কাউন্সিলর রাজীব লাপাত্তা, উধাও নেতাকর্মীরাও

কাজী রফিক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ২৩:৩৮ | প্রকাশিত : ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ২২:৫৪

ক্যাসিনোকাণ্ডে নাম আসার পরই লাপাত্তা হয়ে গেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীব। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, রাজীব কাউন্সিলর হওয়ার পর বছর চারেকে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। বর্তমানে তার সম্পদের পরিমাণ শত কোটি টাকা।নিজেকে ‘জনতার কমিশনার’ আখ্যা দেওয়া রাজীবের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ উঠছে একের পর এক। একই সঙ্গে চাঁদা আদায় করেছেন বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে।

এসব কাজে তাকে সহযোগিতা করার জন্য গড়ে তোলেন বেশ কয়েকটি দল। একেকটি দল একেক ক্ষেত্রে রাজীবের হয়ে কাজ করত। গা ঢাকা দিয়েছেন এসব নেতাকর্মীও।গত ১২ অক্টোবর  থেকে খোঁজ মিলছে না ওয়ার্ড কাউন্সিলর রাজীবের। তার বাসাসহ সম্ভাব্য কোথাও তার দেখা নেই। এমনকি কারও ফোনও ধরছেন না এই জনপ্রতিনিধি। তার নিয়ন্ত্রিত যুবলীগ ও ঘনিষ্ঠদের যত কার্যালয় রয়েছে, সবগুলোতে তালা ঝুলছে।

গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল, রাজীব র‌্যাবের হাতে আটক হয়েছেন। দুই দিন পর শোনা যায় তিনি পুলিশের কোনো বড় কর্মকর্তার সহযোগিতায় পুরনো মামলায় স্বেচ্ছা-আটক হয়েছেন, যাতে চলমান শুদ্ধি অভিযানে র‌্যাব তাকে আটক করতে না পারে।

শনিবার স্থানীয় যুবলীগের বিভিন্ন কার্যালয় ঘুরে দেখা যায়, এলাকা দাপিয়ে বেড়ানো এসব কার্যালয় ও এর আশপাশ খা খা করছে। নেই কোনো নেতাকর্মী। কোনো কোনো কার্যালয়ের বাইরে তালা ঝুঁলছে।

চিত্র পাল্টে গেছে বেড়িবাঁধ তিন রাস্তার মোড়ের সিএনজি কামালের কার্যালয়ের। সেখানে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নেতাকর্মীদের আনাগোনা ও আড্ডা ছিল, সেখানে এখন সুনসান নীরবতা। কার্যালয়ে তালা ঝুলছে।

রাজীবের ডান হাত হিসেবে পরিচিত যুবলীগ নেতা শাহ আলম জীবন। স্বঘোষিত ‘জননেতা’। তার কাটাসূরের কার্যালয় তালাবদ্ধ। স্থানীয় লোকজন জানান, কার্যালয়ের ভেতরে ও বাইরে নেতাকর্মীদের যে সার্বক্ষণিক ভিড় লেগে থাকত, এখন আর তা দেখা যায় না। গত দুই দিন ধরে তালা।

নেতাকর্মীদের দেখা নেই বছিলা রোডের যুবলীগ কার্যালয়েও। এ ছাড়া বছিলা নতুন রাস্তার পাবলিক টয়লেটের পাশের কার্যালয়ের সাইনবোর্ড ঢেকে দেয়া হয়েছে সাদা কাপড় দিয়ে। নেই নেতাকর্মী।

স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, রাজীবের ডানহাত শাহ আলম চৌধুরী জীবন একসময় মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের সুপার মার্কেটের সোয়েটার কারখানার কর্মচারী ছিলেন। যুবলীগে যোগ দিয়ে বনে যান ‘জনতার নেতা’। রাজীবের হয়ে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী লালন, জমি দখল করেন তিনি।

কাটাসুর এলাকায় শাহ আলমের কার্যালয়। যে জমিতে তিনি আলিশান কার্যালয় গড়েছেন, তা কোনো সরকারি বা নিজেদের ব্যক্তিগত জমি নয়। অন্যের জমি দখল করে সেখানে কার্যালয় গড়েছেন এই যুবলীগ নেতা- এমন অভিযোগ আছে স্থানীয় পর্যায়ে।

গণমাধ্যমে রাজীবের অপকর্মের কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশ পেলে নিরুদ্দেশ হন শাহ আলম চৌধুরী জীবন।

শাহ আলমের মতো রাজীবের আরেক শক্তি কামাল হোসেন ওরফে সিএনজি কামালও লাপাত্তা। বেড়িবাঁধ তিন রাস্তার মোড় এলাকায় রয়েছে তার একটি রাজনৈতিক কার্যালয়। সেখানে তিনি নিয়মিত বসেন।

বেড়িবাঁধে ইজিবাইক থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলা হয় সিএনজি কামালের নির্দেশে। বছিলা যাওয়ার সড়কের সামনে থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশার স্ট্যান্ড হানিফ কোম্পানির বাড়ির সামনে সরিয়ে আনা হয়েছে কাউন্সিলর রাজীবের নির্দেশে। আর এসব অটোরিকশা থেকে প্রতিদিন তোলা হয় বিপুল পরিমাণ চাঁদা। চাঁদা আদায় হয় বেড়িবাঁধ সড়কে চলাচলকারী লেগুনা, বাস থেকেও।

বছিলা নতুন রাস্তার ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলোর হর্তাকর্তাও কামাল। দোকানপ্রতি এককালীন এক থেকে তিন হাজার টাকা নিয়ে সড়ক দখল করে হকার বসিয়েছেন কামাল। প্রতি দোকান থেকে প্রতিদিন আদায় হয় এক থেকে দেড় শ টাকা হারে। এখানে দোকান রয়েছে পাঁচ শতাধিক।

আশিকুজ্জামান রনি, ফিরোজ আহমেদ ফিরু, ফারুক ও রাজীবের শ্যালক ইমতিহান হোসেন ইমতিসহ আরও বেশ কজন নেতার দেখা নেই দুদিন ধরে। তারা ভূমি দখলদার, সন্ত্রাসী ও ছিনতাইকারী লালনকারী হিসেবে পরিচিত এলাকায়।

আটক আতঙ্কে এলাকা ছেড়েছে আরও কয়েকজন নেতা। বেড়িবাঁধের পশ্চিমে ওয়ার্ডের বর্ধিতাংশের একটি এলাকা সাত মসজিদ হাউজিং। এ এলাকার ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাং সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ করেন জাকির হোসেন উকিল।

জাকির স্থানীয়ভাবে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী বসির হত্যা মামলার প্রধান আসামি। দীর্ঘদিন জেল হাজতে থাকার পর জামিনে মুক্ত হয়ে ডিশ ব্যবসা করার পাশাপাশি স্থানীয় সন্ত্রাসীদের ওপর আবার কর্তৃত্ব স্থাপন করেন এই নেতা। গণমাধ্যমে রাজীবের কর্মী হিসেবে তার নাম আসায় গতকাল এলাকা ছাড়েন তিনি।

ছিনতাইকারী নিয়ন্ত্রকদের আরেকজন শাহিন।  জমি দখলে রাজীবকে সহযোগিতা করতেন নাজমা। তারাও পালিয়েছেন।

২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন যুবলীগ নেতা তারেকুজ্জামান রাজীব। দলীয় প্রার্থীকে হারিয়ে জয়ী হন তিনি। তারপর থেকে অপরাধকর্মে তার বেপরোয়া হয়ে ওঠার সূচনা।

কাউন্সিলর হওয়ার পর রাজীবের লোকজন পাইন আহমেদ নামের একজন মুক্তিযোদ্ধাকে মারধর করেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মোহাম্মদপুর থানা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়কের পদ থেকে বহিষ্কার হয় তিনি। পরে ওই আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। বর্তমানে তিনি মহানগর উত্তর যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।

কাউন্সিলর হওয়ার পরে নামেরও ভিন্নতা আসে রাজীবের। তারেকুজ্জামান রাজীব থেকে ‘টিজেড রাজীব’। এরপর ‘লায়ন টিজেড রাজীব’ বনে যান এই কাউন্সিলর। যদিও পরে নিজের নামের পাশ থেকে ‘লায়ন’ শব্দটি নিজেই সরিয়ে নেন।

সামান্য টাকায় ভাড়ায় থাকা রাজীব এখন বেশ কয়েকটি জমি, বিলাসবহুল বাড়ি, বিশ্বের প্রথম সারির বিলাসবহুল গাড়ির মালিক। সিটি করপোরেশন থেকে কাউন্সিলর হিসেবে মাসে ৩৬ হাজার টাকা সম্মানী ছাড়া আর কোনো দৃশ্যমাণ আয় নেই এই ওয়ার্ড কাউন্সিলরের।

(ঢাকাটাইমস/১৯অক্টোবর/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজধানী বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :