শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ চায় ‘হাসিমুখ’

আরিফ হাসান, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০১৮, ১৫:২৫ | প্রকাশিত : ০৯ অক্টোবর ২০১৮, ১২:২৬
প্রতিদিনি এভাবেই ব্যস্ত রাস্তায় চট বিছিয়ে পড়তে বসে যায় ‘হাসিমুখ’ স্কুলের শিক্ষার্থীরা।

‘হাসিমুখ’ একটি সমাজ সেবামূলক ও অলাভজনক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। ২০১১ সালে যাত্রা শুরু করা এ সংস্থাটি ২০১৬ সালের নভেম্বরে ‘হাসিমুখ সমাজ কল্যাণ সংস্থা’ নামে সরকারিভাবে নিবন্ধিত হয়। যাদের উদ্দেশ্য, সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও অবহেলিত শিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোচিত করা এবং তাদের নানা অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করা। এ লক্ষ্যে সংস্থাটি ‘হাসিমুখ’ নামে একটি বৈকালিক স্কুল পরিচালনা করে। শুক্রবার বাদে সপ্তাহের বাকি ছয় দিন পরিবাগ ওয়াবদা অফিসার্স কোয়াটারের সামনে বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা রাস্তায়ই চলে এটির পাঠদান।

এই সংস্থাটি থেকে বাচ্চারা ফ্রি শিক্ষা লাভের পাশাপাশি শিক্ষার যাবতীয় উপকরণও পেয়ে থাকে। স্কুল ছুটির পর প্রতিদিনই থাকে দুধ, কলা, ডিম ও পারুটির মতো পুষ্টিকর টিফিনের ব্যবস্থা। এসব ‍সুযোগ সুবিধা পেয়ে নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আসা হাসিমুখের শিশুরা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাংকার ও শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখে। কারো কারো আবার ইচ্ছা পুলিশ ও সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে দেশের সেবা করা। কিন্তু কচি কচি শিক্ষার্থীদের এসব স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে নানা প্রতিবন্ধকতা।

সোমবার রাজধানীর পান্থপথের SEL (এসইএল) সেন্টারে হাসিমুখের সঙ্গে এর পৃষ্ঠপোষকদের মত বিনিময় সভায় সেই প্রতিবন্ধকতার কথাই তুলে ধরে শিক্ষার্থীরা। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তন্বী। ‘হাসিমুখ’-এর সৃষ্টিলগ্ন থেকেই সে স্কুলটিতে পড়াশোনা করছে। তার ইচ্ছা ব্যাংকার হবে। তন্বী জানাল, শিক্ষার সব ধরণের সুযোগ সুবিধাই সংস্থাটি তাদের দেয়। এমনকী, কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হতে বা ফরম ফ্লাপ করতে না পারলে সেই ব্যবস্থা করে হাসিমুখ। এজন্য সংস্থাটির সঙ্গে জড়িত প্রতিটি স্বেচ্ছাসেবক এবং পৃষ্ঠপোষকদের প্রতি সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

পাশাপাশি তন্বী কিছু সমস্যার কথাও তুলে ধরে। সে জানায়, বৃষ্টির মৌসুমে সপ্তাহের অধিকাংশ দিনই তারা ক্লাস করতে পারে না। মাথার উপরে ছাদ না থাকায় হুট করে আসা বৃষ্টিতে পণ্ড হয়ে যায় তাদের পড়াশোনা, ভিজে যায় বই-খাতা। সমস্যা হয় তীব্র রোদেও। তার সঙ্গে যোগ হয় পিচঢালা পাকা রাস্তা থেকে বেরোনো তাপ। তাছাড়া আশেপাশের বর্জ, দুর্গন্ধ তো রয়েছেই। এছাড়া অনবরত ছুটে চলা গাড়ির হর্ণের শব্দে তাদের পড়াশোনার স্বাভাবিক মনোযোগ ব্যাহত হয়।

একই শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী মাজেদা। খুব গরীব পরিবার থেকে আসা এই মেয়েটির ইচ্ছা ভবিষ্যতে সে মেডিকেলে পড়বে, ডাক্তার হবে। মাজেদার মা অন্যের বাসায় কাজ করেন। তারপরও ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করার স্বপ্ন দেখা মাজেদা বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করছে। কিন্তু সহপাঠী তন্বীর মতো তার মুখেও শোনা গেল একই সমস্যার কথা। রোদ, বৃষ্টি, বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ ও জীবনের নিরাপত্তা। কেননা, যান চলাচলের রাস্তায় স্কুলটির পাঠদান চলায় যেকোনো সময় যেকোনো দুর্ঘটনা ঘটার শঙ্কায় থাকেন অভিভাবকসহ দায়িত্বরত স্বেচ্ছাসেবকরাও।

মত বিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন হাসিমুখের অন্যতম অভিভাবক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. নাসরিন আহমেদ, স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লি.(এসইএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আউয়াল, ওয়েল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিসের সিইও সৈয়দ নুরুল ইসলাম। আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে ছিলেন মেহেরুন্নেসা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যপক্ষ বর্ণালী হোসেন এবং ধানমন্ডি উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি নজরুল ইসলাম বাবুল।

সভার শুরুতে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন ‘হাসিমুখ সমাজ কল্যাণ সংস্থা’র সাধারণ সম্পাদক নুসরাত একা। তিনি বলেন, কবে থেকে সংস্থাটির যাত্রা শুরু, কোন শ্রেণির শিশুরা এখানে পড়তে আসে, শিক্ষা লাভের পাশাপাশি আরও কী কী সুযোগ সুবিধা তারা সংস্থাটি থেকে পেয়ে থাকে ইত্যাদি। তিনি বলেন, বাচ্চাদের আমরা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক ও ব্যাংকার হওয়ার স্বপ্ন দেখানোর পাশাপাশি প্রতিনিয়ত তাদের ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেই, নৈতিকতা শেখাই, সদা সত্য কথা বলার দীক্ষা দেই। অনুষ্ঠানে উপস্থিত হাসিমুখের শতাধিক বাচ্চা এ সময় তাদের ম্যাডামের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে এবং বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেয়।

আমন্ত্রিত অতিথিদের সকলেই তাদের বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের নানাভাবে অনুপ্রেরণা দেন। উদাহরণ হিসেবে তারা তাদের নিজেদের শৈশবের ঘটনা তুলে ধরেন। বলেন, কোথায় তারা ঘুমাতেন, কীভাবে পড়াশোনা শিখেছেন, কীভাবে জীবন যাপন করেছেন। তারা বোঝান, হাসিমুখের শিক্ষার্থীদের মতো তারাও খুব গরীব পরিবার থেকে আজকের এই অবস্থানে এসেছেন। কাজেই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাংকার হওয়ার পথে দারিদ্রতা কোনো বাধা নয়। উদ্দেশ্য সঠিক থাকতে হবে, ভালো মানুষ হতে হবে। তারা এও বোঝান, ‘ঘুমের মধ্যে আমরা যা দেখি সেটা আসলে স্বপ্ন নয়, ভবিষ্যতে যেটা হতে চাই সেটাই স্বপ্ন।’

প্রসঙ্গত, ‘হাসিমুখ সমাজ কল্যাণ সংস্থা’র নানা কাজে এসব অতিথিরা অনেকদিন ধরেই পৃষ্ঠপোষকতা করছেন। শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে তারা এ সহযোগিতার হাত আরও প্রসারিত করবেন বলে জানান। পাশাপাশি আশ্বাস দেন, আর যাতে রোদে পুড়ে বা বৃষ্টিতে ভিজে ক্লাস করতে না হয়, দ্রুত সেই ব্যবস্থাও করবেন। সভার শেষ পর্যায়ে আমন্ত্রিত সকল অতিথিদের হাতে বিশেষ সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেন ‘হাসিমুখ সমাজ কল্যাণ সংস্থা’র স্বেচ্চাসেবকরা। পরে সমাপনী বক্তব্য দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করেন সংস্থাটির কোষাদ্যক্ষের দায়িত্বে থাকা জুলকার নাইন।

প্রসঙ্গত, বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নেও সোচ্চার ‘হাসিমুখ সমাজ কল্যাণ সংস্থা’। এ লক্ষ্যে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সংস্থাটির পক্ষ থেকে একটি কম্পিউটার ল্যাব পরিচালনা করা হচ্ছে। সেখান থেকে বাচ্চারা শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি জ্ঞানেও নিজেদের সমৃদ্ধ করতে পারছে। এম ল্যাবের সহযোগিতায় পাওয়া ১৪টি ল্যাপটপের মাধ্যমে প্রতিদিনই বাচ্চাদের আইটি প্রশিক্ষণ দেন সংস্থাটিতে দায়িত্বরত স্বেচ্ছাসেবকরা। প্রেরণা দেন নতুন স্বপ্ন দেখার ও তা পূরণের।

ঢাকাটাইমস/০৯ অক্টোবর/এএইচ

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজধানী বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত