গাবতলীর বিশ্রামাগার তুমি কার?

সিরাজুম সালেকীন, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৫ জুন ২০১৭, ১০:২৭ | প্রকাশিত : ১৫ জুন ২০১৭, ১০:২২

বিশাল হল রুম। ফ্যান, টিভি চলছে। সাথে সারিবদ্ধ চেয়ার। সব বাসের জন্য অপেক্ষমাণ যাত্রীদের জন্য তৈরি। তবে চেয়ারগুলোতে যারা বসে আছে তারা সবাই টোকাই, ভিক্ষুক ও মাদকসেবী। কেউ গাঁজা সেবন করছে, কেউ গাঁজা-ইয়াবা বিক্রি করছে। কেউ বা চেয়ার দখল করে ঘুমাচ্ছে। আবার কখনো প্রশাসনের কর্তারা আসছেন, মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলছেন, চলে যাচ্ছেন।

এই দৃশ্য গাবতলী বাস টার্মিনালের। প্রতিদিন এখান থেকে হাজার হাজার মানুষ বাসযোগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত করে। যাত্রীদের যাত্রাপথের ক্লান্তিদূর করতে টার্মিনালে গড়ে তোলা হয়েছে ‘যাত্রী বিশ্রামাগার’। ফ্যান, টেলিভিশন, মনোমুগ্ধকর বাথরুম ও স্টিলের চেয়ার আছে। যেখানে একবারে দুইশর বেশি মানুষ বিশ্রাম নেবার সুযোগ আছে। কিন্তু বর্তমানে বিশ্রামাগারে টোকাই, মাদকসেবী, মাদক ব্যবসা ও ভিক্ষুকদের আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে। তাদের কারণে প্রায়ই মালামাল খোয়া যায় যাত্রীদের। তাই কেউ আর বিশ্রামাগারে সাহস করে বিশ্রাম নিতে যায় না।

তবে প্রশাসন বলছে এ ব্যাপারে তাদের কিছু জানা নেই। আর স্থানীয়রা বলছে মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের গাফলতিতে এই গুলো হচ্ছে।

ঢাকা সিটি কপোরেশন থেকে টার্মিনালের এক নিরাপত্তা প্রহরী নাম প্রকাশ না শর্তে ঢাকাটাইমসকে বলেন, বিশ্রামাগারে যারা থাকে তারা সবাই এখানকার স্থানীয় বা পরিবহনের সাথে জড়িত। তাদের ক্ষমতার দাপট অনেক। ফলে সাধারণ যাত্রীরা এখানে বিশ্রাম নেবার সুযোগ পান না। কারণ এখানে নিরাপত্তা নেই বললেই চলে।

ওই প্রহরী বলেন, ‘সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী বাসের টিকিট কেটে বিশ্রামাগারে বসেছেন। এমন সময় কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবী তাকে মোবাইল চোর বলে ঘিরে ধরে। পরে অবস্থার বেগতিক দেখলে আমরা কয়েকজন নিরাপত্তা প্রহরী তাকে উদ্ধার করি।’

গাঁজা কেনার ভান ধরে কথা হয় এক কিশোর মাদক বিক্রেতার সঙ্গে। তার ভাষ্য মতে ‘বেলাল চাচা’র কাছ থেকে গাঁজার পুটলাগুলো নিয়ে সেগুলো বিক্রি করে টার্মিনালে। গাঁজা প্রতি পুটলা ৫০ টাকা বিক্রি করলে ২০ টাকা করে থাকে। বিশেষ সময়ে ইয়াবাও পাওয়া যায়।

কারা কিনতে আসে জানতে চাইলে ওই বিক্রেতা জানায়,  বাসের সহকারী, স্থানীয় মাদকসেবী ও মাঝে মাঝে বাসে যাত্রীরাও কিনে থাকে।

ওই কিশোরের সঙ্গে কথা বলতে দেখে সন্দেহ শুরু করে অন্য কিশোর মাদক বিক্রেতারা। তারা হাত দিয়ে ক্রস চিহ্ন দেখিয়ে বিশেষ ইশারা করলে আকাশ আর কথা বলতে রাজি হয়নি।

এদিকে টার্মিনালের দায়িত্বে থাকা অনেকে জানান, ফরিদ, নজরুল, বাবুলসহ বেশ কয়েকজন মাদকের যোগান দেন এবং তারা মাদকের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। আর তাদের মাদকগুলো বিক্রির দায়িত্ব পালন করে ২০ জনের বেশি কিশোর। যারা সবাই টুকাই, ভিক্ষুক ও প্রতিবন্ধী। এসব বিক্রেতারা এক দুই পুটলার বেশি কাছে মাদক বহন করে না। কারণ প্রশাসনের হাতে ধরা পরলে যাতে ঝামেলা কম পোহাতে হয়।

কোন ক্রেতা বসে গাঁজা বা ইয়াবা সেবন করতে চাইলেও আছে বিশেষ ব্যবস্থা। বিশ্রামাগারের বাথরুমের পাশের সিড়ি বা ছাদে মাদক সেবনের নিরাপদ আশ্রয়। কারণ সিড়িতে সার্বক্ষনিক তাদের পাহারা আছে। অপরিচিত কেউ আসলেই সতর্ক করে দেওয়া হয়।

পরিবার নিয়ে বাচ্চু মিয়া যাবেন রংপুর। ছোট শিশু সন্তান ও স্ত্রী কে নিয়ে বসে আছেন রংপুরগামী বাস কাউন্টারের সামনে। হালকা বৃষ্টির পড়ছে। কথা হয় তার সাথে। তিনি জানান, বাস আসতে এখনও দুই ঘন্টা সময় লাগবে। এর মাঝে বিশ্রামাগারে না গিয়ে এখানে কেন প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, ‘গেছিলাম তবে ভেতরের পরিবেশ এতো খারাপ। আর বাজে কথা বলে ভেতরে বসে থাকা ছেলেরা।’ তাই বাইরে বসেই বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন বলে তিনি জানান।

এ সময় ফারুখ নামে এক কাউন্টার মাস্টার বলেন, ‘আমরা নিজেরাও কোন সময় বিশ্রাম নিতে পারি না। সব সময় বাজে মানুষের আনা গোনা লেগেই থাকে। আর ঈদের সময় যাত্রীর চাপ বেশি থাকে। সেসময় কাউন্টারের সামনে যাত্রীদের তিল ধারণের জায়গা থাকে না। বেশ কয়েক বছর ধরে যাত্রীদের বিশ্রামের জায়গাটা বহিরাগতদের কাছ থেকে উদ্ধারের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। তাই বিশেষ করে মহিলা যাত্রীরা ঘন্টার পর ঘন্টা কাউন্টারের সামনে গাদাগাদি করে বসে থাকেন।’

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আরেক যাত্রী জানান, রোজা রেখে কাউন্টারের সামনে গরমে বসে থাকা খুবই কষ্ট। কারণ এখানে ফ্যান নেই। কিন্তু যাত্রীদের বসার জায়গা থাকলেও সেটি সেপটি না। এটা দ্রুত কর্তৃপক্ষ কে দেখা উচিত।

টার্মিনালের ব্যবস্থাপক দপ্তরের এক কর্মচারী জানান, তিনি ১৫ বছর ধরে এখানে কাজ করেন। প্রতিদিন সকালে বিশ্রামাগারসহ টার্মিমাল ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করেন যাত্রীদের জন্য। তবে যাত্রীরা কম সময় এখানে বিশ্রাম নিতে পারে। কারণ বিশ্রামাগার মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের দখলে। কারণ জানতে তিনি বলেন, মিছিল মিটিংয়ে যেসব মানুষ যায় তাদেরকে দখলে দিয়ে রেখেছে স্থানীয় নেতারা ও শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা। মাঝে মধ্যে পুলিশের অভিযান দুই একজন আটক হলেও দুদিন পর তারা ছাড়া পেয়ে যায়।

ওই কর্মচারী বলেন, ‘এখানে পুলিশ মাদক বিক্রেতা তো বন্ধু। গাবতলী বাস টার্মিনাল পুলিশ ফাঁড়ি ও বাস মালিকপক্ষ পদক্ষেপ নিলে এসব মানুষের আনাগোনা কমানো সম্ভব।’ তিনি বলেন, ‘মহাখালী বাস টার্মিনাল এক সময় গাবতলী টার্মিনালের মতো খারাপ পরিবেশ ছিলো। তবে এখন সেটা নেই। কারণ মালিক সমিতির কড়া নির্দেশনায় এখন পরিবেশ ভালো।’

এ ব্যাপারে দারুস সালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সেলিমুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘এতদিন এই থানায় আসার পর এমন অভিযোগ প্রথম। শুনলাম এই ব্যাপারে নিজেই দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

ঢাকাটাইমস/১৩জুন/এসএস/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজধানী বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত