সৌদি আরবে শ্রমিক নির্যাতন বন্ধে কঠোর কূটনৈতিক পদক্ষেপের আহ্বান সাইফুল হকের

সৌদি আরবে বাংলাদেশিসহ প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন, মৃত্যুদণ্ড ও শিরশ্ছেদ বন্ধে কঠোর কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। শ্রমিকদের ন্যূনতম অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ দেশগুলোতে প্রয়োজনে সাময়িকভাবে কর্মী পাঠানো বন্ধ রাখার বিষয়টিও বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বাংলাদেশ বিপ্লবী শ্রমিক সংহতি আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে এসব কথা বলেন সাইফুল হক। সৌদি আরবে সম্প্রতি দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদের প্রতিবাদ এবং প্রবাসী শ্রমিকদের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে এ কর্মসূচি আয়োজন করা হয়।
সমাবেশে সাইফুল হক বলেন, সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে এখনো সাত হাজারের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক বন্দী রয়েছেন। তাঁদের আইনি সহায়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু শ্রমিকদের বিদেশে পাঠিয়ে দিতে পারলেই সরকার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিজেদের দায়িত্ব শেষ বলে মনে করছেন। শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, আইনি সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসগুলোর কার্যকর ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, যেসব শ্রমিকের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে ভূমিকা রাখছে, তাঁদের এমন অমানবিক ও বিভীষিকাময় জীবন মেনে নেওয়া যায় না। প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
প্রবাসী নারী শ্রমিকদের ওপর যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের অভিযোগ তুলে সাইফুল হক বলেন, বিদেশে নারী শ্রমিকদের জীবন ও মর্যাদা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে। গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে যাওয়া অনেক নারী নিয়োগকর্তার পরিবারের সদস্যদের দ্বারাও নির্যাতনের শিকার হন। কেউ কেউ অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। এসব নারীর জীবন, ভবিষ্যৎ ও অনাগত সন্তানের দায়িত্ব কে নেবে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
সাইফুল হক বলেন, সৌদি আরবসহ যেসব দেশে শ্রমিকদের ন্যূনতম অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে না, সেসব দেশে কর্মী পাঠানোর বিষয়ে সরকারকে প্রয়োজনে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে। শ্রমিকদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা জরুরি।
বিদেশে কর্মী পাঠানোর খরচ নিয়েও সমালোচনা
বিদেশে কর্মী পাঠানোর নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও নিয়োগকারী সংস্থাগুলোর সিন্ডিকেটের সমালোচনা করেন সাইফুল হক। তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় যেতে শ্রমিকদের কাছ থেকে ছয় থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকার কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না।
তিনি বলেন, নির্বাচিত সরকারের আমলে বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কোনো সিন্ডিকেট বা বাণিজ্য চলতে দেওয়া উচিত নয়। নিয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে আলোচনা করে বিদেশে কর্মী পাঠানোর প্রকৃত ব্যয় নির্ধারণ, অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশের জন্য শ্রমিকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সরকারের উদ্দেশে সাইফুল হক বলেন, নির্বাচিত সরকারের জবাবদিহি দেশের জনগণ ও ভোটারদের কাছে, কোনো পরাশক্তি বা রাজতন্ত্রের কাছে নয়। প্রবাসী শ্রমিকদের জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্নে সরকারকে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নীরবতাও গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দেশের শ্রমিকদের মজুরি ও কর্মসংস্থান নিয়েও দাবি
সমাবেশে দেশের শ্রমজীবী মানুষের সংকট তুলে ধরে সাইফুল হক বলেন, তৈরি পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে ৩০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি জীবনধারণের উপযোগী মজুরি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, হকার, রিকশাচালক, দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের মানুষকে উচ্ছেদের আগে তাঁদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না করে পুলিশ দিয়ে শ্রমজীবী মানুষের ওপর উচ্ছেদ ও ভাঙচুর চালানো উচিত নয়। বেকারত্ব বাড়তে থাকলে সমাজে অপরাধপ্রবণতাও বাড়বে উল্লেখ করে তিনি দ্রুত বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির আহ্বান জানান।
সমাবেশে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য বহ্নিশিখা জামালী বলেন, প্রবাসী নারী শ্রমিকদের জীবন ও মর্যাদা সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। অনেক নারীকে বিদেশে যৌন নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হয়ে অসহনীয় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তাঁদের ন্যূনতম অধিকারও নিশ্চিত করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বহ্নিশিখা জামালী আরও বলেন, প্রতিদিন দেশে ১৬ জন শ্রমিকের মরদেহ আসে। শ্রমিকদের এমন অনিশ্চিত জীবন বন্ধে সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশ বিপ্লবী শ্রমিক সংহতির সভাপতি মীর মোফাজ্জল হোসেন মোশতাকের সভাপতিত্বে সমাবেশটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ফিরোজ আলী।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন বিপ্লবী গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপতি মাহমুদ হোসেন, বিপ্লবী শ্রমিক সংহতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম, বিপ্লবী যুব সংহতির সদস্যসচিব মীর রেজাউল আলম, শ্রমজীবী নারী মৈত্রীর সহসভাপতি রাশিদা আক্তার এবং নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আনিসুর রহমান মাস্টার।
সমাবেশ শেষে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে সেগুনবাগিচায় সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













