ঢাকার মেয়র নির্বাচন কি বৈধ?

মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু
| আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৩:৪৭ | প্রকাশিত : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৩:৩৩
মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু

ঢাকার মেয়র নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে এখন সরকার ও বিরোধীদল পক্ষে-বিপক্ষে বক্তব্য দিয়ে আসছে। বিরোধী দলের মতে সম্প্রতি হয়ে যাওয়া মেয়র নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণ অবৈধ। ওইদিন নির্বাচন নয়, হয়েছে সিলেকশন। বলা হচ্ছে এই নির্বাচনে ভোট জালিয়াতি হয়েছে। অন্যদিকে মাত্র ২৫ শতাংশ ভোটার যেখানে ভোট দিয়েছে সেখানে নির্বাচন বাতিল করে নতুন নির্বাচন দেওয়ার দাবি করা হচ্ছে।

সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারের না অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত একটি নির্বাচনে প্রার্থীরা নির্বাচিত হয় কীভাবে? ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিজয়ী প্রার্থীদের আমরা জনপ্রতিনিধি বলতে পারি না। সুতরাং এই মেয়র নির্বাচন সম্পূর্ণ অবৈধ।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, পুনরায় নির্বাচনের দাবি মামা বাড়ির আবদার। সরকারপক্ষ বলছে নির্বাচন সঠিক হয়েছে। এই নির্বাচন গণতন্ত্র রক্ষার নির্বাচন। বিএনপি ইভিএমবিরোধী প্রচার ও ভোটের আগেই সরকারপক্ষের জয়লাভ, নির্বাচনে কারচুপি হওয়ার আশঙ্কাসহ নেতিবাচক কথা বলে ভোটারদের নির্বাচন বিমুখী ও নিরুৎসাহিত করতে সহায়তা করেছে। সুতরাং নির্বাচনে কমসংখ্যক ভোটারের অংশগ্রহণ হওয়ার কারণ বিএনপি, সরকার নয়। এখন নানা অজুহাত তুলে তারা পুনরায় নির্বাচনের দাবি করছে যা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।

সেই শুরু থেকে এখন পর্যন্ত মেয়র নির্বাচন নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে চলছে দ্বিমত। চলছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। বিরোধী পক্ষ বলছে অবৈধ নির্বাচন আর সরকার পক্ষ বলছে বৈধ নির্বাচন। এই দুই পক্ষের এ ধরনের বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে শিগগির বিজয়ীরা তাদের শপথ অনুষ্ঠান করবেন। বিজয়ী মেয়রদের ক্ষমতার মেয়াদ পাঁচ বছর।

এখন প্রশ্ন হলো, ২৫ শতাংশ ভোটারের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই মেয়র নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক দৃষ্টিতে কি বৈধ বলা যায়? অন্যদিকে বিরোধীপক্ষের নির্বাচনসংক্রান্ত বিরোধিতা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত? কিংবা সরকার কর্তৃক নির্বাচন বৈধতার প্রশ্ন আদৌ গ্রহণযোগ্য কি?

গণতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে সম্প্রতি হয়ে যাওয়া নির্বাচনকে কোনোভাবেই একটি সঠিক নির্বাচন বলা যায় না। নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে একথাও ঠিক নয়। নির্বাচন যেভাবে হওয়ার কথা সেভাবে হয়নি। এই চিরসত্যকে সরকার পক্ষ কৌশলে এড়িয়ে যেতে চায়। তবে সরকার মানুক আর না মানুক সাধারণ জনগণ ও বিশ্ববাসী ভালো করেই জানে সেদিনের নির্বাচন আসলে নির্বাচনের মতো হয়নি। নির্বাচন ঠিকমত হলে হয়তো ফলাফল অন্য হতে পারতো। কিন্তু আসলেই কি তাই? সরকার সমর্থিত প্রার্থীদের এই আশঙ্কাই কি তাহলে জনগণকে এ ধরনের নির্বাচনের উপহার দিয়েছে?

তবে অনেকে বলছেন, সঠিক নির্বাচন হলেও আওয়ামী লীগ প্রার্থীরাই জয়লাভ করতেন। কারণ ঢাকাসহ সারাদেশে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যে উন্নয়নের জোয়ার বইছে তাতে জনগণ ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের পক্ষে থাকার কথা। একটি সঠিক নির্বাচনে হেরে গিয়ে বিরোধী প্রার্থীরা যত কিছুই বলুক না কেন জনগণ তাতে সারা দিতো না। নির্বাচনে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সরকারে পক্ষে থাকতো। কিন্তু এখন হয়েছে ঠিক তার উল্টো। নির্বাচনকে জনগণ এখন প্রহসন হিসেবে দেখছে। নির্বাচনের প্রতি জনগণ ধীরে ধীরে আস্থা হারিয়ে ফেলছে। দেশের জন্য জাতির জন্য বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

এদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন ভোটের প্রতি মানুষের অনীহা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়l মানুষের ভোটের প্রতি অনীহা গণতন্ত্রের জন্য ভালো নাl কথাটার বাস্তবতা অবশ্যই রয়েছে। ভবিষ্যতে নির্বাচন হলে সরকার পক্ষের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে বড় বড় রাজনৈতিক দল থেকে কোনো প্রার্থী নির্বাচন করতে উৎসাহিত হবে না যা গণতন্ত্রের জন্য কখনো শুভ নয়।

ঢাকার মেয়র নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে সরকার যত কথাই বলুক না কেন দেশের সাধারণ মানুষ এই নির্বাচনকে কখনই সঠিক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বলবে না। কারণ এই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারের অংশগ্রহণ ছিল না। নির্বাচনের মত নির্বাচন না হওয়ার জন্য তাহলে দায়ী কে? সরকার না বিরোধী পক্ষ? নির্বাচনের বৈধতা দিতে বিরোধী পক্ষের আপত্তি কি তাহলে যুক্তিসঙ্গত?

এদিকে বিএনপি প্রার্থীদের নির্বাচনের পূর্বে ইভিএম বিরোধী প্রচার চালানো উচিত হয়নি। ইভিএমের প্রতি যদি এতই অবিশ্বাস তাহলে তারা নির্বাচন করলেন কেন? অন্যদিকে মেয়র নির্বাচনকে বিএনপি খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলনকে আরও বেগবান করবে বলেও প্রচার করেছে। এছাড়া নির্বাচনের আগেই বিএনপি কর্তৃক আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের জয়লাভ হওয়ার কথা প্রচার করাটা কি যুক্তিসঙ্গত? ফলে তাদের এই অপপ্রচার অনেককেই নির্বাচন বিমুখী করেছেl বিএনপি তাদের এই দোষ এড়াতে পারবে না।

নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনের প্রতি যদি বিএনপির এতই সন্দেহ তাহলে তাদের নির্বাচন বয়কট করা উচিত ছিল। সুতরাং নির্বাচনের বৈধতা দিতে গিয়ে বিরোধীপক্ষ যে অভিযোগগুলো করছে তা গ্রহণযোগ্য নয়। নির্বাচনে পরাজিত হয়ে ফলাফল নিয়ে তাদের আপত্তি কখনই যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ বিএনপি সেদিন মেয়র নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণে বিমুখ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। বিএনপির অপপ্রচারের কারণে ভোটাররা সেদিন ভোটকেন্দ্রে যাননি। এই কারণেই সেদিন ভোটারদের অংশগ্রহণ ছিল সীমিত। বিএনপির খামখেয়ালির জন্যই মূলত সেদিন ঢাকার মেয়র নির্বাচন সঠিক হয়নি। সুতরাং ঢাকার মেয়র নির্বাচন সঠিকভাবে অনুষ্ঠিত না হওয়ার পেছনে বিএনপিকেই দায়ী করা যেতে পারে। এখানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারকে এককভাবে দায়ী করা ঠিক নয়।

যেভাবে নির্বাচন হওয়ার কথা সেভাবে নির্বাচন হয়নি একথা সম্পূর্ণ  সত্য ও বাস্তব। একথাও সত্য জনগণ সেদিন ভয়ে ভোট কেন্দ্রে যেতে সাহস করেনি। এছাড়া অনেক স্থানে দুই পক্ষের হাতাহাতি ও মারামারি জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এই কারণেই সেদিন স্বতস্ফূর্তভাবে ভোটাররা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। বিএনপি যদি সব ধরনের অপপ্রচার ছেড়ে দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতো তাহলে হয়তো ভোটাররা স্বতস্ফূর্তভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতো। এ ধরনের নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হতে না পারলেও ফলাফলে তাদের আরও ভালো করার একটা বড় সুযোগ ছিল।

বিএনপি নির্বাচন কমিশনকে মেরুদণ্ডহীন বলেও মন্তব্য করেছেl মেরুদণ্ডহীন নির্বাচন কমিশন দিয়ে নাকি কোনো নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব নয়। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে পরবর্তী সময়ে কেন এই মেরুদণ্ডহীন নির্বাচন কমিশনের অধীনে বিএনপি একটার পর একটা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে? নির্বাচন কমিশনেতো কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচনে যখন বিএনপি অংশগ্রহণ করে কেন এখন পরাজিত হয়ে বলছে অন্য কথাl বলছে এই নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতিত্ব করেছেl

পরিশেষে বলা যেতে পারে, ঢাকার মেয়র নির্বাচন কখনো অবৈধ নির্বাচন ছিল না। বিজয়ীদের কখনো অবৈধ বলা ঠিক নয়। কারণ ঢাকাবাসী জানে সেদিন নির্বাচন কী কারণে সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়নিl এখানেই রাজনীতিতে বিএনপির একটা বিরাট পরাজয়। সুতরাং ঢাকার মেয়র নির্বাচন জনগণের কাছে পেয়েছে বৈধতা। কারণ ঢাকাবাসী ঢাকার উন্নয়ন দেখতে চায়। আর এই উন্নয়নের চাকাকে একমাত্র সরকার পক্ষের বিজয়ী দুজন মেয়র পারবেন সামনে নিয়ে যেতেl বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিমধ্যে বিজয়ীদের স্বানন্দে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এখন মেয়র নির্বাচন নিয়ে আর চিৎকার না করে বিএনপির দৃষ্টি দেওয়া উচিত ভবিষ্যতের দিকে।

লেখক: সুইডেনে মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয়

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :