রকেটের নাম কেন ‘নটি বয়’ দিয়েছে ভারত? জানুন অদ্ভুত নামের রহস্য

আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণায় ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য রকেট জিএসএলভি (জিওসিনক্রোনাস স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল)। দীর্ঘ সাফল্যের পথ পেরিয়ে আজ এটি ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির অন্যতম ভরসার বাহন। তবে এই শক্তিশালী রকেটের ইতিহাসে জড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত ডাকনাম—‘নটি বয়’ বা ‘দুষ্টু ছেলে’।
সম্প্রতি শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার থেকে জিএসএলভি-এফ১৭ রকেট সফলভাবে উৎক্ষেপণ করে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ইসরো)। রকেটটি ২ হাজার ৩৭৬ কেজি ওজনের সর্বাধুনিক ইওএস-০৫ উপগ্রহকে নির্ধারিত কক্ষপথে স্থাপন করে। এই সাফল্যের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে বহু বছরের পুরোনো ‘নটি বয়’ ডাকনামটি।
জিএসএলভি রকেটের সাফল্যের পথ সবসময় মসৃণ ছিল না। এ শ্রেণির রকেটের ১৯টি অভিযানের মধ্যে ছয়টি ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে ক্রায়োজেনিক থার্ড স্টেজ বা উচ্চতর স্তরের জটিল প্রযুক্তি নিয়ে একাধিকবার সমস্যায় পড়তে হয়েছে ইসরোকে।
২০১০ সালের এপ্রিলে জিস্যাট-৪ এবং ২০২১ সালের আগস্টে ইওএস-০৩ মিশন ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিনের ত্রুটির কারণে ব্যর্থ হয়। বারবার শেষ মুহূর্তে মিশন ভেস্তে যাওয়ায় বিজ্ঞানীদের কাছে জিএসএলভি হয়ে ওঠে এমন এক রকেট, যা সহজে ‘কথা শোনে না’।
অন্যদিকে একই সময়ে ভারতের পিএসএলভি শ্রেণির রকেট একের পর এক সফল মিশন পরিচালনা করছিল। ফলে জিএসএলভির অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে ভালোবাসা, রসিকতা ও কিছুটা আক্ষেপ থেকেই রকেটটির নাম দেওয়া হয় ‘নটি বয়’—অর্থাৎ ‘দুষ্টু ছেলে’।
ভারতের মহাকাশ কর্মসূচিতে জিএসএলভির গুরুত্ব অনেক বেশি। ভারী উপগ্রহকে পৃথিবীর প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার ওপরের জিওসিনক্রোনাস কক্ষপথে পাঠাতে এ ধরনের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন রকেট প্রয়োজন।
এ কাজে ব্যবহৃত ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিনে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় তরল হাইড্রোজেন ও তরল অক্সিজেন জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। প্রযুক্তিটি অত্যন্ত জটিল এবং এর উন্নয়ন ও পরিচালনা বড় ধরনের প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।
১৯৯০-এর দশকে ভূরাজনৈতিক চাপের মধ্যে রাশিয়া ভারতকে ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিনের পূর্ণ প্রযুক্তি হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর ইসরো নিজস্ব প্রযুক্তিতে এই ইঞ্জিন তৈরির দীর্ঘ ও কঠিন পথ বেছে নেয়।
প্রায় দুই দশকের গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ব্যর্থতার পর ভারত এই প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করে। এর মাধ্যমে জিএসএলভি ভারতের ভারী উপগ্রহ উৎক্ষেপণের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিশ্ব মহাকাশ গবেষণায় দেশটির অবস্থানও শক্তিশালী করে।
জিএসএলভি-এফ১৭-এর সফল উৎক্ষেপণ ভারতের মহাকাশ কর্মসূচিতে নতুন আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে। বিশেষ করে ২০২৫ ও ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পিএসএলভির টানা দুটি ব্যর্থতার পর মহাকাশ কর্মসূচি নিয়ে যে চাপ তৈরি হয়েছিল, জিএসএলভির এই সাফল্য তা অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করেছে।
এবার শুধু ইওএস-০৫ উপগ্রহকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে স্থাপনই নয়, রকেটটির ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিনও প্রত্যাশার চেয়ে ভালো পারফর্ম করেছে। এর ফলে উপগ্রহটি নির্ধারিত উচ্চতার চেয়ে প্রায় ২ হাজার ১০০ কিলোমিটার বেশি উচ্চতায় পৌঁছেছে।
ইসরোর এই সাফল্যের ফলে ইওএস-০৫-এর কার্যকালও অতিরিক্ত প্রায় তিন বছর বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
যে রকেট একসময় বারবার ব্যর্থ হয়ে বিজ্ঞানীদের কাছে ‘নটি বয়’ নামে পরিচিত হয়েছিল, ধারাবাহিক প্রযুক্তিগত উন্নতি ও সাফল্যের মধ্য দিয়ে সেই জিএসএলভিই এখন ভারতের মহাকাশ অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য ‘স্মার্ট বয়’ হয়ে উঠেছে।
(ঢাকাটাইমস/৫ সেপ্টেম্বর/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন







