প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর শ্রমবাজার উন্মুক্ত ও সম্প্রসারণে তাৎপর্যপূর্ণ

খাদ্যের সন্ধানে, নিরাপত্তার প্রয়োজনে, জীবিকার তাগিদে কিংবা উন্নত ভবিষ্যতের আশায় মানুষ যুগে যুগে সীমান্ত অতিক্রম করেছে। আধুনিক বিশ্বায়নের যুগে শ্রমশক্তির আন্তর্জাতিক স্থানান্তর শুধু ব্যক্তিগত জীবিকার প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি, কূটনীতি, উন্নয়ন কৌশল এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বাংলাদেশের মতো জনবহুল উন্নয়নশীল দেশের জন্য বৈদেশিক কর্মসংস্থান তাই নিছক অর্থ উপার্জনের মাধ্যম নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, দারিদ্র্য বিমোচন এবং সামাজিক অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি।
এই বাস্তবতায় মালয়েশিয়া বাংলাদেশের শ্রমবাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই অর্থনৈতিক শক্তিধর দেশটি গত কয়েক দশকে লাখ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। নির্মাণ, উৎপাদনশিল্প, কৃষি, সেবা খাত, বাগান শিল্প এবং বিভিন্ন নিম্ন ও মধ্যদক্ষতাসম্পন্ন কাজে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অবদান আজ মালয়েশিয়ার অর্থনীতির একটি দৃশ্যমান উপাদান।
এমন একসময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠকে শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত করার আহ্বান নিঃসন্দেহে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। বিশেষ করে, আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ, অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধকরণ, আটক বাংলাদেশিদের প্রত্যাবাসন এবং স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী শ্রম নিয়োগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো আলোচনায় স্থান পাওয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের গুরুত্ব নতুন করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। দেশের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতা, আবাসন খাত, ক্ষুদ্র ব্যবসা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের পেছনে প্রবাসী আয়ের অবদান অপরিসীম। বহু পরিবারে প্রবাসী কর্মীই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁদের পাঠানো অর্থে সন্তানদের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত হয়েছে, পাকা ঘর নির্মিত হয়েছে, কৃষিজমি ক্রয় হয়েছে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্ম হয়েছে। ফলে শ্রমবাজার সম্প্রসারণের প্রশ্নটি কেবল কর্মসংস্থানের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন অভিযাত্রার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। তবে এই বাজার বহুবার উন্মুক্ত ও বন্ধ হওয়ার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, সিন্ডিকেট, ভিসা জটিলতা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারণে বহু সম্ভাবনা নষ্ট হয়েছে। হাজার হাজার শ্রমিক সর্বস্ব বিক্রি করে বিদেশে গিয়ে প্রতারিত হয়েছেন। কেউ কাজ পাননি, কেউ বেতনবঞ্চিত হয়েছেন, কেউ আবার অবৈধ অভিবাসীর তকমা নিয়ে কারাগারে বন্দি হয়েছেন। ফলে শ্রমবাজার সম্প্রসারণের দাবির পাশাপাশি শ্রমিক সুরক্ষা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মালয়েশিয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যৌথ সংবাদ সম্মেলনে যে বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন- শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী, সেটিই এই আলোচনার মূল দর্শন হওয়া উচিত। কারণ শ্রমবাজার শুধু খুলে গেলেই হবে না; এমনভাবে খুলতে হবে, যাতে একজন দরিদ্র কৃষকের সন্তান কিংবা গ্রামের বেকার যুবক দালালের কাছে জমি বিক্রি করে ঋণগ্রস্ত না হন।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বাস্তবতা বিবেচনায় মালয়েশিয়া একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার রাষ্ট্র। জনসংখ্যার একটি বড় অংশ কর্মক্ষম বয়সে উপনীত হলেও দেশের অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, যাদের জন্য সম্মানজনক ও টেকসই কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। শিল্পায়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা চলমান থাকলেও স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাংলাদেশের জন্য একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এই প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়ার মতো একটি স্থিতিশীল ও দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির শ্রমবাজারে আরও বেশি বাংলাদেশি শ্রমিকের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত দাবি।
বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মদক্ষতা, পরিশ্রম এবং অভিযোজন সক্ষমতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইতোমধ্যে স্বীকৃত। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতি এবং ইউরোপের কিছু শ্রমঘন খাতে বাংলাদেশের শ্রমিকরা তাঁদের কর্মনিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। মালয়েশিয়াতেও দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি শ্রমিকরা নির্মাণশিল্প, পাম অয়েল বাগান, ম্যানুফ্যাকচারিং, পরিষেবা খাত, গুদাম ব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।
স্থানীয় শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় বিদেশি কর্মীদের ওপর মালয়েশিয়ার নির্ভরশীলতা নতুন কোনো বিষয় নয়। দেশটির দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে ভবিষ্যতেও বিপুল সংখ্যক শ্রমশক্তির প্রয়োজন হবে বলে বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে কেবল শ্রমিক পাঠানোর সংখ্যাগত বৃদ্ধি কোনো দেশের জন্য চূড়ান্ত সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। একজন শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার আগে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছেন, তিনি কী ধরনের চুক্তির আওতায় যাচ্ছেন, নির্ধারিত বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন কি না, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত হচ্ছে কি না- এসব বিষয়ও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
অতীতে দেখা গেছে, অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার জন্য জমি বিক্রি করেছেন, উচ্চ সুদে ঋণ নিয়েছেন কিংবা পরিবারের সঞ্চিত সম্পদ ব্যয় করেছেন। বিদেশে গিয়ে প্রত্যাশিত কাজ বা বেতন না পেয়ে তাঁরা চরম হতাশার মধ্যে পড়েছেন। কেউ কেউ আবার অবৈধ অবস্থানের কারণে আটক হয়েছেন কিংবা দেশে ফিরে এসে ঋণের বোঝা বইতে বাধ্য হয়েছেন। এই অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শ্রমবাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি শ্রম অভিবাসনের প্রতিটি ধাপে সুশাসন প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য।
লেখক: সংবাদকর্মী।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































