হাওরের কৃষকদের কান্না শোনার কেউ নেই

জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া, সুনামগঞ্জ
 | প্রকাশিত : ১৯ আগস্ট ২০১৯, ১৬:৪৮

হাওরাঞ্চলে বছরে একটি মাত্র ফসল বোরো ধান। দাদন নিয়ে ও মহাজনি ঋণ করে কৃষকেরা জমি চাষ করেন প্রতি বছর। ঋণ পরিশোধের সেই তাগাদা সইতে না পেরে বৈশাখে ধান কাটার শুরুতেই বহু কৃষক উঠান থেকেই প্রতি মণ ধান ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা দরে বিক্রি করে দিয়েছেন। কৃষকের ঘরে যে ধান আছে, তাও এখনো ন্যায্যমূল্যে সরকারিভাবে খাদ্য গোদামে বিক্রি করতে পারছেন না। ফলে জেলার সাড়ে তিন লাখ কৃষকের ভাগ্য বদলায়নি আজো। প্রতি বছরই এমন অবস্থায় কৃষকের কান্না শোনার যেন কেউ নেই।

সুনামগঞ্জের ১১টি উপজেলায় কৃষকেরা সরকারি খাদ্যগুদামে ন্যায্যমূল্যে ধান বিক্রি করতে গিয়ে তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরছে এখন লটারিতে। লটারি ছাড়া বাকি কৃষকেরা সরকারি খাদ্যগুদামে উৎপাদিত ধান বিক্রি করতে না পারায় চরম হতাশায় ভুগছেন।

এদিকে সরকার চাল কেনার বদলে ধান কেনার দাবিতে চলতি বছর জেলাজুড়ে বিভিন্ন সংগঠন মানববন্ধন, প্রতিবাদ সভাসহ নানাভাবে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে।

সরকারি নীতিমালা ও চাহিদা অনুয়ায়ী যেসব প্রান্তিক, ভূমিহীন ও নারী কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার কথা রয়েছে, কিন্তু লটারির কারণে সরকারি খাদ্যগুদামে ধান বিক্রি করতে না পারায় চরম হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন তারা। ধানের দাম উৎপাদন খরচের চেয়ে কম হওয়ায় ভবিষ্যতে অনেক কৃষকই ধান চাষ ছেড়ে দিতে পারেন বলে আশঙ্কা করছে জেলার সচেতন মহল।

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার কৃষক সাজিদ মিয়া জানান, সরকার সময়মতো কৃষকের ধান না কেনায় বাধ্য হয়ে কম দামে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেছেন। সরকারিভাবে যে পরিমাণ ধান কেনা হচ্ছে তাও একেবারে কম। ধানের চেয়ে চাল কেনা হচ্ছে বেশি। চাল কিনলে তো কৃষকের কোনো লাভ নেই। সরকার যদি এ বিষয়ে ভালো সিদ্ধান্ত না নেয়, তাহলে কৃষকেরা ধান ফলাতে আগ্রহ হারাবে। এতে হাওরে ধানের উৎপাদনও কমে যাবে।

তাহিরপুর উপজেলার মাটিয়ান হাওরপাড়ের কৃষক হাসান মিয়া জানান, সরকারি খাদ্যগুদামে ধান বিক্রির আশায় ছিলাম। এখন লটারির মাধ্যমে যাদের নাম ভাসছে শুধু তাদের ধানেই সরকারি খাদ্যগুদামে নেয়া হচ্ছে। ধান বিক্রি নিয়ে এখন যে অবস্থা তাতে ধান চাষ না করাই ভাল।

জামালগঞ্জের পাকনা হাওরের কৃষক তোফাজ্জল মিয়া বলেন, ‘এবার ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচই পাইনি। এখন ঋণ দেয়া, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনাসহ অন্য খরচ মেটাব কীভাবে।’

জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ধান-চাল ক্রয় কমিটির সভাপতি প্রিয়াংকা পাল বলেন, ‘সম্প্রতি বন্যার কারণে ধান কেনায় কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। বন্যার পর কৃষি অফিসের তালিকা অনুযায়ী সবার উপস্থিতিতে লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনা চলছে।’

তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণ সিন্দু চৌধুরী বাবুল বলেন, ‘কৃষকদের বাঁচাতে বর্তমান সরকার সবরকম সহযোগিতা করছে, ভবিষ্যতেও করবে। সরকারি খাদ্য গোদামে প্রকৃত কৃষকরাই ধান দিবে। এর ব্যাতিক্রম হলে এর সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে  কঠিন  ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জাকারিয়া মোস্তফা বলেন, ‘গত ২৯ এপ্রিল ধান কেনার নির্দেশনা আসে। ১৮ মে কৃষক তালিকা পেয়েছি। ১৮ জুন দ্বিতীয় দফায় ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়। এ সময় বন্যা দেখা দেয়ায় ধান কিনতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ধান কেনার শেষ সময়সীমা হলেও সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন করা হবে।’

প্রসঙ্গত, জেলায় এবার বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই লাখ ১৭ হাজার ৪৩৫ হেক্টর। আবাদ হয়েছে দুই লাখ ২৪ হাজার ৪০ হেক্টর। ধান উৎপাদন হয়েছে ১৩ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টন।

জেলার সাড়ে তিন লাখ কৃষকের উৎপাদিত ১৩ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টন ধানের মধ্যে ৭ আগস্ট বুধবার পর্যন্ত জেলার সব কটি ক্রয় কেন্দ্র মিলে ধান কেনা হয়েছে সাত হাজার ৪৮৬ টন।

মিলারদের কাছ থেকে জেলায় এবার আতব চাল কেনা হবে ১৭ হাজার ৭৯৮ টন এবং সিদ্ধ চাল কেনা হবে ১৪ হাজার ১৭৯ টন। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এই ধান কেনা চলবে। সব মিলিয়ে ধান কেনার কথা ১৭ হাজার ৩৫৩ টন।

(ঢাকাটাইমস/১৮আগস্ট/এলএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :