গাজীপুরে নদী ও খালে বিষের নহর

শাহান সাহাবুদ্দিন, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০১৭, ০৯:৫২ | প্রকাশিত : ১৬ এপ্রিল ২০১৭, ০৮:৪৩

গাজীপুরের শ্রীপুরে ঐতিহ্যের ধারক বিভিন্ন নদ-নদী ও খাল দখল করে শিল্পকারখানা গড়ে তোলার মহোৎসব চলছে। ইতিমধ্যে সেরমা ও লবণদহ নদী প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। শালদাহ নামের একটি নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে বিভিন্ন স্থানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে পুকুর বানিয়ে মাছ চাষ করা হচ্ছে সেখানে। কোনো কোনো স্থানে নদীগুলো সরু খালের মতো থাকলেও সেখান দিয়ে বইছে বিষের নহর। বেশির ভাগ কারখানার তরল বর্জ্য ফেলা হচ্ছে রেখার মতো টিকে থাকা এসব খালে।

শ্রীপুর পৌরসভার পশ্চিম সীমান্ত ঘেঁষা একসময়ের খর¯্রােতা লবণদহ নদী সময়ের বিবর্তনে রূপ নিয়েছে সরু খালে। কয়েক বছর আগেও লবণদহ নদীতে জাল ফেললেই স্বচ্ছ পানির নিচ থেকে উঠে আসত নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ। একসময় এই নদীর নাব্যতা ও প্রাচুর্যের বর্ণনা ছিল পুঁথিতে। বদিউজ্জামালের ‘সয়ফল মুল্লুক’ পুঁথিতে আছে এই নদীর কিংবদন্তির কথা।

এখন আলকাতরার মতো কুচকুচে কালো দূষিত পানি বইছে সেখানে। প্রচলিত আছে, ওই পানিতে ব্যাঙ লাফিয়ে পড়লে পরে মরে ভেসে ওঠে। এই খালের পানি শরীরের কোথাও লাগলে চুলকাতে থাকে। শরীরের নানা স্থানে দেখা দেয় চর্মরোগ।

লবণদহ নদী দখল করে বড় বড় কারখানা গড়ে তোলার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন শিল্পমালিকরা। সরেজমিনে দেখা যায়, শ্রীপুর পৌরসভার বহেরার চালা বাজারের পশ্চিম পাশে এক্স সিরামিক্স নামের একটি কারখানার কর্তৃপক্ষ লবণদহ দখল করে ভবন নির্মাণের কাজ করছে। নদীর এক পাশ দখল করে স্থাপন করা হয়েছে সিরামিক তৈরির বড় একটি মেশিন।
দখলে দখলে লবণদহ নদী খালের আকার পেয়ে তা ২৫-৩০ ফুট প্রস্থে নেমে এসেছে।  

স্থানীয় পৌরসভার কাউন্সিলর আমজাদ হোসেন বলেন, মৃতপ্রায় লবণদহ দখল করে তাদের স্থাপনা নির্মাণ করতে বারবার নিষেধ করেছে গ্রামবাসী। কিন্তু সে কথা শোনার যেন সময় নেই তাদের।

পৌর মেয়র আনিছুর রহমান বলেন, এক্স সিরামিক্স কারখানা কর্তৃপক্ষ লবণদহ দখল করে স্থাপনা নির্মাণ ও সীমানা প্রাচীর তৈরি করছে। কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালককে কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য লিখিতভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পৌরসভা থেকে।
সরেজমিনে দেখা যায়, লবণদহের পূর্ব পাড় দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করছে এক্স সিরামিক্স। নোটিশ পাওয়ার পরও বন্ধ রাখেনি তাদের কাজ।

নদী দখলের কথা অস্বীকার করে কারখানার জিএম হাবিবুর রহমান বলেন, ‘নদী দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়নি।’  
নয়নপুর থেকে এক কিলোমিটার পশ্চিমে লবণদহ নদীর পূর্ব পাড় ঘেঁষে গড়ে উঠেছে সেলভো নামে একটি অ্যাসিড তৈরির কারখানা। দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা কারখানায় তৈরি হচ্ছে অ্যাসিড। আর এই অ্যাসিড কারখানার তরল বর্জ্য গিয়ে পড়ছে লবণদহ নদীতে। বাতাসে উড়ছে বিষাক্ত ধোঁয়া। এই অ্যাসিড কারখানার কারণে ফসলহানি হচ্ছে মাঠে। ওই এলাকায় ফলের গাছে নেই ফল। ফলশূণ্য আম, কাঁঠাল ইত্যাদি গাছ।

বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. মনির হোসেন ঢাকাটাইমসকে বলেন, লবণদহ নদীর পানির মতোই অবস্থা এখন গাজীপুরের শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, শাখাতুরাগ, শালদাহ, পারুলী, বংশী, সূতিয়া, বানার নদীসহ জেলার বেশির ভাগ খাল ও জলাশয়ের। তিনি আরও জানান, রাজাবাড়ি এলাকায় সেরমা নামে একটা নদী ছিল। একসময়ের খরস্রোতা সেরমা এখন নিশ্চিহ্ন। ডার্ড কম্পোজিট নামে একটি কারখানা নদী ভরাট করে ফেলেছে অনেক আগেই।  

স্থানীয় লোকজন জানান, এখন আর বোঝার উপায় নেই যে এখানে কোনো নদী ছিল।

বিলাইজুড়ি, মনপুরা খালের অবস্থা খুবই ভয়াবহ। এসব খালে আছড়ে পড়ছে অন্তত অর্ধশতাধিক কারখানার দূষতি বর্জ্য। পাইপ ও  ড্রেনে দিয়ে আসা বিভিন্ন রঙের এসব পানির বেশির ভাগই অপরিশোধিত। পাইপলাইন, ড্রেন ছাড়াও নালা, কৃষিজমি ও জলাশয় গড়িয়ে কারখানা থেকে পানি আসছে খালে। আলকাতরা বর্ণের এসব পানি বিলাইজুড়ি খাল দিয়ে হবিরবাড়ি নামক স্থানে গিয়ে পড়ছে ভালুকার লাউতি খালে। লবণদাহ খালের একটি শাখা লাউতি। এখানেই লবণদাহের সঙ্গে মিশেছে লাউতি। এই পানি লবণদাহ খাল দিয়ে সোজা চলে যাচ্ছে তুরাগে। শ্রীপুরের শত শত কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য পরিবেশে বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছে প্রতিদিন। নদী, খাল, নালা, উন্মুক্ত কৃষিজমিতে পড়ছে এই বিষ।

গাজীপুর জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সোনিয়া সুলতানা বলেন, অভিযুক্ত কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মানুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

(ঢাকাটাইমস/১৬এপ্রিল/মোআ)

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত