‘অপ্রয়োজনীয়’ কাশির ওষুধে নিষেধাজ্ঞা তোলা নিয়ে প্রশ্ন

আশিক আহমেদ, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৩ জুন ২০১৯, ১৫:২০ | প্রকাশিত : ১৩ জুন ২০১৯, ১১:৩৩
ফাইল ছবি

গলায় খুশখুশে কাশি। ভীষণ বিরক্তিকর। যার এই সমস্যা, তিনি ওষুধ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। চার দশক ধরে ছাত্র পড়ান ওষুধ প্রযুক্তি নিয়ে। কয়েকজন শুভাকাঙক্ষী নামীদামি কোম্পানির দুটি কাশির সিরাপ দিলেন তাকে। কিন্তু ওই অধ্যাপক সেই সিরাপ খাননি। কারণ, তার বিবেচনায় এটি অপ্রয়োজনীয়, অকার্যকর, ক্ষতিকর। শেষমেশ ওষুধ ছাড়াই আরোগ্য লাভ করলেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিকাল ফার্মেসি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক মুনিরউদ্দিন আহমেদের অভিজ্ঞতা এটি। কাশির পাশাপাশি জ্বর ছিল তার। শুকনা কাশি বিরক্তিকর ও কষ্টদায়কও। বেশ কয়েক রাত ঘুমাতেই পারলেন না। তার অভিজ্ঞতা বলে, এটি ভাইরাসের কারণে হয়েছে। আর ভাইরাস কোনো ওষুধে ভালো হয় না।

এর মধ্যে কয়েকজন তাকে বললেন, ওষুধ ছাড়া এই কাশি ভালো হবে না। কিন্তু অধ্যাপক মুনিরের ওষুধ বিষয়ে জ্ঞান বলে, যেখানে অ্যান্টিবায়োটিক কিছু করতে পারে না, সেখানে এসব কফ সিরাপ ভাইরাসের বিরুদ্ধে কিছুতেই কার্যকর হতে পারে না।

‘বিছানার পাশে সিরাপ দুটো সাজিয়ে রাখলাম। খোলা হলো না, খাওয়াও হলো না। সিরাপগুলোর দিকে চোখ পড়লেই আমার মনে হতো- এগুলো রাবিশ। তবে আমি সত্য, না কফ সিরাপ সত্য- আমি তা দেখে ছাড়ব। আমি অপেক্ষা করব এবং তারপর দেখব কাশি এমনিতেই ভালো হয় কি না। এক সপ্তাহ পর দেখলাম- কাশির উন্নতি হচ্ছে, দিন দশেক পর মোটামুটি কাশি মুক্ত হয়ে গেলাম।...এখন এই টপ ব্র্যান্ডের সিরাপ দুটো নিয়ে কী করব তা নিয়ে আমার চিন্তার শেষ নেই’- নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলে যান জ্যেষ্ঠ এই অধ্যাপক।

এই বিশেষজ্ঞ ওষুধের খুঁটিনাটি জানেন, কিন্তু যারা জানেন না? চিকিৎসকের পরামর্শে বা পরামর্শ ছাড়াই দোকান থেকে কিনে আনছেন কাশির শিরাপ। পয়সা নষ্ট হচ্ছে। কাশি দূর হচ্ছে স্বাভাবিক নিয়মে, কিন্তু কৃতিত্ব পাচ্ছে ওষুধ।

অকার্যকর এবং ক্ষতিকর উপাদান দিয়ে বানানো- এই বিবেচনায় ৮২ সালের ওষুধ নীতিতে নিষিদ্ধ করা হয় কাশির সিরাপ। এর মধ্যে ছিল তুসকা, ডেক্সপোটেনসহ অসংখ্য ওষুধ। তবে ওষুধ কোম্পানিগুলোর দেন-দরবারে ২০০৫ সালে এক দফা এবং পরে ২০১২ সালে আরেক দফা ছাড় দেওয়া হয়। তার নাম পাল্টে নতুন নামে আসে ওষুধগুলো। যেমন তুসকার নাম পাল্টে হয়েছে ‘তুসকা প্লাস’ ও কফের নাম পাল্টে হয়েছে ‘ওকফ’।

রাজধানীর হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালের বহির্বিভাগের ফার্মেসিতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেখানে তুসকা প্লাস, বাসক তুলসীসহ ১০ থেকে ২০ ধরনের কাশির সিরাপ পাওয়া যায়। দোকানি নিজের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমরা এখানে প্রেসক্রিপশন দেখে ওষুধ বিক্রি করি। চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্রে যা লেখেন, আমরা তা দেখে ওষুধ দেই।’

ইস্কাটন গার্ডেন এলাকায় আল জাবের ফার্মা নামের একটি ওষুধের দোকানে অ্যাডোভাস, ওকফ, টুসকেল, মিরাটেন, মিউকেসফেল, অ্যামব্রক্স মিউকোলিটসহ ১৫ থেকে ২০ ধরনের কাশির সিরাপ বিক্রি হয়। ওই দোকানি বলেন,  মিরাটেন, ওকফ ও তুসকা প্লাসের চাহিদা বেশি।

ক্লিনিকাল ফার্মেসি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মুনিরুদ্দীন আহমেদ ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘কফ সিরাপ খেয়ে তারা কীভাবে সুস্থ হচ্ছেন তার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ অন্তত আমার জানা নেই। ওষুধ কম্পানি বা চিকিৎসকেরা কী দিতে পারেন এর ব্যাখা? বা কপ সিরাপ প্রস্তুতকারক আমাদের কোনো ফার্মাসিস্ট? জানার অপেক্ষায় রইলাম।’

যদি কফ সিরাপ কাজ না করে থাকে তবে এসব অকার্যকর ওষুধ বাজারে কেন এলো, কীভাবে এলো- এমন প্রশ্ন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও কর্মকর্তাদের প্রতি ছুড়ে দেন এই বিশেষজ্ঞ।

অধ্যাপক মুনিরের প্রশ্ন, ‘এসব নিষিদ্ধ ওষুধ বাজারে কারা কেন আনছে আপনারা কি গভীরে তলিয়ে দেখেছেন? আমি ৪২ বছর ধরে ওষুধ প্রযুক্তি নিয়ে পড়াই। ওষুধ নিয়ন্ত্রণ কমিটিতে কি আমাকে বা আমার মতো কাউকে রাখা হয়েছে। বাজারে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ রয়েছে তা দেখার দায়িত্ব কাদের? কেন অপ্রয়োজনীয় ওষুধ বাজারে আসে?’

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক রুহুল আমিন ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘তুসকা ও ওকফ সিরাপ যে ক্ষতিকর উপাদানের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তারা এখন সেসব ক্ষতিকর উপাদান ছাড়াই ওষুধ তৈরি করছে। এ কারণে এসব ওষুধের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।’ 

১৯৮২ সালের ওষুধ নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা চিকিৎসক জাফরুল্লাহ চৌধুরীও এসব কাশির ওষুধ বাজারে দেখে ভীষণ বিরক্ত। তিনি বলেন, ‘সরকারের অবহেলার কারণে নিষিদ্ধ ওষুধ এখন বাজারে বৈধ হিসেবে বিক্রি করছে। আর চিকিৎসকেরাও ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে উপঢৌকন পেয়ে এসব অপ্রয়োজনীয় ওষুধ লেখে। তবে সরকার যদি আন্তরিক হয় তাহলে এসব অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব।’

জানতে চাইলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘অনেকগুলো কাশির সিরাপ আমাদের এখানে অনুমোদন রয়েছে। অনুমোদিত ওষুধ বিক্রি হতেই পারে।’

ঢাকাটাইমস/১৩জুন/এএ/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :