সুই-সুতায় ব্যস্ত মানিকগঞ্জের ৪০ হাজার নারী

মঞ্জুর রহমান, মানিকগঞ্জ থেকে
 | প্রকাশিত : ১৫ জুন ২০১৭, ১৩:৩৬

সারা বছর কাজের চাপ কম থাকলেও শুধু ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ততা বেড়ে যায় মানিকগঞ্জের সুই-সুতা কারুকাজের সঙ্গে জড়িত গৃহবধূদের। জেলার বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করা পাড়া-মহল্লার স্কুল-কলেজ পড়ুয়া মেয়ে ও গৃহবধূরা দল বেঁধে বসে দেশের নামিদামি ব্যান্ডের পাঞ্জাবির গলার কারুকাজ করতে দেখা যায় তাদের।

সামনের রোজার ঈদে ঢাকার বিভিন্ন শো-রুমে সরবরাহ করা হবে জেলার ৪০ হাজার গ্রামীণ নারীর হাতে কারুকাজ করা প্রায় আড়াই লাখ পিস বিভিন্ন ধরনের পাঞ্জাবি ও ফতুয়া। গৃহস্থালি কাজ শেষ করে বাড়তি আয়ের জন্য এমন নিখুঁত হাতের কাজ করলেও তাদের অভিযোগ চাহিদা মতো মজুরি পাচ্ছেন না তারা।

মানিকগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, সিল্ক, মসলিন ও আদিকর্টন পাঞ্জাবিসহ বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ডের গলা ও হাতের কারুকাজ করা হচ্ছে। সুই-সুতা দিয়ে হাতের কারুকাজ করছে স্কুল কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীসহ গ্রামীণ গৃহবধূরা। আয়েশা আবেদ ফাউন্ডেশন, নকশী ও আড়ং ব্র্যান্ডসহ ছোট বড় অন্তত ৪০টি ব্যান্ডের পাঞ্জাবির কারুকাজ করছেন অসচ্ছল পরিবারের এসব নারী শ্রমিক।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দুই দশকের বেশি সময় আগে ব্র্যাকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আয়েশা আবেদ ফাউন্ডেশন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে গ্রামীণ নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে শুরু করে সুই-সুতার নকশার কাজ। ব্র্যাক তাদের নিজস্ব সেলস সেন্টার আড়ংয়ের মাধ্যমে নারীদের এই পোশাক বিক্রি করে। এরপর ব্যক্তিগত ও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে শুরু হয় পাঞ্জাবির ভরাট কাজ। এভাবেই গত দুই দশকে এই নকশার কাজে ঘটে গেছে নীরব বিপ্লব। শুরুর দিকে কাজটিকে ছোট করে দেখা হলেও বর্তমান সময়ে সেই দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই পাল্টে গেছে। সময়ের সাথে সাথে অনেক শিক্ষিত তরুণ-তরুণী এই কাজে জড়িয়ে পড়েছে। 

সদর উপজেলার কেওয়ারজানি গ্রামের রাবেয়া সুলতানা জানান, নকশার আকার অনুয়ায়ী একেকটি পাঞ্জাবিতে ভরাট কাজ করে পাওয়া যায় দুইশ থেকে হাজার টাকা। একেকটি পাঞ্জাবি নকশা করতে তিন থেকে চার দিন সময় লাগে। এসব ছাড়াও তারা শাড়ি, থ্রি পিস সেলাইও করে থাকেন। বাড়ির গৃহস্থালি কাজ শেষ করে সংসারের বাড়তি আয়ের জন্য এ কাজটি করছেন তারা।

একই গ্রামের কলেজছাত্রী লিবিয়া আক্তার ঢাকাটাইমসকে জানান, পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে তিনি এই কাজ করে থাকেন। আগে এই কাজে সবাই আসতে চাইতো না। এখন দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাওয়ায় অনেক শিক্ষিত তরুণীরাও এই কাজ করছেন। প্রতিমাসে চাঁর থেকে পাঁচটি পাঞ্জাবির কারুকাজ করা সম্ভব হয়। এতে দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। এ টাকা ব্যয় করা হয় ব্যক্তিগত কাজে।

সদর উপজেলার দিঘী গ্রামের রোখসানা ঢাকাটাইমসকে জানান, তার স্বামী নেই। দুই সন্তান ও মা বাবা নিয়ে তার সংসার। বাড়িতে হাঁস-মুরগি পালনের পাশাপাশি তিনি পাঞ্জাবি সেলাইয়ের কাজ করেন। এটি করে তার সংসারে বাড়তি আয় হয়।

স্থানীয় অনেক নারী শ্রমিকরা জানিয়েছেন, সুই-সুতা দিয়ে নকশা তৈরির কাজ অনেক পরিশ্রমের। পরিশ্রম অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত মজুরি দিচ্ছে না উদ্যোক্তারা। তাই মজুরি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

মানিকগঞ্জ শহরের জননী ক্রাফটস এর স্বত্বাধিকারী রফিকুল ইসলাম পরান জানান, প্রথমদিকে ব্র্যাক এই কাজটি শুরু করলেও এখন অনেক উদ্যোক্তা এই কাজ করছেন। এসব উদ্যোক্তার মাধ্যমে জেলায় প্রায় ৪০ হাজার নারী এখন সুঁই-সুতার কাজ করছেন। তাদের তৈরি এসব পোশাক ঢাকার বিভিন্ন নামিদামি শোরুমে চলে যাচ্ছে। তবে, কাজ অনুযায়ী শ্রমিকদের মজুরি দেয়া হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।

সদর উপজেলার জাগির ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাকির হোসেন ঢাকাটাইমসকে জানান, গ্রামীণ এসব নারী নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। তবে, শো-রুমগুলোর আন্তরিকতা আর ন্যায্য মজুরি পেলে এ শিল্পকে আরও উন্নত করা সম্ভব হবে।

(ঢাকাটাইমস/১৫জুন/প্রতিনিধি/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত