মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধোত্তর বাস্তবতা: একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার পূর্বাভাস

মো. সাইফুল ইসলাম মাসুম
  প্রকাশিত : ১৮ জুন ২০২৬, ১৮:৫০
অ- অ+

মধ্যপ্রাচ্যকে বহুদিন ধরেই বিশ্বের ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু বলা হয়। পৃথিবীর মোট প্রমাণিত তেল ও গ্যাস সম্পদের একটি বড় অংশ এই অঞ্চলে অবস্থিত, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি এখানেই অবস্থিত, আর ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতার কারণে এই অঞ্চল কখনোই কেবল একটি আঞ্চলিক ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে সংঘাত, অভ্যুত্থান, প্রক্সি যুদ্ধ এবং পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা বৈশ্বিক রাজত্ব প্রতিষ্ঠা এগুলো পরিলক্ষিত হয়।

বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এমন কিছু অঞ্চল রয়েছে, যেগুলো কেবল ভৌগোলিক গুরুত্বের কারণে নয়, বরং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণে তাদের প্রভাবের কারণে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য সেই ধরনের একটি অঞ্চল। বিগত এক শতাব্দী ধরে এই অঞ্চল বিশ্ব শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, সামরিক কৌশল, ধর্মীয় পরিচয় এবং ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যের সংঘর্ষের প্রধান মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। অটোমান সাম্রাজ্যের পতন থেকে শুরু করে সুয়েজ সংকট, আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ, ইরানি বিপ্লব, উপসাগরীয় যুদ্ধ, ইরাক আক্রমণ, আরব বসন্ত এবং সাম্প্রতিক গাজা সংকট—প্রতিটি ঘটনাই প্রমাণ করেছে যে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘটিত কোনো ঘটনা কখনোই কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, নিরাপত্তা কাঠামো এবং পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত অবস্থানে।

সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতও সেই ধারাবাহিকতারই সর্বশেষ অধ্যায়। অনেকেই এই সংঘর্ষকে একটি আঞ্চলিক সামরিক দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখার চেষ্টা করছেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল আন্তর্জাতিক শক্তির পুনর্বিন্যাস, প্রতিরোধ কৌশলের কার্যকারিতা, আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াই এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার পরিবর্তনশীল গতিপ্রকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগার। যুদ্ধক্ষেত্রে ছোড়া প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল এর রাজনৈতিক বার্তা, কৌশলগত প্রতিক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরান নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে। অন্যদিকে ইসরায়েলকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা অঙ্গীকার এবং আঞ্চলিক মিত্রতার কাঠামো মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যকে একটি নির্দিষ্ট রূপ দিয়েছিল। কিন্তু গত এক দশকে এই ভারসাম্য ক্রমশ পরিবর্তিত হতে শুরু করে। চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, রাশিয়ার কৌশলগত প্রত্যাবর্তন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘Middle East Fatigue’, এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণের প্রবণতা একটি নতুন বাস্তবতার জন্ম দেয়। ফলে সাম্প্রতিক সংঘাতকে শুধুমাত্র ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধভাবে ব্যাখ্যা করলে এর বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য অনুধাবন করা সম্ভব হবে না।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশিষ্ট তাত্ত্বিক হ্যান্স মরগেনথাউ ও কেনেথ ওয়াল্টজের বাস্তববাদী তত্ত্ব অনুসারে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা মূলত ক্ষমতা ও নিরাপত্তার প্রতিযোগিতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। রাষ্ট্রসমূহ নৈতিকতা নয়, বরং নিজেদের অস্তিত্ব ও কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সাম্প্রতিক সংঘাত ছিল একটি ক্লাসিক ‘Security Competition’-এর বহিঃপ্রকাশ। ইরান তার প্রতিরোধ ক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখতে চেয়েছে; ইসরায়েল সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি দূর করতে চেয়েছে; আর যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তার দীর্ঘদিনের কৌশলগত প্রাধান্য অক্ষুণ্ণ রাখতে চেয়েছে। কিন্তু সংঘাতের পরিণতি দেখিয়েছে যে একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে সামরিক শক্তি থাকা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জন করা সবসময় এক জিনিস নয়।

এই যুদ্ধ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বকে সামনে নিয়ে এসেছে—‘Balance of Power’ বা শক্তির ভারসাম্য তত্ত্ব। ইতিহাস বলে, কোনো একটি শক্তি যখন অতিরিক্ত প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, তখন অন্য শক্তিগুলো স্বাভাবিকভাবেই তার বিপরীতে নতুন জোট, নতুন কৌশল এবং নতুন প্রতিরোধ কাঠামো গড়ে তোলে। মধ্যপ্রাচ্যে আজ আমরা সেই প্রক্রিয়াকেই নতুনভাবে প্রত্যক্ষ করছি। একদিকে ইরান তার আঞ্চলিক নেটওয়ার্ককে ধরে রাখার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্বিবেচনা করছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলও বুঝতে পারছে যে প্রযুক্তিগত ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।

তবে এই সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে নিহিত। কারণ আজকের বিশ্বে যুদ্ধ কেবল সামরিক শক্তির প্রতিযোগিতা নয়; এটি অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জ্বালানি, সরবরাহ শৃঙ্খল, তথ্যযুদ্ধ এবং কূটনৈতিক প্রভাবেরও প্রতিযোগিতা। হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয়ের উল্লম্ফন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ তারই প্রমাণ। অর্থাৎ যুদ্ধটি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘটিত হলেও এর অর্থনৈতিক মূল্য পরিশোধ করেছে বিশ্বের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ।

সুতরাং, ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতকে কেবল একটি সামরিক অধ্যায় হিসেবে দেখা হবে একটি গুরুতর বিশ্লেষণগত ভুল। বরং এটি এমন একটি ভূ-রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য, যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব, চীনের উত্থান, আঞ্চলিক জোটরাজনীতির ভবিষ্যৎ এবং বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার আবির্ভাব—সবকিছু একসঙ্গে প্রতিফলিত হয়েছে। যুদ্ধ হয়তো আপাতত থেমেছে, কিন্তু এর প্রতিধ্বনি আন্তর্জাতিক রাজনীতির করিডরে বহু বছর ধরে শোনা যাবে। আর সেই কারণেই এই সংঘাতের মূল্যায়ন করতে হলে আমাদের যুদ্ধক্ষেত্রের ধোঁয়ার ওপারে তাকাতে হবে—সেখানে, যেখানে ভবিষ্যৎ বিশ্বের ক্ষমতার মানচিত্র ধীরে ধীরে পুনরায় আঁকা হচ্ছে।

ইতিহাসে অনেক যুদ্ধ আছে যেগুলোর বিজয়ী নির্ধারণ করা সহজ, কিন্তু কিছু সংঘাত আছে যেগুলোর প্রকৃত ফলাফল যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বরং পরবর্তী দশকের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্ধারিত হয়। সাম্প্রতিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত দ্বিতীয় শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। যুদ্ধবিরতির ঘোষণা হয়তো সামরিক সংঘর্ষের সমাপ্তি ঘটিয়েছে, কিন্তু এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার যে পুনর্গঠন শুরু হয়েছে, তার অভিঘাত আগামী বহু বছর ধরে অনুভূত হবে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী তত্ত্ব (Realist School) আমাদের শেখায় যে রাষ্ট্রের আচরণ মূলত ক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং টিকে থাকার প্রয়োজনীয়তা দ্বারা পরিচালিত হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সংঘাতের শুরুতে ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের লক্ষ্য ছিল শুধু সামরিক চাপ সৃষ্টি নয়; বরং ইরানের কৌশলগত সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া, তার আঞ্চলিক প্রভাব সীমিত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্যমান শক্তির ভারসাম্য নিজেদের পক্ষে পুনর্গঠন করা। কিন্তু যুদ্ধের সমাপ্তিতে দেখা যাচ্ছে, ইরান দুর্বল হয়েছে বটে, কিন্তু ভেঙে পড়েনি। রাষ্ট্রটি তার রাজনৈতিক কাঠামো, সামরিক কমান্ড এবং আঞ্চলিক প্রভাবের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হয়েছে।

এখানেই যুদ্ধটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত শিক্ষা নিহিত। আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং রাজনৈতিক বিজয় এক বিষয় নয়। ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান এবং ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা যেমন দেখিয়েছে, তেমনি এই সংঘাতও প্রমাণ করেছে যে প্রযুক্তিগত আধিপত্য একটি রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু সবসময় তাকে নতজানু করতে পারে না। Clausewitz-এর বিখ্যাত তত্ত্ব অনুযায়ী, যুদ্ধ হলো রাজনীতির ধারাবাহিকতা; আর যদি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জিত না হয়, তবে সামরিক সাফল্যও আংশিক সাফল্যে পরিণত হয়।

ইসরায়েলের জন্য এই যুদ্ধ একটি দ্বিমুখী বাস্তবতা তৈরি করেছে। একদিকে তারা ইরানের অভ্যন্তরে গভীর গোয়েন্দা সক্ষমতা ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের দক্ষতা প্রদর্শন করেছে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ‘অভেদ্য নিরাপত্তা বলয়’-এর ধারণাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এমন ধারণা শক্তিশালী হয়েছে যে আঞ্চলিক প্রতিপক্ষরা চাইলে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে কৌশলগত ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম। নিরাপত্তা-মনস্তত্ত্বের এই পরিবর্তন ভবিষ্যতের প্রতিরক্ষা নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।

তবে যুদ্ধটির সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য মধ্যপ্রাচ্যের অভ্যন্তরীণ শক্তির বিন্যাসে। Balance of Power Theory অনুসারে, কোনো একটি শক্তি যখন অত্যধিক প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, তখন অন্য রাষ্ট্রগুলো স্বাভাবিকভাবেই তার বিরুদ্ধে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করে। ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। উপসাগরীয় রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো এখন আগের চেয়ে বেশি নিরাপত্তা-উদ্বিগ্ন। ফলে ভবিষ্যতে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কুয়েতের সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এই যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তথাকথিত ‘Security Dilemma’-এর পুনরুত্থান। এক পক্ষ নিজেদের নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য যে পদক্ষেপ নেয়, অন্য পক্ষ সেটিকে হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে এবং পাল্টা সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ফলস্বরূপ পুরো অঞ্চল আরও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক কর্মসূচি এবং তার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান এই তত্ত্বের একটি ক্লাসিক উদাহরণ। বাস্তবতা হলো, যুদ্ধের পর ইরানের কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো এখন পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতার পক্ষে আরও শক্তিশালী যুক্তি দাঁড় করাতে পারবে।

কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় পরাজিত কোনো রাষ্ট্র নয়; বরং সাধারণ মানুষ। যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত সীমান্ত চেনে না। হরমুজ প্রণালিতে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, খাদ্যপণ্যের দাম চাপের মুখে পড়েছে এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো নতুন করে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিতে পড়েছে। বাংলাদেশ থেকে আফ্রিকা—সবখানেই নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অর্থনীতির ভাষায় এটিকে বলা যায় “War-Induced Inflationary Transmission Effect”।

প্যালেস্টাইন প্রশ্নটিও এই সংঘাতের আরেকটি নীরব শিকার। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি এখন নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার আড়ালে চলে গেছে। ইতিহাস বলে, যখন আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের অস্তিত্বের প্রশ্নে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন মানবিক ইস্যুগুলো কূটনৈতিক অগ্রাধিকার হারায়। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহও তার ব্যতিক্রম নয়।

সবচেয়ে গভীর পরিবর্তনটি সম্ভবত ঘটেছে বৈশ্বিক ক্ষমতার কাঠামোতে। Hegemonic Stability Theory অনুযায়ী, একটি প্রভাবশালী শক্তি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র সেই ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউক্রেন যুদ্ধ, শুল্কযুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দেখিয়েছে যে ওয়াশিংটনের একক নেতৃত্বের ক্ষমতা আগের মতো নিরঙ্কুশ নয়। এর বিপরীতে চীন নিজেকে একটি বিকল্প অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুযোগ পাচ্ছে। সামরিক হস্তক্ষেপের পরিবর্তে সরবরাহ শৃঙ্খল, বাণিজ্য এবং অবকাঠামোগত সংযোগের ওপর জোর দিয়ে বেইজিং একটি নতুন ধরনের বৈশ্বিক প্রভাব নির্মাণ করছে।

সুতরাং এই যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—বিশ্ব এখন ধীরে ধীরে একমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে বহুমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। হয়তো আজই নতুন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না, কিন্তু এর ভিত্তি রচিত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সেই পরিবর্তনের একটি প্রতীকী অধ্যায় মাত্র।

যুদ্ধ শেষ হয়েছে, কিন্তু ইতিহাসের বিচার এখনো শেষ হয়নি। প্রকৃত প্রশ্ন আজ কে জিতেছে তা নয়; বরং এই সংঘাতের পর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ক্ষমতার মানচিত্র কীভাবে পুনর্লিখিত হবে। কারণ অনেক সময় যুদ্ধক্ষেত্রে ছোড়া শেষ ক্ষেপণাস্ত্রটি যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করে, কিন্তু তার রাজনৈতিক প্রতিধ্বনি দশকের পর দশক ধরে বিশ্ব রাজনীতিকে পুনর্গঠন করে চলে।

লেখক: মো. সাইফুল ইসলাম মাসুম

(ব্যাংকার ও কলাম লেখক)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী টুকুর আত্মীয় পরিচয়ে পুলিশে চাকরির টোপ, ৮ লাখ টাকা হাতিয়ে প্রতারক গ্রেপ্তার
করের হার না বাড়িয়ে রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে: তিতুমীর
পরীমনিকাণ্ডে গোলাম সাকলায়েনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠালো সরকার, প্রজ্ঞাপন জারি
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বপরিসরেও অবদান রাখছে সেনাবাহিনী: ওয়াকার-উজ-জামান
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা