অ- অ+

স্বাগত ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। আজ বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন।

বাংলা নববর্ষ, পহেলা বৈশাখ শুধু একটি দিন নয়; এটি একটি চেতনা, একটি সামষ্টিক স্মৃতি, একটি সাংস্কৃতিক পুনর্জন্মের মুহূর্ত। প্রতিবছর বৈশাখের প্রথম প্রহরে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালির জীবনেও যেন নতুন আলোর সূচনা ঘটে। পুরোনো হিসাব-নিকাশ, ব্যর্থতা ও বেদনা পেছনে ফেলে নতুন আশার দিগন্তে যাত্রা করার নামই পহেলা বৈশাখ।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই উৎসবের চেহারা বদলেছেকখনো প্রসারিত হয়েছে, কখনো বিতর্কিত হয়েছে, আবার কখনো আত্মসমালোচনার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। একজন সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতায় যেমন দেখা যায়- শৈশবের সরল আনন্দ থেকে কৈশোরের উচ্ছলতা, তারপর প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের সংশয় ও সংযম, ঠিক তেমনই পহেলা বৈশাখও আমাদের সমাজের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।

অনেকের মতোই আমাদের সমাজের অসংখ্য মানুষের কাছে পহেলা বৈশাখের প্রথম পরিচয় এসেছে শৈশবের হাত ধরে। গ্রামের মেলা, রঙিন শরবতের দোকান, বন্ধুদের সঙ্গে ছোট ছোট আয়োজন- এসবই ছিল বৈশাখের মূল আনন্দ। এই সময়টাতে বৈশাখ মানেই ছিল: নিজ হাতে কিছু করা, বন্ধুদের সঙ্গে ভাগাভাগি আনন্দ, মেলার সরল বিনোদন, পরিবার ও সমাজের সঙ্গে সংযোগ। এখানে কোনো জটিলতা ছিল না, ছিল না সামাজিক বিভাজন বা অস্বস্তি। বরং এই উৎসব ছিল শিশুমনের মতোই স্বচ্ছ ও আনন্দময়। এই অভিজ্ঞতাই আমাদের শেখায়- পহেলা বৈশাখের আসল শক্তি নিহিত রয়েছে তার সরলতায়।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বৈশাখের অভিজ্ঞতাও পাল্টাতে থাকে। কৈশোরে এসে উৎসবের আরেকটি রূপ সামনে আসে, যেখানে আনন্দের পাশাপাশি দেখা দেয় অস্থিরতা, বেপরোয়া আচরণ, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে নৈতিক অবক্ষয়ও। মেলায় গিয়ে দেখা যায়: ভিড়ের মধ্যে অস্বস্তিকর আচরণ, জুয়ার আসর, ছোটখাটো সংঘর্ষ- এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বরং এটি আমাদের সমাজেরই প্রতিফলন, যেখানে নিয়ন্ত্রণহীন উল্লাস অনেক সময় সীমালঙ্ঘনে রূপ নেয়।

গ্রাম থেকে শহরে আসার পর অনেকের কাছে বৈশাখের চিত্র আরও জটিল হয়ে ওঠে। শহরের রাস্তায়, পার্কে, বিভিন্ন আয়োজনস্থলে ভিড়ের চাপে অনেক সময় উৎসবের সৌন্দর্য ম্লান হয়ে যায়। বিশেষ করে: নারীদের নিরাপত্তাহীনতা, কটূক্তি ও হয়রানি, অতিরিক্ত ভিড় ও বিশৃঙ্খলা, সাংস্কৃতিক আয়োজনের নামে অপ্রাসঙ্গিক প্রদর্শন। এসব অভিজ্ঞতা অনেক মানুষকে ধীরে ধীরে উৎসব থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ফলে প্রশ্ন জাগে- এই কি সেই বৈশাখ, যার জন্য আমরা অপেক্ষা করি?

পহেলা বৈশাখের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সাংস্কৃতিক প্রকাশ। এর মধ্যে অন্যতম হলো মঙ্গল শোভাযাত্রা- যা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে এবং বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। তবে এখানেও মতবিরোধ রয়েছে। কেউ একে সংস্কৃতির গর্ব বলে মনে করেন, আবার কেউ মনে করেন এটি ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই বিতর্ক নতুন নয়। বরং এটি আমাদের সমাজের বহুমাত্রিকতারই প্রমাণ। প্রশ্ন হলো- আমরা কি পারি না এমন একটি অবস্থানে দাঁড়াতে, যেখানে সংস্কৃতি ও ধর্ম পরস্পরের প্রতি সম্মান দেখায়, কেউ কারও ওপর নিজের মত চাপিয়ে দেয় না, বৈচিত্র্যের মধ্যেই ঐক্য খুঁজে পাওয়া যায়।

সমস্ত বিতর্ক, অভিজ্ঞতা ও পরিবর্তনের পরও পহেলা বৈশাখের গুরুত্ব অটুট। কারণ ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণিনির্বিশেষে সবাই একসঙ্গে এই দিনটি উদযাপন করে। এটি আমাদের জাতীয় পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হালখাতা, মেলা, লোকসংগীত, পান্তা-ইলিশ- সবই আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

নতুন বছর মানেই নতুন পরিকল্পনা, নতুন আশা, নতুন উদ্যম। পরিবার, বন্ধু, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক নবায়নের একটি উপলক্ষ। সমস্যা উৎসবে নয়, বরং আমাদের আচরণে। যখন আনন্দ উচ্ছৃঙ্খলতায় পরিণত হয়, স্বাধীনতা দায়িত্বহীনতায় রূপ নেয়, সংস্কৃতি প্রদর্শনে সীমা লঙ্ঘিত হয়, তখনই উৎসব তার সৌন্দর্য হারায়। পহেলা বৈশাখকে সুন্দর ও অর্থবহ রাখতে হলে কিছু বিষয় আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে-

নিজের আচরণ যেন অন্যের জন্য অস্বস্তির কারণ না হয়। অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করা, নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা। সবাই বাইরে না গিয়ে পরিবারকেন্দ্রিক আনন্দেও উৎসব পালন করতে পারে। সংস্কৃতি মানে শুধু বাহ্যিক আয়োজন নয়- এর ভেতরের মূল্যবোধও ধারণ করতে হবে। অনেকের মতোই কেউ কেউ এখন বৈশাখ উদযাপন করেন সীমিত পরিসরেপরিবারকে নতুন পোশাক দেওয়া, ঘরে ছোট আয়োজন, প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো। এটিও বৈশাখের একটি সুন্দর রূপ। কারণ উৎসবের আসল আনন্দ নির্ভর করে অনুভূতির ওপর, আয়োজনের আকারের ওপর নয়।

পহেলা বৈশাখ আমাদের শুধু আনন্দ দেয় না, এটি আমাদের সামনে একটি আয়নাও ধরে, যেখানে আমরা নিজেদের দেখি। আমরা কি অন্যকে সম্মান করতে শিখেছি? আমাদের সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে ধারণ করছি? স্বাধীনতাকে দায়িত্বের সঙ্গে ব্যবহার করছি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার মধ্যেই বৈশাখের প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত।

পহেলা বৈশাখকে ঘিরে মতভেদ যেন বিভাজনে না গড়ায়। বরং আমরা যদি পারি সীমার মধ্যে থেকে আনন্দ করতে, অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান করতে, সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে, তাহলেই বৈশাখ হয়ে উঠবে সত্যিকারের উৎসব, যেখানে আনন্দ থাকবে, কিন্তু অরাজকতা থাকবে না; স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু দায়িত্বহীনতা থাকবে না। আমরা আনন্দ করব, কিন্তু সীমা লঙ্ঘন করব না। উৎসব উদযাপন করব, কিন্তু মানবিকতা ভুলব না। সংস্কৃতি ধারণ করব, কিন্তু কাউকে আঘাত করব না।

নতুন বছর আমাদের সবার জীবনে শান্তি, সৌহার্দ্য ও সচেতনতার বার্তা বয়ে আনুক। শুভ নববর্ষ।

লেখক: সংবাদকর্মী।

(ঢাকাটাইমস/১৪এপ্রিল/মোআ)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
উত্তাল ভারত, দিল্লি অভিমুখে শত শত কৃষক
রোয়াংছড়িতে দেবতাখুম ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, মোট মৃত্যু ৭৯৭
বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রউফ সরকারের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা