ময়ূরী এখন সার্কাসের নায়িকা

একসময় তার উপস্থিতিতে কাঁপতো রুপালি পর্দা। তিন শতাধিক সিনেমার নায়িকা তিনি। কিন্তু গত ১৫ বছর ধরে সিনেমার বাইরে। তিনি ঢালিউডের একসময়ের জনপ্রিয় নায়িকা মুনমুন আক্তার লিজা ওরফে ময়ূরী। জীবিকার তাগিদে এই অভিনেত্রী এখন কোমর দোলান সার্কাসে। তাতেই চলে তার সংসার। কিন্তু জাকজমকপূর্ণ রুপালি জগত ছেড়ে কেন সার্কাসে জীবিকা খুঁজছেন অভিনেত্রী?
ময়ূরী জানান, ‘পরিবার-পরিজন নিয়ে চলতে গেলে সংসারে তো টাকা লাগবে। পেটের জন্যই তো আমরা পরিশ্রম করি। বসে বসে খেলে রাজার ভাণ্ডারও একসময় শূন্য হয়ে যায়। সিনেমার বর্তমান বাজার খুবই শোচনীয়। তাই সার্কাসে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে সিনেমার জনপ্রিয় গানগুলোর সঙ্গে পারফর্ম করি। বাংলাদেশের বিখ্যাত সার্কাস দল লায়ন অলিম্পিক গ্রেট রওশন-এর সঙ্গে প্রোগ্রাম করছি।’
নায়িকা বলেন, ‘আমার সব শর্ত পূরণ করে, যোগ্য সম্মান দিয়েই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সার্কাস দলটি আমাকে নিয়ে যায়। ইতিমধ্যে বগুড়া, লালমনিরহাট, হবিগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জে শো করেছি। সবাই আমাকে এক নজর দেখার জন্য উদগ্রীব থাকে। স্থানীয় প্রশাসন নিরাপত্তার বিষয়টি খুব গুরুত্ব দেয়। তাদের অনেক ধন্যবাদ। প্রতিটি শোতে দর্শকদের পছন্দের গানগুলোতে পারফরম্যান্স করি।’
একইসঙ্গে একটি গুরুতর অভিযোগের কথাও শোনা গেল ময়ূরীর মুখে। নায়িকা বলেন, ‘একসময় শীত, তীব্র গরম, বর্ষায় অনেক কষ্ট করে শুটিং করেছি। আমার পরিশ্রমের ফলেই তো সিনেমা হিট হতো। অনেক প্রযোজক আমাকে দিয়ে সিনেমা বানিয়ে বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়েছেন। কিন্তু আমার পারিশ্রমিকের টাকাটা সম্পূর্ণ পরিশোধ করেননি। কেউ কেউ তো পুরোটা মেরে দিয়েছেন।’
ময়ূরীর দাবি, ‘লাখ লাখ টাকা আমি আজও ওইসব প্রযোজকের কাছে পাওনা আছি। এ রকম অনেক প্রযোজক পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। আমি আল্লাহর ওয়াস্তে তাদেরকে মাফ করে দিয়েছি। কিন্তু তার বিনিময়ে মিডিয়া থেকে শুধু বদনাম পেয়েছি।’
কিসের বদনাম? একসময় আলোচনা ছিল, বাংলা চলচ্চিত্রে অশ্লীলতার মূল কেন্দ্রে ময়ূরী। এটাই কি বদনাম? ময়ূরী বলেন, ‘আমি এটার ব্যাখ্যা দিতে যাবো না, দিলে অনেক সিনিয়রদের টেনে আনতে হবে। কিন্তু আমি কারও নাম প্রকাশ্যে আনতে চাই না। সে সময় আমাকে ওই ধরনের দৃশ্য করতে বাধ্য করা হতো। সিনিয়রদের দেখিয়ে আমাদেরকে বাধ্য করা হতো।’
এক্ষেত্রে কলকাতার নায়িকা ঋতুপর্ণার উদাহরণ দেন ময়ূরী, যিনি একসময় বাংলাদেশের বেশ কিছু ছবিতে অভিনয় করেন এবং বেশ রগরগে দৃশ্যে দেখা যেত ঋতুপর্ণাকে। ময়ূরী বলেন, ‘আমাকে অশ্লীল নায়িকা কে বা কারা বলে আমি জানি না। আমি কোনো অশ্লীল ছবি করিনি। আমি নাচের দৃশ্য করতাম। এর বাইরে কিছু দেখালে সেগুলো ছিল কাটপিস। একসময় আমাকে ব্যবহার করা হতো।’
এফডিসিপাড়ার অনেকে বলেন, ময়ূরীকে বহুদিন কাজে নেন না কোনো পরিচালক। তাই তিনি এখন সার্কাস করেন। এর প্রতিবাদ করে নায়িকা বলেন, ‘আমাকে কেউ কাজে নেয় না- এটা ভুল। আমি কাজ ছেড়ে দিয়েছি। কয়েকদিন আগেও পরিচালক রাজু চৌধুরী আমাকে ছবির অফার করেছে। চলচ্চিত্র ছেড়ে দেওয়ার পরও প্রচুর অফার এসেছে। কিন্তু আমি করিনি।’
একসময়ের তুমুল ব্যস্ত একজন নায়িকা কেন চলচ্চিত্র ছেড়ে দিলেন? তার কী কোনো দুঃখ-কষ্ট বা অভিমান আছে? ময়ূরী বলেন, ‘না না এসব কিছু নেই। ২০০৭ সালে আমি যখন প্রথম বিয়ে করি, তখনই ডিক্লেয়ার দিয়ে অভিনয় ছেড়ে দেই। কারণ, আমার স্বামী চাইনি আমি চলচ্চিত্রে থাকি। এখন যার সঙ্গে থাকি, সেও চায় না আমি আবার চলচ্চিত্রে ফিরি।’
২০০০ সালের পর থেকে বাংলা চলচ্চিত্রে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় মুনমুন-ময়ূরীসহ বেশ কয়েকজন নায়িকার পাশে অশ্লীল খেতাব জুড়ে যায়। পরবর্তীতে সরকার সেই অশ্লীলতার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যান মুনমুন-ময়ূরীদের মতো নায়িকা। যার কারণে ২০০৭ সালের পর থেকে আর সিনেমায় দেখা যায়নি ময়ূরীকে।
এদিকে, সিনেমার মতো ব্যক্তিগত জীবনটা বেশ আলোচিত নায়িকা ময়ূরীর। ২০০৭ সালে তিনি বিয়ে করেন রেজাউল করিম মিলন নামে টাঙ্গাইলের এক উপজেলা ভাইস-চেয়ারম্যানকে। সেই ঘরে তার মাইমুনা সাইবা অ্যাঞ্জেল নামে এক কন্যাসন্তান রয়েছে। ২০১৫ সালে তার স্বামী মারা যান।
এরপর ২০১৭ সালে শফিক জুয়েল আহমেদ নামে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে বিয়ে করেন ময়ূরী। সেখানে ২০১৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি শেখ সাদ মুহাম্মদ ইনসাফ নামে এক ছেলে সন্তানের জন্ম দেন নায়িকা। বর্তমানে স্বামী জুয়েল ও সন্তান নিয়ে টঙ্গিতে থাকেন ময়ূরী। বর্তমানে তার পেশা সার্কাসের নায়িকা।
ঢাকাটাইমস/৩০ মার্চ/এএইচ

মন্তব্য করুন