স্কুলে শহীদ মিনার নির্মাণ

ফলকে মুক্তিযোদ্ধা বাবার নাম রাখায় কারাগারে স্কুলশিক্ষক!

ব্যুরো প্রধান, রাজশাহী
 | প্রকাশিত : ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ২১:৫১

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার রঘুনাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনারের উদ্বোধনী ফলকে মুক্তিযোদ্ধা নাম লেখাকে কেন্দ্র করে ছেলে স্কুলশিক্ষক মাজেদুর রহমানকে পিটিয়ে পুলিশে দিয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশ। একই সঙ্গে স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদকেও মারপিট করা হয়েছে।

পরে শিক্ষক মাজেদুরের বিরুদ্ধে পঞ্চম শ্রেণির এক ছাত্রীর শ্লীলতাহানির অভিযোগে থানায় মামলা করা হয়েছে।

আজ বুধবার দুপুরে সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে মাজেদুরকে আদালতে পাঠায় পুলিশ। এ নিয়ে স্থানীয় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।

জানা যায়, স্কুল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় লোকজনের আর্থিক সহযোগিতায় স্কুলে একটি শহীদ মিনার নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ। আগামী ১৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে এটি উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে। গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী এই শহীদ মিনার নির্মাণে আর্থিক সহায়তা প্রদানকারীদের অন্যতম।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার নাম শহীদ মিনার নির্মাণকাজের উদ্বোধনী ফলকে ব্যবহার করে স্কুল কর্তৃপক্ষ। তাতে স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের একটি অংশ ক্ষুব্ধ হন। সরাসরি আপত্তি জানান পুঠিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান জি এম হিরা বাচ্চু। এটি দ্রুত সমাধান করে নিতে প্রধান শিক্ষককে নির্দেশ দেন তিনি। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দুটি পক্ষ হয়ে যায়। গত সোমবার উপজেলা চেয়ার‌্যান জি এম হিরা বাচ্চু প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেন।

দুই পক্ষের মধ্যে টানাপোড়েন শুরু হলে ওই স্কুলের শিক্ষক এবং মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলীর ছেলে মাজেদুর রহমান সোমবার বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করেন। শহীদ মিনারের  উদ্বোধনী ফলক থেকে তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলীর নাম যাতে ফেলা না হয় সে জন্য তিনি জোর প্রচেষ্টা চালান। তিনি স্থানীয় শিক্ষা অফিসারের সঙ্গেও কথা বলেন। পরদিন তার বিরুদ্ধে পঞ্চম শ্রেণির এক ছাত্রীর শ্লীলতাহানির অভিযোগ তোলেন স্থানীয় একটি অংশ।

ওইদন রাত ১০টার দিকে ১০-১২ জন মিলে তাকে এলোপাতাড়ি মারপিট করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। একই সময় তারা ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অবুল কালাম আজাদের বাড়িতে গিয়ে তাকেও এলোপাতাড়ি মারপিট করে।

প্রধান শিক্ষক অবুল কালাম আজাদ জানান, ‘শহীদ মিনারে মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলীর নামফলক নিয়ে একটা আপত্তি উঠেছিল। আমাকে এই নামফলক নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যানও আপত্তি জানান। আমি তাকে মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলীর নাম ব্যবহারের ব্যাখ্যা জানাই। বিষয়টি নিয়ে আমি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গেও যোগাযোগ করেছি।’

তার স্কুলের কোনো ছাত্রীর শ্লীলতাহানির বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান প্রধান শিক্ষক। তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষক শ্লীলতাহানির বিষয়টি আমাকে জানিয়ে তার বাসায় ডাকেন। মঙ্গলবার রাতে তাদের বাসায় বিষয়টি সমাধানের জন্য ছেলে ও মেয়েপক্ষকে ডাকা হয়। সেখানে আলোচনা শেষে সবাই যখন বেরিয়ে যাচ্ছিল তখন শুনি আমার বাড়িতে হামলা হচ্ছে। আমি সেখানে গিয়ে শুনতে পাই ওরা আমাকে মারার জন্য খুঁজছে। আমি বাড়িতে না ঢুকে পাশের একটি জমিতে গিয়ে দাঁড়ায়। ওরা ১০-১২ জন সেখানে গিয়ে লাঠি দিয়ে আমার মাথা, কোমর ও পায়ে আঘাত করে।’

শ্লীলতাহানি নয়, নামফলকে তার নাম থাকায় প্রভাবশালী পক্ষ ছেলের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করেছে বলে দাবি মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলীর। তিনি বলেন, ‘শহীদ মিনারে আমার নাম থাকার ইস্যু নিয়েই ওরা মাজেদুরকে মারপিট করেছে। ও যাতে এ নিয়ে না এগোয় এ জন্য ওর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হয়েছে। প্রভাবশালীরা এটা করছে।’ তিনি দাবি করেন, স্কুলে একসঙ্গে অনেকজন প্রাইভেট পড়ে। সেখানে শ্লীলতাহানির অভিযোগ মিথ্যা।

পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রেজাউল করিম বলেন, শিক্ষক মাজেদুর রহমানকে পিটিয়ে পুলিশে দেয় গ্রামবাসী। পরে থানায় মেয়ের বাবা বাদী হয়ে মামলা করেন। সেই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে জেল হাজতে পাঠানো হয়।

উপজেলা শিক্ষা অফিসার মীর মো. মামুনুর রহমান জানান, শহীদ মিনারে নামফলক নিয়ে বিরোধের বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন তিনি।

দুটি ঘটনার কথাই শুনেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. অলিউজ্জামান। ঢাকাটাইমসকে তিনি বলেন, ‘একটি ঘটনার সঙ্গে আরেকটির যোগসূত্র আছে কি না সেটি খতিয়ে দেখা হবে। বিষয়টি খোঁজ নেয়ার জন্য পুলিশকে বলেছি। দুই পক্ষের সঙ্গে আমরা আগামী সোমবার বসব। সেখানে এ নিয়ে আলোচনা হবে।’

এ বিষয়ে কথা বলতে আজ দুপুরে উপজেলা চেয়ারম্যান জি এম হিরা বাচ্চুর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। তবে ফলকে মুক্তিযোদ্ধার নাম নিয়ে আপত্তির বিষয়ে গত সোমবার তার সঙ্গে কথা হয়। সেদিন তিনি দাবি করেছিলেন, প্রধান শিক্ষককে নামফলক ভাঙার বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি বা কোনো ধরনের আপত্তিও করেননি।

(ঢাকাটাইমস/১৬অক্টোবর/মোআ)

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :