শেয়ারবাজারে মন্দের ভালো এবারের বাজেট

ইউনুছ আলী আলাল, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৩ জুন ২০১৭, ১১:১৭ | প্রকাশিত : ০৩ জুন ২০১৭, ১০:৫৭

একটি দেশের অর্থনীতির জন্য পুঁজিবাজার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই জন্য বিশ্বের সব দেশেই পুঁজিবাজারকে গুরুত্ব দিয়ে বাজেট তৈরি করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এর উল্টো চিত্র। আমাদের দেশে বরাবরই উপেক্ষিত পুঁজিবাজার। ফলে ঢাকাসহ সারাদেশে প্রায় ৪০ লাখ বিনিয়োগকারীর আশায় জল ঢেলে দিয়েছে ২০১৭-১৮ সালের প্রস্তাবিত বাজেট। বাজেটে নেই পুঁজিবাজারবান্ধব সন্তোষজনক কোনো খবর। এই বাজেটে পুরোপুরি উপেক্ষিত হয়েছে পুঁজিবাজার। বাজেটে পুঁজিবাজারে সবধরনের সেবার ফিতে ভ্যাট অব্যাহতি রাখলেও তাতে বিনিয়োগকারীরা তেমন উপকৃত হবেন না। ফলে হতাশ হয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ও ২০১৬-১৭ সালের সম্পূরক বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন শুরু করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বৃহস্পতিবার দুপুর ১টা ৩৭ মিনিটে জাতীয় সংসদে ‘উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ: সময় এখন আমাদের’ শিরোনামে বাজেট বক্তৃতা শুরু করেন অর্থমন্ত্রী।

চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য তেমন নতুন কিছুই নেই। পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বাজেটের আগে বেশকিছু প্রস্তাবনা দেয়া হলেও এবারের বাজেটে সেগুলোর তেমন কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। তবে এবারের বাজেটে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) আয়কে করমুক্ত রাখা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজারে সবধরনের সেবার ফিতে ভ্যাট অব্যাহতি দিয়েছে সরকার। প্রতি বছর ব্রোকার ও ডিলারদের লাইসেন্স নবায়ন, সিডিবিএল ফি, মার্চেন্ট ব্যাংকারদের বার্ষিক ফি, ট্রেক নবায়ন, বিক্রয় প্রতিনিধিদের ট্রেড সার্টিফিকেট (টিসি) এবং প্রতি পাঁচ বছর পর অনুমোদিত প্রতিনিধিদের লাইসেন্স নবায়ন করতে হয়। এর সঙ্গে ভ্যাট সম্পৃক্ত আছে। এগুলো থেকে ভ্যাট অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, বাজেটে সবধরনের সেবায় অব্যাহতি দেয়ার কারণে বিও নবায়ন ফি ৫০ টাকা কমে এসেছে। আগে যেখানে প্রতি বছর ৫০০ টাকা দিয়ে বিও নবায়ন করতে হতো, এখন তা ৪৫০ টাকায় নবায়ন হবে। অ্যাকাউন্ট হোল্ডারদের সরকারের ভ্যাট বাবদ ৫০ টাকা দিতে হবে না।

তাছাড়া করপোরেট করের হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এর ফলে তালিকাভুক্ত ব্যাংক, বিমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে আগের মতোই ৪০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। আর অতালিকাভুক্ত ব্যাংক, বিমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এ হার ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে, পোশাক খাতের কর হার ৫ শতাংশ হ্রাস করায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে টেক্সটাইল সেক্টরে।

আগের মতোই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে ২৫ শতাংশ এবং অতালিকাভুক্ত কোম্পানিকে ৩৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। একইভাবে তালিকাভুক্ত মোবাইল ফোন কোম্পানির করহার ৪০ শতাংশ এবং অতালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে ৪৫ শতাংশ করহার নির্ধারণ করা হয়েছে। মার্চেন্ট ব্যাংকের ক্ষেত্রে আগের মতোই সাড়ে ৩৭ শতাংশ করহার বহাল রাখা হয়েছে। সবধরনের অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডকে কর অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে।

এছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানত ও সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে মূসক অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। একইভাবে জীবন বিমা ও অগ্নিবিমা পলিসিকে মূসক অব্যাহতির আওতায় আনা হয়েছে।

সবার প্রত্যাশা ছিল করপোরেট ট্যাক্স কমে আসবে। কিন্তু বাজেটে এটা রাখা হয়নি। এটা হলে তা পুঁজিবাজারের জন্য ভালো হতো। তবে বাজেটে পরোক্ষভাবে ব্যাংকে টাকা অলস অর্থ রাখতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, এটা পুঁজিবাজারের জন্য ভালো। এই নীতির ফলে ব্যাংকের টাকা পুঁজিবাজারে আসবে। কারণ অনেকেই টাকা কেটে নেয়ার ভয়ে ব্যাংকে অলস অর্থ ফেলে রাখবেন না। তারা অন্য কোথায় টাকা নিয়ে আসতে চাইবেন। এক্ষেত্রে তাদের বিনিয়োগের জায়গা হবে পুঁজিবাজার। আর পুঁজিবাজারের যখন বেশি বেশি টাকা আসবে, তখন বাজার চাঙা হওয়ার সুযোগ থাকবে। বাজেটে টেক্সটাইল খাতের করপোরেট ট্যাক্স কমানো হয়েছে, এটা ভালো খবর। পরোক্ষভাবে এই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে পুঁজিবাজারে। এ খাতের তালিকাভুক্ত যে কোম্পানি রয়েছে তারাও সুবিধা পাবে। ফলে বিনিয়োগকারীদের জন্য ভালো কিছু করতে পারবে তারা।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই বাজেটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল করপোরেট ট্যাক্স কমানো। ট্যাক্স কমালে ভালো ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসতে আগ্রহী হতো। এতে যেমন ভালো শেয়ারের জোগান বাড়ত, তেমনি বিনিয়োগকারীরাও ভালো কোম্পানিতে বিনিয়োগ করার সুযোগ পেতো। কিন্তু এই ট্যাক্স না কমিয়ে কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আসতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

বাজেটে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, করমুক্ত লভ্যাংশ আয় ২৫ হাজার থেকে এক লাখ টাকায় উন্নীত করা। এটা দাবি ছিল উভয় স্টক এক্সচেঞ্জের কিন্তু বাজেটে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটা করলে বিনিয়োগকারীরা উপকৃত হতেন।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে বাজেটে বিনিয়োগকারীদের জন্য সুখবর নেই। বাজেটে যা রাখা হয়েছে, তা বাজারের জন্য ভালো। তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য এটা কোনো সুবিধা নয়। তাদের সুবিধার জন্য করপোরেট ট্যাক্স কমানো ও করমুক্ত লভ্যাংশ বাড়ানোর দরকার ছিল।’

এদিকে বাজার সংশ্লিষ্টরা বাজেটে পুঁজিবাজার নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো ঘোষণা না থাকায় হতাশ হয়েছেন। তাঁরা বলছেন, স্টক এক্সচেঞ্জকে পাঁচ বছরের জন্য সম্পূর্ণ কর অবকাশ সুবিধা প্রদান, ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীদের করমুক্ত লভ্যাংশের সীমা ২৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ টাকা নির্ধারণ এবং লভ্যাংশের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দ্বৈত করের বৈষম্য থেকে মুক্ত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় ছিল, যেগুলো বাস্তবায়ন করা হলে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজারেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ত। বিষয়গুলো নিয়ে এখনো দরকষাকষির সুযোগ থাকায় তারা কেউই হাল ছেড়ে দেননি। এগুলো নিয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন তারা।

(ঢাকাটাইমস/০৩জুন/আলাল/জেবি) 

সংবাদটি শেয়ার করুন

অর্থনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত