হান্টাভাইরাসের ছোবলে প্রমোদতরী ‘এমভি হন্ডিয়াস’, জানুন কতটা ভয়াবহ এই সংক্রমণ

হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে আক্রান্ত প্রমোদতরী ‘এমভি হন্ডিয়াস’ এখন ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের দিকে এগোচ্ছে। জাহাজটিতে ভাইরাস সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে তিনজনের শরীরে হান্টাভাইরাস নিশ্চিত হয়েছে, যাদের মধ্যে একজন মারা গেছেন। আরও পাঁচজনকে সন্দেহভাজন আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
বর্তমানে ২৩টি দেশের মোট ১৪৬ জন যাত্রী ও নাবিক জাহাজটিতে অবস্থান করছেন। ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানোর পর সবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে। এরপর পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরার অনুমতি দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামারি বিশেষজ্ঞ ড. শার্লট হ্যামার বলেছেন, ইঁদুরজাত প্রাণী জাহাজে উঠে আসা অস্বাভাবিক নয় এবং এটিই সংক্রমণের একটি সম্ভাব্য উৎস হতে পারে। এছাড়া যাত্রীরা আর্জেন্টিনার কোনো বন্দরে অবস্থানের সময়ও সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারেন।
তবে মানুষ থেকে মানুষে ব্যাপক সংক্রমণের সম্ভাবনাকে তিনি “অত্যন্ত অসম্ভব” বলে মন্তব্য করেছেন।
এদিকে প্রিমিয়ার মেডিকেল গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ও চিকিৎসক ড. স্কট মিসকোভিচ জানিয়েছেন, সংক্রমণের প্রকৃত উৎস শনাক্ত করতে জাহাজের প্রতিটি কক্ষ, রান্নাঘর, ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা এবং ধূলিকণা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ভাইরাসটির জিনোম সিকোয়েন্সিংসহ বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলমান রয়েছে।
হান্টাভাইরাস মূলত একগুচ্ছ ভাইরাসের সমষ্টি, যা সাধারণত ইঁদুর ও ইঁদুরজাত প্রাণীর মাধ্যমে ছড়ায়। দক্ষিণ কোরিয়ার একটি নদীর নাম অনুসারে ভাইরাসটির নামকরণ করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, এ ধরনের ২০টিরও বেশি ভাইরাস রয়েছে এবং অধিকাংশই ইঁদুরজাত প্রাণীর সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ভাইরাসটি সাধারণত আক্রান্ত প্রাণীর শুকনো মল, প্রস্রাব বা লালার মাধ্যমে ছড়ায়। এসব বর্জ্য বাতাসে মিশে মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করলে সংক্রমণ ঘটতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি এখন ‘আন্দেস ভাইরাস’ নামের একটি বিরল ধরনকে ঘিরে, যা মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর কমিউনিকেবল ডিজিজেস জানিয়েছে, জাহাজ থেকে নামা দুই ব্যক্তির শরীরে এই অ্যান্ডেস ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।
আন্দেস ভাইরাস মূলত আর্জেন্টিনা ও চিলিতে বেশি দেখা যায়। ২০১৮ সালের শেষ দিকে আর্জেন্টিনায় এক পার্টিতে একজন আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে ৩৪ জন সংক্রমিত হন, যাদের মধ্যে ১১ জনের মৃত্যু হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ধারণা করছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে জাহাজে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। একইসঙ্গে ইঁদুরজাত প্রাণীর সংস্পর্শ থেকেও ভাইরাস বিস্তারের আশঙ্কা রয়েছে।
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে জাহাজে থাকা যাত্রীদের কেবিনে অবস্থান করতে বলা হয়েছে এবং কোভিড-১৯ সময়ের মতো সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
হান্টাভাইরাস সাধারণত ছড়ায় আক্রান্ত ইঁদুরজাত প্রাণীর মল, প্রস্রাব ও লালার সংস্পর্শে এলে। সরাসরি স্পর্শ ছাড়াও বাতাসে ভেসে থাকা সংক্রমিত ধূলিকণা শ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করলে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ইঁদুরের কামড় থেকেও সংক্রমণ হতে পারে, যদিও এমন ঘটনা তুলনামূলক বিরল। বদ্ধ ঘর পরিষ্কার করা, কৃষিকাজ, বনাঞ্চলে কাজ করা বা ইঁদুর উপদ্রুত এলাকায় বসবাসকারীদের ঝুঁকি বেশি।
হান্টাভাইরাস দুটি গুরুতর রোগ সৃষ্টি করতে পারে। এর একটি হলো হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম (এইচপিএস)। এতে প্রথমে জ্বর, ক্লান্তি ও পেশিতে ব্যথা দেখা দেয়। পরে শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, পেটের সমস্যা এবং গুরুতর শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত জটিলতা তৈরি হতে পারে। অ্যান্ডেস ধরনের এই রোগে মৃত্যুহার ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
অন্যদিকে হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম (এইচএফআরএস) কিডনি বিকল, নিম্ন রক্তচাপ ও অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বব্যাপী হান্টাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি এখনও তুলনামূলক কম এবং জাহাজের বাইরে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
(ঢাকাটাইমস/৯ মে/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































