নবায়নযোগ্য জ্বালানিই ভবিষ্যতের পথ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট এবং বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা

মোস্তফা আল মাহমুদ
  প্রকাশিত : ০৫ মার্চ ২০২৬, ১৭:৪৩| আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২৬, ১৭:৪৫
অ- অ+

বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার উৎস আজ জ্বালানি। ইতিহাস বলে, পৃথিবীর অধিকাংশ যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পেছনে জ্বালানি নিরাপত্তা একটি বড় কারণ। বর্তমান সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা আবারও সেই বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার বড় অংশ এখনো আমদানির ওপর নির্ভরশীল। এই প্রেক্ষাপটে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর করা সময়ের দাবি।

কেন জ্বালানি সংকট তৈরি হচ্ছে

বাংলাদেশের নিজস্ব জ্বালানির প্রধান উৎস হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। কিন্তু দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে মজুদ দ্রুত কমছে। গত এক দশকে উৎপাদন ধীরে ধীরে কমে এসেছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই দৈনিক উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে।

বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন প্রায় ২০০০–২১০০ এমএমসিএফটি, অথচ চাহিদা ৩৮০০–৪০০০ এমএমসিএফটির কাছাকাছি। ফলে বড় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

এই ঘাটতি পূরণ করতে বাংলাদেশকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি (Liquefied Natural Gas) আমদানি করতে হচ্ছে। কিন্তু এই এলএনজির বড় অংশ আসে হরমুজ প্রণালি হয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। বৈশ্বিক সংঘাতের সময় এই রুট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। বিকল্প উৎস যেমন যুক্তরাষ্ট্র বা আফ্রিকা থেকে এলএনজি আমদানি করলে পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

অন্যদিকে,

• কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বিদেশি কয়লার ওপর নির্ভরশীল।

• ডলার সংকটের কারণে অনেক সময় আমদানি ব্যাহত হয়।

• দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তিতেও জটিলতা দেখা যায়।

বাংলাদেশে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থাকলেও উত্তোলন সীমিত এবং সম্প্রসারণ সময়সাপেক্ষ।

তেল ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানিতেও একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের বার্ষিক জ্বালানি আমদানি বিল প্রায় ১৪-১৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

এলএনজি আমদানির জন্য বর্তমানে দুটি Floating Storage Regasification Unit (FSRU) কার্যকর রয়েছে, যার সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ১ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রতিদিন। কিন্তু এগুলো ইতোমধ্যেই প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহৃত হচ্ছে।

অন্যদিকে, নতুন অবকাঠামো যেমন-

• চট্টগ্রাম-ঢাকা তৃতীয় প্যারালাল গ্যাস পাইপলাইন

• ল্যান্ড-বেসড এলএনজি টার্মিনাল

• নতুন রিফাইনারি বা বিদ্যমান রিফাইনারির সম্প্রসারণ

সবই সময় ও বড় বিনিয়োগের বিষয়।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের করণীয়

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ জরুরি।

প্রথমত, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বেসলোড বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি কয়লা সরবরাহ চুক্তির মাধ্যমে জ্বালানি নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, এলএনজিকে দ্বিতীয় উৎস হিসেবে বিবেচনা করে ল্যান্ড-বেসড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ এখনই নিতে হবে।

তৃতীয়ত, দ্রুত তৃতীয় প্যারালাল গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ শুরু করা প্রয়োজন।

চতুর্থত, ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে একটি সাহসী সিদ্ধান্তে পৌঁছানো দরকার।

পঞ্চমত, দেশীয় গ্যাস ও তেল অনুসন্ধানে ব্যাপক বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। নতুন কূপ খনন ও অফশোর অনুসন্ধান জোরদার করা জরুরি।

ষষ্ঠত, ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো প্রয়োজন।

সপ্তমত, ভোলার গ্যাসকে দীর্ঘদিন আলাদা রেখে না দিয়ে রিভার-ক্রসিং পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সংযুক্ত করা যেতে পারে।

এছাড়া বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা জরুরি। কারণ নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকৃতিগতভাবে পরিবর্তনশীল (variable) হওয়ায় গ্রিড স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি কেন আশীর্বাদ

