ত্রিশালে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর বেহাল দশা! 

ত্রিশাল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:৪৫| আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:৪৮
অ- অ+

কোমরের ব্যথার ওষুধ নিতে পাগারিয়া নদী পেরিয়ে লাঠিতে ভর করে কাঁঠাল বাজার কমিউনিটি ক্লিনিকে এসেছিলেন ৬৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগম। বৃষ্টিতে ক্লিনিকে যাওয়ার রাস্তা কাদা ও হাঁটুপানিতে ডুবে থাকায় কষ্ট করে সেখানে পৌঁছান তিনি। কিন্তু ওষুধ না থাকায় শেষ পর্যন্ত খালি হাতেই ফিরতে হয়েছে তাঁকে।

নূরজাহান বেগম বলেন, ‘কোমরের ব্যথা নিয়ে নদী পার হয়ে আসতে খুব কষ্ট হয়। ভেবেছিলাম, ওষুধ খেলে ব্যথা কমবে। ওষুধের আশায় এসেছিলাম, কিন্তু কোনো ওষুধ পেলাম না।’

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায় প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য ১২টি ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকায় রয়েছে ৪৮টি কমিউনিটি ক্লিনিক। এসব ক্লিনিকের বেশির ভাগ ভবন ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে নির্মিত। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় অনেক ভবন এখন জরাজীর্ণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ওষুধ ও জনবলসংকট এবং যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থা।

সরেজমিনে উপজেলার কয়েকটি কমিউনিটি ক্লিনিক ঘুরে দেখা যায়, কোথাও ভবনের পলেস্তারা খসে পড়ছে, কোথাও ছাদে ফাটল। অনেক ক্লিনিকের দরজা-জানালা ভাঙা। কোনো কোনো ভবনে ফ্যান থাকলেও তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কোথাও বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থা নেই। শৌচাগার থাকলেও কয়েকটির অবস্থা ব্যবহার অনুপযোগী।

ক্লিনিকগুলোর আশপাশের পরিবেশও সব জায়গায় স্বাস্থ্যকর নয়। মশার উপদ্রব, দুর্গন্ধ ও অপরিচ্ছন্নতার অভিযোগ রয়েছে। রোগীদের বসার জন্য পর্যাপ্ত চেয়ার-টেবিলও নেই অনেক কেন্দ্রে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স অনেক দূরে হওয়ায় প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের কাছে কমিউনিটি ক্লিনিকই প্রাথমিক চিকিৎসার প্রধান ভরসা। কিন্তু এসব ক্লিনিকের বর্তমান অবস্থা নিয়ে তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। কাঁঠাল, কানিহারী, রামপুর ও ত্রিশাল ইউনিয়নে তুলনামূলক বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি ক্লিনিক থেকে প্রায় ছয় হাজার মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার কথা। এসব কেন্দ্রে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, প্রজনন স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, টিকাদান, পুষ্টি, স্বাস্থ্যশিক্ষা ও স্বাস্থ্যপরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

ক্লিনিকে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রুমা আক্তার, নূরজাহান বেগম, রমিসা খাতুন, মার্জিয়া সুলতানা, রওশনারা ও স্বপ্না আক্তার বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স দূরে হওয়ায় তাঁরা বাধ্য হয়ে কমিউনিটি ক্লিনিকে আসেন। কিন্তু অনেক ক্লিনিকের ভবন এতটাই পুরোনো যে সেখানে অবস্থান করতেও ভয় লাগে। তাঁদের অভিযোগ, প্রয়োজনের সময় সব ধরনের ওষুধও পাওয়া যায় না।

তাঁদের দাবি, পুরোনো ভবনগুলো সংস্কার করে ক্লিনিকগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধ, পানি, শৌচাগার ও বসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে এলাকার মানুষের দুর্ভোগ কমবে।

কাঁঠাল বাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি সেলিনা আফরোজ বলেন, সেখানে ২০ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হয়। নিয়মিত গর্ভবতী নারীরাও সেবা নেন। গত মাসে ৩১ জন গর্ভবতী নারীকে সেবা দেওয়া হয়েছে।

তবে রাস্তা খারাপ হওয়ায় বৃষ্টির সময় রোগীদের আসতে সমস্যা হয় বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, একসঙ্গে কার্টনভর্তি ওষুধ আনা সম্ভব হয় না। কার্টন খুলে ভাগ করে আনতে হয়। রোগীর তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় মাসের শেষদিকে ওষুধের সংকট দেখা দেয়।

জনবলসংকটের কথাও জানান সেলিনা আফরোজ। তিনজন কর্মী থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে তিনি একাই দায়িত্ব পালন করছেন। স্বাস্থ্য সহকারীর পদটিও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য।

কানিহারী ইউনিয়নের বালিদিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি হাসিনা খাতুন এবং কুষ্টিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি তানিমা সুলতানা জানান, পুরোনো ভবনের মধ্যেই তাঁদের রোগীদের সেবা দিতে হচ্ছে।

তাঁদের ভাষ্য, বৃষ্টির সময় ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। কুষ্টিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের ছাদের একটি অংশ ভেঙে পড়ে আছে। রোগী দেখার কক্ষে ফ্যান নেই। দরজা-জানালাও নষ্ট হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ে। সাপের উপদ্রব নিয়েও তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে। কিছু ক্লিনিকে পানির জন্য টিউবওয়েল নেই। কোথাও শৌচাগারও নেই। ফলে রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মী—দুই পক্ষকেই ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

ত্রিশাল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জিয়াউল বারী বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ট্রাস্টের মাধ্যমে ওষুধ সরবরাহ করা হয়। এক কার্টন ওষুধ শেষ হয়ে গেলে নতুন সরবরাহ না আসা পর্যন্ত সংকট দেখা দিতে পারে। এসব কেন্দ্রে মূলত প্রাথমিক চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যপরামর্শ দেওয়া হয়।

জিয়াউল বারী বলেন, ৪৮টি কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে প্রায় ৩০ থেকে ৩২টি ভবন বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ভবন ভেঙে নতুন করে নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদা পাঠানো হয়েছে।

সংস্কারের জন্য স্বাস্থ্য বিভাগে সরাসরি বরাদ্দ আসে না জানিয়ে তিনি বলেন, প্রকৌশল বিভাগ সরকারি বরাদ্দ পাওয়ার পর সংস্কার বা নির্মাণকাজ করে। এ বিষয়ে চার থেকে পাঁচবার প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।

(ঢাকা টাইমস/৫সেপ্টেম্বর/এসএ)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
Error!: SQLSTATE[42000]: Syntax error or access violation: 1064 You have an error in your SQL syntax; check the manual that corresponds to your MySQL server version for the right syntax to use near ') ORDER BY entry_time DESC,id DESC LIMIT 4' at line 4