ভারতজুড়ে জেনজি আন্দোলনের চাপে মোদি সরকার, সংহতি জানাচ্ছেন প্রবাসীরাও

অনলাইন ডেস্ক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৮:২২
অ- অ+

ভারতের রাজধানী দিল্লির গণ্ডি পেরিয়ে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ‘জেনজি আন্দোলন’। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং সরকারের জবাবদিহির প্রশ্নে বৃহত্তর গণআন্দোলনের রূপ নিয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হাজার হাজার শিক্ষার্থী, তরুণ এবং সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে আসায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত ভারতীয়রাও আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন হলেও এবারের আন্দোলনের ব্যাপ্তি ও চরিত্র ভিন্ন। এটি শুধু কোনো একটি শিক্ষা নীতি, পরীক্ষা বা মন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নয়; বরং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জমে থাকা দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। ফলে আন্দোলনটি এখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

আন্দোলনের শুরুতে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করা হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দাবির পরিধি বিস্তৃত হয়েছে। আন্দোলনকারীরা এখন শিক্ষা খাতে সংস্কার, সরকারি চাকরিতে স্বচ্ছতা, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি তুলছেন।

বিক্ষোভকারীদের ভাষ্য, শুধু একজন মন্ত্রীর পদত্যাগে সমস্যার সমাধান হবে না। তারা পুরো ব্যবস্থার সংস্কার এবং সরকারের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে চান। আন্দোলনের অন্যতম স্লোগান হয়ে উঠেছে—‘মন্ত্রী নয়, জবাবদিহি চাই’।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে শিক্ষিত তরুণদের সামনে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়নি। বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে অনিয়ম ও অনিশ্চয়তা রয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈষম্য ও প্রশাসনিক দুর্বলতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে ভারতের অনেক আন্দোলন ধর্মীয়, জাতিগত বা রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু এবারের আন্দোলনের মূল বিষয়গুলো হলো শিক্ষা, চাকরি, ভবিষ্যৎ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা—যা প্রায় সব শ্রেণি ও অঞ্চলের তরুণদের জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

এ কারণে আন্দোলনকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ বা সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং তরুণ পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী করে তুলেছে।

দিল্লির পাশাপাশি উত্তর প্রদেশের লখনৌ, বিহারের পাটনা, কর্ণাটকের বেঙ্গালুরু, তেলেঙ্গানার হায়দরাবাদ, গুজরাটের সুরাট এবং মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে ধারাবাহিকভাবে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি কার্যালয়ের সামনে এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অনেক জায়গায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাধারণ নাগরিক, শিক্ষক এবং বিভিন্ন পেশাজীবীও সংহতি প্রকাশ করছেন।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সরকারের কঠোর অবস্থান এবং পুলিশি বলপ্রয়োগ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে। তারা দাবি করছেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং অনেক স্থানে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে।

দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যেও। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের লন্ডনে ভারতীয় হাইকমিশনের সামনে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী ভারতীয় সমবেত হয়ে আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানান। একই ধরনের কর্মসূচি পালিত হয়েছে কানাডার ভ্যাঙ্কুভার, জার্মানির বার্লিন এবং নেদারল্যান্ডসে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সামনে।

আয়োজকদের দাবি, ভারতের তরুণদের ন্যায্য দাবির প্রতি আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করাই এসব কর্মসূচির উদ্দেশ্য। নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডেও একই ধরনের কর্মসূচির প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।

ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে আন্দোলন ঘিরে রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজতে উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। নরেন্দ্র মোদি সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধী দল এবং ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতাদের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

তবে এখন পর্যন্ত সেই উদ্যোগে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তাদের দাবিগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি তৈরি হওয়ায় দ্রুত সমাধান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

আন্দোলনের মধ্যে পুলিশের বলপ্রয়োগের অভিযোগ নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েছে দিল্লি হাইকোর্ট।

সংঘর্ষের ঘটনায় ব্যবহৃত সিসিটিভি ফুটেজ, পুলিশ সদস্যদের বডি ক্যামেরার ভিডিও এবং সংশ্লিষ্ট সব ধরনের ইলেকট্রনিক তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ।

আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছে, কোনো সমাবেশ বেআইনি হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবশ্যই আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে দিল্লি প্রশাসন ও পুলিশকে চার সপ্তাহের মধ্যে বিস্তারিত ব্যাখ্যা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এই নির্দেশকে আন্দোলনকারীরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের দাবি, আদালতের হস্তক্ষেপের ফলে পুলিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে স্বচ্ছ তদন্তের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, আন্দোলনকারীদের একটি অংশ সরকারি সম্পত্তি ও যানবাহনে হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপের অভিযোগও তুলেছে প্রশাসন।

তবে এসব অভিযোগের সমর্থনে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। এ কারণে বিরোধী দল ও মানবাধিকারকর্মীরা সরকারের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালনের সময় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এবং সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদবকে আটক করে পুলিশ।

সরকারের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত ওই কর্মসূচির পর বিরোধী দলগুলো সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগ তোলে। অন্যদিকে সরকার বলছে, নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে রাজধানী দিল্লির ১৬টি মেট্রো স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত হয়েছে এবং নগরজীবনে প্রভাব পড়েছে।

আন্দোলন, রাজনৈতিক অচলাবস্থা, আদালতের সক্রিয় ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা—সব মিলিয়ে ভারতের পরিস্থিতি এখন নতুন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলন শুধু একটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সংকট নয়; বরং দেশের তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা, হতাশা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের প্রতিফলন। সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ, বিরোধী দলগুলোর কৌশল এবং আন্দোলনকারীদের অবস্থানের ওপর নির্ভর করছে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে।

বর্তমানে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে এই ‘জেনজি আন্দোলন’। আর আন্দোলনের ব্যাপ্তি যেভাবে বাড়ছে, তাতে এটি আগামী দিনগুলোতে মোদি সরকারের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

(ঢাকাটাইমস/২৩ জুলাই/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
ঢাকাসহ দেশের ৪ বিভাগে ‘অতি ভারী’ বৃষ্টির পূর্বাভাস
তীব্র গ্যাস সংকট সারা দেশে, বিপর্যস্ত শিল্পকারখানা ও সিএনজি স্টেশন
মাদকের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় নেই, পুলিশও ছাড় পাবে না: খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি
বাবার দাফন শেষে রাতে চাকরি, সকালে পরীক্ষা; সেই ইকনের পড়াশোনার দায়িত্ব নিচ্ছেন শিক্ষামন্ত্রী
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা