বনপাড়ার জাহেদা ক্লিনিকে রোগীর পায়ে ড্রিলের ফলা রেখেই সেলাই! পা হারানোর শঙ্কা

নাটোরের বড়াইগ্রামের বনপাড়ায় জাহেদা ক্লিনিকে এক নারীর পায়ে অস্ত্রোপচারের সময় ব্যবহৃত ড্রিল মেশিনের একটি ভাঙা ফলা হাড়ের ভেতরে রেখেই ক্ষতস্থান সেলাই করার অভিযোগ উঠেছে। এক্স-রে প্রতিবেদনে ধাতব ফলাটি ধরা পড়লেও তা অপসারণের কোনো উদ্যোগ নেয়নি ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, দীর্ঘদিন অবহেলার কারণে ক্ষতস্থানে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে পচন ধরে মাংসে। পা বাঁচাতে ঢাকায় নিয়ে বড় অস্ত্রোপচার করতে হয়।
ভুক্তভোগী আনোয়ারা বেগম (৫৫) গুরুদাসপুর উপজেলার ধারাবারিষা ইউনিয়নের সিধুলী গ্রামের লাল চাঁন মোহাম্মদের স্ত্রী। গত ৩ জুন রাতে বনপাড়ার জাহেদা ক্লিনিকে তার বাম পায়ের গোড়ালির ওপরে অস্ত্রোপচার করেন গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অর্থোপেডিক্স বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. জাহিদুল ইসলাম। ক্লিনিকটি এই চিকিৎসকের মালিকানাধীন।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় আনোয়ারা বেগমের বাম পায়ের গোড়ালির হাড় ভেঙে গেলে তাকে প্রথমে গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক ডা. জাহিদুল ইসলাম অস্ত্রোপচারের জন্য নিজের ক্লিনিকে যাওয়ার পরামর্শ দেন। সেখানে প্রায় ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে অস্ত্রোপচার করা হয়।
কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর করা এক্স-রে রিপোর্টে হাড়ের ভেতরে ড্রিল মেশিনের ভাঙা ফলা রয়ে যাওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে।
ভুক্তভোগীর স্বামী লাল চাঁন মোহাম্মদ বলেন, অস্ত্রোপচারের কয়েক দিনের মধ্যেই ক্ষতস্থান থেকে পুঁজ বের হতে শুরু করে। প্রায় ২৫ দিন ধরে গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়মিত ড্রেসিং করানো হলেও অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি।
লাল চান অভিযোগ করেন, চিকিৎসকও পরবর্তী সময়ে চিকিৎসা দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। বাধ্য হয়ে তারা ঢাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য যান।
পরিবারের দাবি, ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ডা. নারায়ণ চন্দ্র এক্স-রে ও রোগীর অবস্থা দেখে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন এবং পা হারানোর আশঙ্কার কথা জানান। পরে তারা ঢাকার ট্রমা সেন্টারে ভর্তি করান।
ঢাকা ট্রমা সেন্টারের অর্থোপেডিক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ডা. আয়ুব আলী জানান, রোগীকে অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় সেখানে নেওয়া হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা যায়, অস্ত্রোপচারের সময় ব্যবহৃত ড্রিল মেশিনের একটি ভাঙা ফলা হাড়ের ভেতরে আটকে রয়েছে। এছাড়া হাড় জোড়া দিতে ব্যবহৃত প্লেটের স্ক্রুগুলোও সঠিকভাবে স্থাপন করা হয়নি। সংক্রমণ ছড়িয়ে মাংসের পচন হাড় পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত অংশের পচা মাংস অপসারণ করে শরীরের অন্য অংশ থেকে মাংস এনে প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। তবে হাড়ের গভীরে আটকে থাকা ড্রিলের ফলাটি অপসারণ করা সম্ভব হয়নি। কারণ সেটি বের করতে গেলে রোগীর পা কেটে ফেলতে হতে পারে। বর্তমানে ওষুধের মাধ্যমে সেটির প্রভাব কমানোর চেষ্টা চলছে। ২২ দিন নিবিড় চিকিৎসা দেওয়ার পর রোগীকে বাড়িতে পাঠানো হয়েছে।
ডা. আয়ুব আলীর ভাষ্য, প্রথম অস্ত্রোপচারটি সফল হয়নি। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছ থেকে এমন অপেশাদার চিকিৎসা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং রোগীর জন্য জীবনব্যাপী ঝুঁকি তৈরি করেছে। আর কয়েকদিন দেরি হলে রোগীর পা কেটে ফেলা ছাড়া বিকল্প থাকত না।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চিকিৎসক ডা. জাহিদুল ইসলাম মোবাইল ফোনে বলেন, অস্ত্রোপচারের সময় ড্রিল করার ক্ষেত্রে অনেক সময় ফলা ভেঙে হাড়ের মধ্যে আটকে যেতে পারে। আনোয়ারা বেগমের ক্ষেত্রেও এমনটি হয়েছে।
তার দাবি, এ কারণে রোগীর পা কেটে ফেলার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দিতে তিনি হাসপাতালে গিয়ে কথা বলার অনুরোধ জানান।
(ঢাকাটাইমস/২০ জুলাই/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































