রপ্তানির স্তব্ধ সুর: অর্থনীতির অদৃশ্য অস্থিরতা

মোঃ সাইফুল ইসলাম মাসুম
  প্রকাশিত : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:৪৩
অ- অ+

বাংলাদেশের অর্থনীতির গল্প বহু বছর ধরে এক সুপরিচিত বাক্যে সংক্ষেপ করা যায়—রপ্তানিই শক্তি। এই শক্তির ওপর দাঁড়িয়েই দেশটি স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের সীমানায় পৌঁছেছে। কিন্তু চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসের রপ্তানি পরিসংখ্যান এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার দিকে আঙুল তুলছে। জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত মোট পণ্য রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ২,৮৪১ কোটি ডলার, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি ছিল ২,৮৯৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ১.৯৩ শতাংশ। সংখ্যাটি শুনতে সামান্য মনে হতে পারে, কিন্তু একজন ব্যাংকারের চোখে এটি একটি ট্রেন্ড—এবং অর্থনীতিতে ট্রেন্ডই ভবিষ্যতের ভাষা।

রপ্তানির এই পতন হঠাৎ কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং ধীরে ধীরে জমে ওঠা চাপের বহিঃপ্রকাশ। আগস্টে ৩৮২ কোটি ডলার থেকে রপ্তানি বেড়ে ৪৭৭ কোটিতে পৌঁছে ২৪.৯০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছিল। তখন অনেকেই ভেবেছিলেন অর্থবছরটি শক্ত ভিত্তিতে শুরু হয়েছে। কিন্তু সেপ্টেম্বরেই প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ২.৬৩ শতাংশে নেমে আসে, অক্টোবর ও নভেম্বরে পতন আরও গভীর হয়, ডিসেম্বর মাসে তা ঋণাত্মক ১০.৫৪ শতাংশে পৌঁছায়, আর জানুয়ারিতে দাঁড়ায় ঋণাত্মক ১৪.২৫ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে ৪৪৪ থেকে ৪৪১ কোটিতে সামান্য পতন যেন বলছে—অর্থনীতি এখন এক ধরনের ক্লান্ত স্থবিরতার ভেতর দাঁড়িয়ে আছে। এটি ধস নয়, কিন্তু এটি শক্তি হারানোর লক্ষণ।

একজন ব্যাংকার হিসেবে এই পরিসংখ্যান দেখলে প্রথম যে প্রশ্নটি মাথায় আসে তা হলো—এই পতনের আর্থিক প্রতিক্রিয়া কোথায় গিয়ে ঠেকবে? রপ্তানি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস। বৈদেশিক মুদ্রা মানে আমদানি সক্ষমতা, রিজার্ভের স্থিতি, বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং খাতের তারল্য। রপ্তানি কমা মানে শুধু আয় কমা নয়; এটি একটি ডোমিনো ইফেক্ট তৈরি করে। ডলারের সরবরাহ কমে গেলে আমদানির চাপ বাড়ে, মুদ্রার ওপর চাপ পড়ে, আর সেই চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর।

তৈরি পোশাক খাতের দিকে তাকালেই বোঝা যায় সমস্যার কেন্দ্র কোথায়। জুলাই–জানুয়ারি সময়ে এই খাতে রপ্তানি ২,৩৫৫ কোটি ডলার থেকে কমে ২,২৯৮ কোটিতে নেমেছে, অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ২.৪০ শতাংশ। বাংলাদেশে রপ্তানি মানেই কার্যত তৈরি পোশাক। ফলে এই খাতে সামান্য কম্পনও সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ঢেউ তোলে। বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা দুর্বল, পশ্চিমা অর্থনীতিতে ভোক্তা ব্যয় সংকুচিত, ব্র্যান্ডগুলো মূল্যচাপে সরবরাহকারীদের চেপে ধরছে—এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এখন অতীতের তুলনায় অনেক কঠিন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি।

কিন্তু সংকটের মাঝেও কিছু আলোর রেখা আছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে রপ্তানি ৬৭ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ৭১ কোটিতে পৌঁছেছে, প্রবৃদ্ধি ৬.৯৩ শতাংশ। এটি প্রমাণ করে, অর্থনীতির বিকল্প শাখাগুলো পুরোপুরি অচল নয়। সঠিক নীতি সহায়তা, মান নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে চামড়া খাত একটি শক্তিশালী দ্বিতীয় স্তম্ভে পরিণত হতে পারে। অন্যদিকে কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্যে রপ্তানি ৬৭ কোটি ডলার থেকে কমে ৬১ কোটিতে নেমেছে, প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ৫.৮৬ শতাংশ। এই পতন শুধু বাণিজ্যিক নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগজনক। কৃষিভিত্তিক শিল্পের সংকোচন মানে গ্রামে আয় কমা, কর্মসংস্থান কমা, এবং শেষ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর চাপ তৈরি হওয়া।

রপ্তানি খাতের এই পরিস্থিতিকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ছাড়া বোঝা অসম্পূর্ণ হবে। বিশ্ব অর্থনীতি এখনও মহামারী-পরবর্তী পুনরুদ্ধারের অসম গতির মধ্যে আছে। উচ্চ সুদহার, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আগের মতো প্রাণবন্ত নয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে প্রতিযোগী দেশগুলো দ্রুত অভিযোজন করছে। ভিয়েতনাম, ভারত, এমনকি আফ্রিকার কিছু দেশও নতুন বাজার দখলে আগ্রাসী কৌশল নিচ্ছে। বাংলাদেশ যদি একই গতিতে কাঠামোগত সংস্কার না করে, তবে রপ্তানির বাজার ধীরে ধীরে সরে যাওয়ার ঝুঁকি আছে।

একজন ব্যাংকারের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো খাতনির্ভরতা। বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামো এখনও অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত। তৈরি পোশাকের ওপর অতিনির্ভরতা অর্থনীতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। বৈচিত্র্যহীন অর্থনীতি বাহ্যিক ধাক্কা সহ্য করতে পারে না। রপ্তানির এই নিম্নগতি আসলে সেই কাঠামোগত দুর্বলতার আয়না। দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য প্রযুক্তি-নির্ভর উৎপাদন, উচ্চমূল্যের পণ্য, ফার্মাসিউটিক্যালস, আইটি সেবা এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।

এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রপ্তানিমুখী শিল্পে সাশ্রয়ী অর্থায়ন, বৈদেশিক লেনদেন সহজীকরণ, এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় আধুনিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা জরুরি। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন কাঠামো শক্তিশালী না হলে শিল্প বৈচিত্র্য বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। ব্যাংকগুলো শুধু ঋণদাতা নয়; তারা অর্থনৈতিক রূপান্তরের অংশীদার। রপ্তানি খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে আর্থিক খাতকে আরও উদ্ভাবনী ও সক্রিয় হতে হবে।

তবে সব দায় বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর চাপিয়ে দিলে ভুল হবে। দেশীয় নীতি পরিবেশ, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, জ্বালানি খরচ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা—এই সবই রপ্তানির প্রতিযোগিতা কমিয়ে দেয়। ব্যবসা করার খরচ যত বেশি, আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা তত কঠিন। ফলে রপ্তানি পতনকে কেবল সাময়িক বৈশ্বিক মন্দা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে কাঠামোগত সংস্কারের সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে।

ঋণাত্মক ১.৯৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কোনো বিপর্যয় নয়, কিন্তু এটি একটি বার্তা। টানা ছয় মাসের নিম্নগতি বলছে—অর্থনীতি সতর্ক অবস্থায় আছে। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। রপ্তানি বাংলাদেশের শুধু আয়ের উৎস নয়; এটি দেশের বৈশ্বিক পরিচয়, শিল্প সক্ষমতা এবং উন্নয়নের ভিত্তি। এই ভিত্তিতে ফাটল ধরলে তার প্রতিধ্বনি বহু দূর পর্যন্ত পৌঁছায়।

অর্থনীতির ইতিহাস বলে, সংকটই বড় রূপান্তরের জন্ম দেয়। যদি বাংলাদেশ এই মুহূর্তটিকে উপলব্ধি করতে পারে—বৈচিত্র্য আনে, দক্ষতা বাড়ায়, প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করে, এবং নীতিগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে—তবে এই সাময়িক পতন ভবিষ্যতের শক্ত ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে। অন্যথায়, রপ্তানির এই ক্লান্ত শ্বাস ধীরে ধীরে অর্থনীতির দীর্ঘস্থায়ী অবসাদে রূপ নিতে পারে।

এখন প্রশ্ন একটাই: আমরা কি এই সংকেত শুনছি? নাকি সতর্ক ঘণ্টা উপেক্ষা করে এগিয়ে যাচ্ছি? বাংলাদেশের আগামী দশকের অর্থনৈতিক গল্পের উত্তর লুকিয়ে আছে এই সিদ্ধান্তের মধ্যেই।

লেখক : ব্যাংকার ও রাজনীতি বিশ্লেষক

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
নালিতাবাড়ীতে গলায় বাদাম আটকে ৩ বছরের শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু
আগামীকাল থেকে বাধ্যতামূলক হচ্ছে বাংলা কিউআর
পতেঙ্গায় কোস্ট গার্ডের অভিযানে বিপুল বিদেশি মদ, বিয়ার ও সিগারেট জব্দ
ই-অরেঞ্জের প্রধান উপদেষ্টা মাসুকুর রহমান গ্রেপ্তার
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা