রনজিলা হত্যা: র্যাবের গ্রেপ্তার ৩ জন জড়িত নন, ডিবির হাতে নতুন ২

জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে শিক্ষিকা রনজিলা পারভীনের মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ডিবির দাবি, গ্রেপ্তার দুজন খোকন ও রাজীব মাতব্বরই ওই ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত।
অন্যদিকে, এই ঘটনায় গত ৩০ আগস্ট র্যাব-২ যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছিল, তদন্তে তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে ডিবি।
বুধবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম।
পুলিশের ভাষ্য, গত ২৯ আগস্ট শেরেবাংলা নগর থানার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের পূর্ব প্রান্তে জাতীয় সংসদ ভবনের ১২ নম্বর গেটের পর খেজুরবাগানের মুখে ছিনতাইয়ের শিকার হন রনজিলা পারভীন। ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় রনজিলার স্বামী মোহাম্মদ আবদুল মতিন শেরেবাংলা নগর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
সিসিটিভি দেখে শনাক্ত
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে ছিনতাইকারীদের শনাক্তের চেষ্টা শুরু হয়। পরে ঢাকা ও সাভারের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে খোকন ও রাজীবকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গতকাল মঙ্গলবার ভোলার সদর উপজেলার গজারিয়া এলাকার বাসিন্দা খোকনকে মিরপুরের মনিপুর পশ্চিমপাড়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিবির দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে খোকন ঘটনার সময় মোটরসাইকেলের পেছনে বসে রনজিলার ব্যাগে হ্যাঁচকা টান দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।
খোকনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর থানার বড়বাগ এলাকা থেকে রনজিলার ছিনতাই হওয়া ব্যাগ উদ্ধার করা হয়। ওই ব্যাগে তাঁর ব্যবহৃত পোশাক, টিকিটের অংশ, চশমার খাপ ও কিছু ওষুধ ছিল। পরে মিরপুর-১ এলাকা থেকে রনজিলার মুঠোফোনও উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছে ডিবি।
এরপর ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে রাজীব মাতব্বরকে বিরুলিয়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিবির দাবি, ঘটনার সময় রাজীবই মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিলেন।
রাজীবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি দিয়াবাড়ি এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁর কাছ থেকে ৬২২টি ইয়াবা বড়িও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিবি।
ডিবি বলছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রাজীব জানিয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র, দস্যুতা, চুরি, মারামারি ও দ্রুত বিচার আইনের মামলাসহ আটটি মামলা রয়েছে। খোকনের বিরুদ্ধে মাদকের তিনটি মামলা রয়েছে।
র্যাবের গ্রেপ্তার তিনজন জড়িত নন: ডিবি
শফিকুল ইসলাম বলেন, র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং পরবর্তী সময়ে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে রনজিলার মৃত্যুর ঘটনায় তাঁদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।
র্যাব গত ৩০ আগস্ট রাকিব, পনি ও সেড্রিককে গ্রেপ্তার করেছিল। তাঁদের রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, র্যাব যাঁদের গ্রেপ্তার করেছিল, তাঁদের মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে ১২টি মামলা ছিল। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। পরে তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায়, তাঁরা রনজিলার মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত নন।
সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে খোকন ও রাজীবকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, সিসিটিভি ফুটেজে ঘটনার সময় একটি মোটরসাইকেলে দুজনকে দেখা গেছে। রাজীব মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন এবং খোকন পেছনে বসেছিলেন।
ঘটনায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি রাজীবের নিজের বলে জানিয়েছে ডিবি। মোটরসাইকেলটি ভাড়া করা হয়নি। এ ছাড়া খোকনের পরনের শার্ট, হাতে থাকা ঘড়ি ও মাথার ক্যাপও উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ডিবি।
মোটরসাইকেল নিয়ে র্যাব-ডিবির বক্তব্যে অমিল
রনজিলা হত্যার তদন্তে র্যাব ও ডিবির বক্তব্যে ঘটনার সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল নিয়েও পার্থক্য দেখা গেছে।
শফিকুল ইসলাম বলেন, র্যাব তখন ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল। তবে সিসিটিভি ফুটেজের সঙ্গে সেটি মিলিয়ে দেখার পর পার্থক্য পাওয়া যায়। ভিডিও ফুটেজে দেখা মোটরসাইকেলের রং এবং র্যাব যে মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছিল, তার রং ভিন্ন।
র্যাবের হাতে আগে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে খোকন ও রাজীবের কোনো যোগাযোগ আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে শফিকুল ইসলাম বলেন, তদন্তে তাঁদের মধ্যে কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, নতুন করে গ্রেপ্তার হওয়া দুজন পশ্চিম মনিপুর এলাকায় থাকেন। আর র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা তেজতুরীপাড়া এলাকার। তাঁরা দুটি ভিন্ন গ্রুপের।
আগে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের এই মামলায় সংশ্লিষ্টতা না পাওয়া গেলে তাঁদের মামলা থেকে বাদ দেওয়া হবে জানিয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, তবে তাঁদের বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলা থাকলে সেসব মামলায় আইনি প্রক্রিয়া চলবে।
স্বামীর দেওয়া বর্ণনায় শনাক্ত খোকন
ডিবির বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় রনজিলার স্বামী ছিনতাইকারীকে এক ঝলক দেখেছিলেন। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তাঁর মনে থাকা সেই চেহারার বর্ণনা তদন্তকারীদের জানান। পরে পেছনে থাকা খোকনকে শনাক্ত করা হয়।
শফিকুল ইসলাম বলেন, রনজিলার ব্যাগ, মুঠোফোন, পরনের পোশাক, ওষুধ ও টিকিটের অংশসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। এসব আলামত ও সিসিটিভি ফুটেজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে।
এদিকে র্যাবের হাতে আগে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা তাঁদের নির্দোষ দাবি করেছেন। রাকিব হোসেন ওরফে রাকিব বেপারীর স্ত্রী সুমাইয়া ইসলাম বলেন, প্রকৃত আসামি শনাক্ত হওয়ার পরও অপরাধ না করে তাঁর স্বামীকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া ও কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় তাঁরা প্রতিকারের দাবি করবেন।
মোশাররফ হোসেন পনি গাজী ওরফে প্যারা পনির বড় ভাই রনিও বলেন, ঘটনায় জড়িত না হয়েও তাঁর ভাইসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এ ঘটনায় তাঁরা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছেন।
ছিনতাইয়ের টাকায় মোটরসাইকেল কেনার দাবি
ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, রনজিলার ব্যাগ ছিনিয়ে নিতে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটির মালিক রাজীব। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রাজীব জানিয়েছেন, বিভিন্ন সময়ে ছিনতাই করে পাওয়া টাকা দিয়ে তিনি মোটরসাইকেলটি কিনেছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, মোটরসাইকেলটি ২৫০ সিসির। এটি কীভাবে কেনা হয়েছিল এবং এর সঙ্গে ছিনতাইয়ের অর্থের কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