বিশ্বের অনেক আমদানিনির্ভর দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে এখন কৌশলগত আশীর্বাদ হিসেবে বিবেচনা করছে। কারণ সূর্য ও বাতাসের শক্তি স্থানীয় এবং সীমাহীন।

বাংলাদেশেও এই সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সৌর শক্তির সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য। দেশের গড় সৌর বিকিরণ ৪-৫ kWh/m²/day, যা সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত।

১. রুফটপ সোলারের বিপুল সম্ভাবনা

বাংলাদেশে শিল্প-কারখানা, বাণিজ্যিক ভবন ও আবাসিক ভবনের ছাদ ব্যবহার করে সহজেই ৩০০০-৪০০০ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার স্থাপন করা সম্ভব।

এর জন্য প্রয়োজন:

• সোলার সরঞ্জাম আমদানিতে শূন্য শুল্ক

• সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি ব্যাংক ঋণ

• সুদের হার ৫% এর নিচে

• SREDA ও BSTI-র অনুমোদন ৭ দিনের মধ্যে।

এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে বিনিয়োগের বড় অংশ আসবে প্রাইভেট সেক্টর থেকে, ফলে সরকারের আর্থিক চাপও কম থাকবে।

২. ইউটিলিটি-স্কেল সোলার ও উইন্ড

জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে অকৃষি খাস জমি চিহ্নিত করে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে ইউটিলিটি-স্কেল সোলার ও উইন্ড প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

যদি সরকার জমি ও ট্রান্সমিশন সুবিধা নিশ্চিত করে, তাহলে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ৭-৮ টাকা প্রতি ইউনিট পর্যন্ত নামিয়ে আনা সম্ভব।

৩. সোলার ইরিগেশন

বাংলাদেশে প্রায় ১৫ লাখ ডিজেলচালিত সেচপাম্প রয়েছে। এগুলোকে ধীরে ধীরে সৌরচালিত পাম্পে রূপান্তর করা গেলে বছরে বিপুল পরিমাণ ডিজেল আমদানি কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে।

৪. নদীভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ

বাংলাদেশের বড় নদীগুলোর বিস্তৃত চরাঞ্চল রয়েছে, বিশেষ করে যমুনা নদীতে। পরিকল্পিতভাবে নদী ব্যবস্থাপনার সাথে সমন্বয় করে নদীর নির্দিষ্ট এলাকায় সোলার প্রকল্প ও ল্যান্ড রিক্লেমেশন করা গেলে বহু ধরনের উপকার পাওয়া যেতে পারে— যেমন নদীভাঙন রোধ, নৌপরিবহন উন্নয়ন, মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পর্যটনের সুযোগ।

৫. ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ

নবায়নযোগ্য জ্বালানির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে Battery Energy Storage Systems (BESS) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রযুক্তিকে শুল্কমুক্ত আমদানির সুযোগ দিলে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত বিনিয়োগে আগ্রহী হবে।

৬. বিনিয়োগবান্ধব নীতি

বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে Power Purchase Agreement (PPA) এবং Implementation Agreement (IA) আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও ব্যাংকযোগ্য হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের জ্বালানি ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সাহসী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ওপর। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় জ্বালানি আমদানির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ।

এই বাস্তবতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি কেবল পরিবেশবান্ধব বিকল্প নয়, বরং এটি জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হতে পারে।

তবে এই রূপান্তরের পথে কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বাধা আসতে পারে। তাই সময়ের দাবি হলো শক্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নীতিগত সাহস এবং সমন্বিত উদ্যোগ।

সঠিক নীতি সহায়তা পেলে বাংলাদেশ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে একটি শক্তিশালী উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।

লেখক: প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন।

(ঢাকাটাইমস/৫মার্চ/মোআ)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
পদোন্নতি না পেয়ে পদত্যাগ করলেন সিআইডির ভারপ্রাপ্ত প্রধান আলী আকবর?
আদ-দ্বীন হাসপাতালে ৬ নবজাতকের মৃত্যু: হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি
ডিবি উত্তরা বিভাগের ডিসি হলেন ইলিয়াস কবির
ঢাকার সড়কে এআই নজরদারিতে এক মাসে ৬৭২ মামলা, মোট জরিমানা প্রায় ৯ কোটি
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা