দুর্ঘটনায় অঙ্গহারা যুবদল নেতাকে ভুলে গেছে বিএনপি

মঞ্জুর রহমান, মানিকগঞ্জ
| আপডেট : ১৪ মার্চ ২০১৭, ০৯:৩৪ | প্রকাশিত : ১৪ মার্চ ২০১৭, ০৯:৩০

যুবদলের প্রতিষ্ঠাকালীন এক নেতাকে ‘ভুলে গেছে’ বিএনপি। এক যুগ আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হয়ে অঙ্গ হারানোর পর থেকে কমতে শুরু করে তার গুরুত্ব। ওই দুর্ঘটনার আগ পর্যন্ত বেশ সম্পদশালীই ছিলেন তিনি। কিন্তু এখন সব হারিয়ে তিনি ঠাঁই নিয়েছেন তার মৃত ছোট বোনের বাড়িতে।

এই নেতার নাম গোলাম মহিয়ার খান সিপার। তিনি ছিলেন কেন্দ্রীয় যুবদলের প্রচার সম্পাদক। ছিলেন মানিকগঞ্জ যুবদলের আহ্বায়ক। পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ছিলেন মানিকগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার। ছিলেন রাজপথের লড়াকু সৈনিক। এখন তিনি অসহায়।

মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার গড়পাড়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠে ক্রিকেট খেলা হচ্ছে। পাশে মঞ্চ। বামপাশের নিচে একটি চেয়ারে বসে আছন সিপার। তার সামনে দিয়ে নেতারা মঞ্চে উঠছেন, পুরস্কার দিচ্ছেন খেলোয়াড়দের। কিন্তু সিপারের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছেন না কেউ।

-কেমন আছেন?
-জবাব আসল, ‘ভাল আছি। তবে ভাল লাগে না। এ ভাবে বেঁচে থাকতে ইচ্ছা করে না। দুর্ঘটনায় কেন যে বেঁচে গেলাম। আল্লাহ আমাকে নিয়ে গেলেই ভাল হত।’

২০০৫ সালের দিকে তৎকালীন চিফ হুইপ বিএনপি নেতা খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের বাড়ি যাবার পথে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ঘিওর উপজেলার জোঁকা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনার স্বীকার হন সিপার। আঘাত পেয়ে তার ডান হাত পঙ্গু হয়ে যায়। চলাচলের স্বক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন তিনি। দেশ বিদেশে চিকিৎসা করাতে গিয়ে তার সব অর্থ খরচ হয়ে যায়। এরপর সম্পদ যা ছিল তা তার দুই স্ত্রী ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়ে যায়।

-‘মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ঠিকমত পান তো?’।
-বললেন, ‘পাই, তবে তিনমাস পরপর।’
-এই টাকায় চলে?
-না, চলে না।
-তাহলে কীভাবে চলেন?
-এরপর বলতে শুরু করলেন সিপার। বলেলেন, মাহবুব হাসান মোর্শেদ রুনু প্রতিমাসে তিন হাজার টাকা করে টাকা দেন, আফরোজা খান রিতা দেন দুই হাজার, ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আরস্তু খান মাসে এক হাজার ও প্রবীর সাহা মাসে পাঁচশ টাকা করে পাঠান। সেই টাকা দিয়ে কোন রকমে চলেন তিনি।

তবে আফরোজা খান রিতা তার অসুস্থ বাবা হারুনার রশিদ খান মুন্নুকে ব্যস্ত থাকায় ছয় মাস ধরে টাকা পাঠাচ্ছেন না। এ নিয়ে ভাবছেন না সিপার। মুন্নু সাহেব যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন-সে দোয়া করছেন তিনি। বলেন, ‘একজন মানুষ অসুস্থ থাকলে পরিবারের অবস্থা আমি বুঝি।’

সিপার এখন থাকেন ছোট বোন রিনার বাড়িতে। দুই বছর আগে মারা গেছেন এই নারীও। তাহলে কে দেখাশোনা করে?

সিপার বলেন, ‘আরেক ছোট বোন ডলি এখন খোঁজ খবর নেয়। অন্য কেউ তেমন কথাও বলে না।’

-মুক্তিযোদ্ধা সংসদ থেকে খোঁজ নেয় না?’
-‘আমার দলের অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছে তারাই খোঁজ রাখেন না। আর আওয়ামী লীগের মুক্তিযোদ্ধারা কতটুকু খোঁজ রাখবেন?- আক্ষেপ ঝরে পড়ল সিপারের কণ্ঠে।

এক প্রশ্নের জবাবে সিপার বলেন, ‘জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মহিউদ্দীন ও সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম আমার শারীরিক অবস্থার খোঁজ খবর নেন, সাহায্য সহযোগিতাও করেন। তবে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের পক্ষ থেকে কোন সাহায্য সহযোগিতা করা হয় না। অথচ আমি দুর্ঘটনায় পঙ্গু হওয়ার আগে বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি মার্কেট করে দিয়েছি। আজ আমি পঙ্গু অথচ কোন মুক্তিযোদ্ধা আমার খোঁজ রাখে না। এটা দুঃখজনক।’

সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে যাওয়ার পর তাকে ভুলে গেছে দল। সিপার বলেন, ‘আজ আমার এই অবস্থায় মানিকগঞ্জের কোন বিএনপির নেতা আমার খোঁজ নেন না। আমি কেমন আছি। আমাকে এক নজর কেউ দেখতে আসেন না।’ বলেন, ‘জেলার নেতাকর্মীরাই আমার খোঁজখবর রাখে না। আর কেন্দ্রীয় কমিটির কিভাবে খোঁজ নেবে। তারা তো জানেনই না আজ আমার এই অবস্থা। আমি কীভাবে চলছি।’

সিপারের এই দুর্দশার বিষয়ে কথা হলো মানিকগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার তোবারক হোসেন খান লুডুর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘অসচ্ছল, পঙ্গু ও অসহায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি তহবিল রয়েছে। সেই তহবিল থেকে অসচ্ছল, পঙ্গু ও দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থিকভাবে সহযোগিতা করা হয়। সিপার আমাদের কাছে আবেদন করলে অবশ্যই তাকে সহযোগিতা করা হবে।’

জানতে চাইলে মানিকগঞ্জ বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মঈনুল ইসলাম খান শান্ত বলেন, ‘গোলাম মহিয়ার খান সিপারের বিষয়টি আমাদের মনে আছে। দলীয় ও ব্যবসায়িক নানা কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় সব সময় তার খোঁজ রাখা সম্ভব হয় না।’

এ কথা বলে সিপারকে যোগাযোগ রাখার অনুরোধ করেন এই বিএনপি নেতা।

ঢাকাটাইমস/১৪মার্চ/প্রতিনিধি/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত