সোহেল চৌধুরী কে ছিলেন, সেই রাতে কী ঘটেছিল, কেন ঘটেছিল

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
  প্রকাশিত : ০৬ এপ্রিল ২০২২, ১১:২৭
অ- অ+

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (এফডিসি) ১৯৮৪ সালে ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ নামে একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে, যার মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে পা রাখেন চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী। এছাড়া ওই একই প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন তার স্ত্রী দিতিও। তবে খুব বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে পারেননি বাংলা সিনেমার সাড়া জাগানো জনপ্রিয় চিত্রনায়ক ও বিজনেসম্যান সোহেল চৌধুরী।

আশি-নব্বই দশকের চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী ১৯৬৫ সালের ১৯ অক্টোবর রাজধানীর বনানীতে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ব্যবসায়ী তারেক আহমেদ চৌধুরী ও মা নূরজাহান বেগম। অভিজাত ধনী পরিবারের সন্তান ছিলেন সোহেল চৌধুরী। ১৯৮৬ সালে সোহেল চৌধুরী অভিনেত্রী দিতিকে বিয়ে করেন। দিতির সঙ্গে দাম্পত্য জীবনে তাদের দুটি সন্তান জন্ম নেয়। ১৯৮৭ সালে জন্ম হয় দিতি-সোহেল দম্পতির প্রথম সন্তান লামিয়া চৌধুরীর। ১৯৮৯ সালে এ দম্পতির ছেলে দীপ্ত চৌধুরীর জন্ম হয়। নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে দিতি ও সোহেল চৌধুরীর বিচ্ছেদ ঘটে।

গতকাল মঙ্গলবার রাতে চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি আশীষ রায় চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। ওইদিন সন্ধ্যার পর থেকে গুলশানে তার বাসা ঘিরে রাখে র‌্যাব। তার বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ ও খালি বোতল জব্দ করা হয়।

র‌্যাবের পক্ষ থেকে পাঠানো এক বার্তায় জানানো হয়, দীর্ঘ ২৪ বছর আগের বহুল আলোচিত জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলার পলাতক ও চার্জশিটভুক্ত ১ নম্বর আসামি আশিষ রায় চৌধুরী।

চিত্র জগতে পা

১৯৮৪ সালে নতুন মুখের সন্ধানের মাধ্যমে দেশীয় চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন সোহেল চৌধুরী। ১৯৮৬ সালে তার প্রথম অভিনীত চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। সেই বছরই নির্মাতা এফ কবির চৌধুরী পরিচালিত পর্বত চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিষেক হয়। তিনি ৩০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। বাংলা চলচ্চিত্রে ওই সময়কার একজন জনপ্রিয় চলচ্চিত্র অভিনেতা ছিলেন সোহেল চৌধুরী। তিনি কয়েকটি সিনেমায় পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেন। কয়েকটি সিনেমায় তিনি সহ-অভিনেতার ভূমিকায় ছিলেন।

আলোচিত সিনেমা

১৯৮৮ সালে হীরামতি, এর পরিচালক ছিলেন আমজাদ হোসেন; ১৯৮৯ সালে মুক্তি পায় বিরহ ব্যথা ও ১৯৯০ সালে চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত দাঙ্গা ফ্যাসাদ ; ১৯৯৫ সালে কামরুজ্জামান পরিচালিত পাপী শত্রু; আর ১৯৯৬ সালে দারাশিকো পরিচালিত বাদশা ভাই।

আলোচিত হত্যা

১৯৯৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর হত্যাকাণ্ডের দিন রাতে সোহেল চৌধুরী তার বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে বনানীর ট্রাম্পস ক্লাবে ঢোকার চেষ্টা করেন। এ সময় ভেতরে ঢুকতে তাকে বাধা দেওয়া হয়। পরে রাত আড়াইটার দিকে আবারও তিনি ঢোকার চেষ্টা করেন। তখন সোহেলকে লক্ষ্য করে ইমন, মামুন, লিটন, ফারুক ও আদনান গুলি চালান। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান সোহেল। এই হত্যাকাণ্ডে আসামিদের মধ্যে আদনানকে ঘটনার পরপরই ধরে পুলিশে সোপর্দ করে জনতা।

ওই সময় গুলিতে সোহেল চৌধুরীর বন্ধু আবুল কালাম আজাদ (৩৫) এবং ট্রাম্পস ক্লাবের কর্মচারী নিরব (২৫) ও দাইয়ান (৩৫) আহত হন। গুলির শব্দে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ট্রাম্পস ক্লাবে ড্যান্স পার্টিতে অংশ নেয়া ২০০ জনের মতো নারী-পুরুষ পালিয়ে যায়।

কী ঘটেছিল, কেন ঘটেছিল ১৮ ডিসেম্বর, ১৯৯৮

ওই সময় বনানী-গুলশান এলাকার ক্যাবল ব্যবসা ও ট্রাম্পস ক্লাবকে কেন্দ্র করে এর মালিক আফাকুল ইসলাম ওরফে বান্টি ইসলামের সঙ্গে সোহেল চৌধুরীর বিরোধ ছিল, ঘটনার আগে যা চরমে পৌঁছেছিল। ঘটনার দিন রাত ৯টায় সোহেল চৌধুরী শহীদ, আবুল কালাম আজাদ, হেলাল ও হাফিজ নামে চার বন্ধুকে নিয়ে বনানীর বাসা থেকে বের হয়ে একটি রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খান। রাত ২টার দিকে সোহেল চৌধুরী বন্ধুদের নিয়ে বাসায় ফেরে এবং কিছুক্ষণ পরই তারা ট্রাম্পস ক্লাবে রওনা দেন। সোহেলের বাসা থেকে ট্রাম্পস ক্লাবের দূরত্ব ২৫-৩০ গজ। তারা হেঁটে ক্লাবের সামনে পৌছার পর ক্লাবের নিচ তলার কলাপসিবল গেটের কাছে দুই যুবক তাদের গতিরোধ করে। এক যুবক আবুল কালামের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়ান। একপর্যায়ে এক যুবক রিভলবার বের করে কালামের পেটে দুটি গুলি করেন। মুহূর্তেই সন্ত্রাসীরা সোহেল চৌধুরীর বুকে গুলি করতে শুরু করে। সোহেল গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

সোহেল চৌধুরী হত্যাকাণ্ডের সময় তার দুই স্ত্রী থাকার বিষয়টি প্রকাশ পায়। তাদের একজন স্মৃতি, অন্যজন তুলি।

আলোচিত মামলা

ঘটনার পর সোহেল চৌধুরীর ভাই তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী বাদী হয়ে গুলশান থানায় হত্যা মামলা করেন। ওই মামলায় ১৯৯৯ সালের ৩০ জুলাই ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ নয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন ডিবির সহকারী পুলিশ কমিশনার আবুল কাশেম ব্যাপারী। ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে মনোমালিণ্য এবং পরে এর প্রতিশোধ নিতে সোহেল চৌধুরীকে হত্যা করা হয় বলে মামলার অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।

মামলায় ২০০১ সালের ৩০ অক্টোবর ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। এরপর মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ২০০৩ সালে ঢাকার দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনাল-২ এ পাঠানো হয়।

মামলাটি দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো বেআইনি হয়েছে- এই দাবি করে ওই আইনের দুটি ধারা চ্যালেঞ্জ করে আদনান সিদ্দিকী হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। ওই রিটের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০০৩ সালের ১৯ নভেম্বর দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা স্থানান্তরের আদেশ কেন বেআইনি হবে না তা জানাতে সরকারের প্রতি রুল জারি করেন। একই সঙ্গে তিন মাসের জন্য মামলার বিচার কার্যক্রম স্থগিত করেন। পরে ২০০৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মামলার কার্যক্রম স্থগিত করেন। সেই থেকে এই মামলার বিচার স্থগিত থাকে। কোনো সাক্ষীর সাক্ষ্যই আর গ্রহণ করা হয়নি।

দীর্ঘ ১২ বছর মামলার কার্যক্রম স্থগিত থাকার পর ২০১৫ সালে আদনান সিদ্দিকীর দায়ের করা রিট আবেদনের ওপর শুনানি হয়। শুনানি শেষে বিচারপতি রুহুল কুদ্দুস ও বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর বেঞ্চ ২০১৫ সালের ৫ আগস্ট রায় দেন। রায়ে ইতিপূর্বে দায়ের করা রুল খারিজ করে দেন। হাইকোর্টের দেওয়া স্থগিত আদেশ প্রত্যাহার করেন। মামলার বিচার কার্যক্রম চলতে আইনগত আর কোনো বাধা ছিল না এই আদেশের পর। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে ওই রায় ও হাইকোর্টের আদেশের কপি বিচারিক আদালতে পৌঁছেনি। গায়েব হয়ে যায় মামলার নথি।

চলতি বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলার গায়েব হওয়া নথি খুঁজে বের করার জন্য অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন বিচারপতি মামনুন রহমান ও বিচারপতি খন্দকার দিলীরুজ্জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ।

আইনজীবী আবদুল্লাহ আল হারুন রাসেলের জনস্বার্থ মামলা হিসেবে দায়ের করা রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত এই হত্যা মামলার নথি গায়েব করার ঘটনা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন।

রিটকারী আইনজীবী আবদুল্লাহ আল হারুন, ‘হাইকোর্টের রায়ের অনুলিপি ট্রায়াল কোর্টে জানানো হয়নি এবং এর বিচার প্রক্রিয়া আবার শুরু হয়নি বলে জানা গেছে।’

‘এছাড়া, মামলার নথি বিচারিক আদালত থেকে হারিয়ে গেছে বলে জানা গেছে, যা দুঃখজনক’, বলের এই আইনজীবী।

গত ২৪ মার্চ এ মামলায় আদালতে হাজিরা দেন জামিনে থাকা আসামি ফারুক আব্বাসী। এছাড়া জামিনে থাকা অপর আসামি আদনান সিদ্দিকীর পক্ষ থেকে হাজিরার জন্য সময় চেয়ে আবেদন করা হয়। এসময় আদালত তা মঞ্জুর করেন। আর কারাগারে থাকা আসামি তারিক সাঈদ মামুনকে আদালতে হাজির করা হয়। তবে এই মামলায় পলাতক রয়েছেন আসামি আজিজ মোহাম্মদ ভাই, সানজিদুল হাসান, সেলিম খান ও হারুন অর রশিদ। তাদের বিরুদ্ধে আদালত ইতিমধ্যে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।

ঢাকাটাইমস/০৬এপ্রিল/এএইচ/এফএ

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
কারিগরিতে পাসের হার ৫৮.২০ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেলেন ৩৯৫১ জন
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে পতন
দাখিলে পাশের হার ৫৫.৪৯ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেল ৬ হাজার ১৭৬ জন
এসএসসি-সমমান পরীক্ষায় ফেল ৬ লাখ ৯০ হাজার শিক্ষার্থী
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা