শূন্যরেখায় আটকা মানুষ: রাষ্ট্রসীমানা ও মানবতার টানাপোড়েন!

কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে শূন্যরেখায় বসে থাকা ছয়জন মানুষের ছবি আমাদের সময়ের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। সেখানে কোনো যুদ্ধ চলছে না, কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়নি, কোনো মহামারি ছড়িয়ে পড়েনি। তবুও দুই শিশু, এক নারী ও তিনজন পুরুষ তিন দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে আটকে আছেন। তারা কোনো দেশের ভেতরে নেই, আবার পুরোপুরি কোনো দেশের বাইরেও নন। তারা যেন দুই রাষ্ট্রের মানচিত্রের মাঝখানে আটকে পড়া কিছু মানুষ, যাদের পরিচয় আছে, জন্মভূমি আছে, পরিবার আছে, কিন্তু এই মুহূর্তে তাদের জন্য নেই কোনো নিরাপদ আশ্রয়।
এই দৃশ্য শুধু একটি সীমান্ত-সংকট নয়; এটি মানবতা, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, আন্তর্জাতিক আইন এবং অভিবাসন বাস্তবতার একটি কঠিন পরীক্ষা। যখন সুমি আক্তার বলেন, “আমগোর জীবন গেলে যাক, আমগোর বাচ্চা দুইডারে বাঁচাইন,” তখন সেটি কেবল একজন মায়ের আর্তনাদ নয়; সেটি রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি এক অসহায় প্রশ্ন। পৃথিবীর কোনো শিশুর কি এমন পরিস্থিতিতে বড় হওয়ার কথা? কোনো মায়ের কি বুকের দুধ শুকিয়ে যাওয়া শিশুকে কোলে নিয়ে দুই রাষ্ট্রের মাঝখানে বসে থাকতে বাধ্য হওয়ার কথা?
রাষ্ট্রের সীমারেখা মানুষের নিরাপত্তার জন্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু কখনো কখনো সেই সীমারেখাই মানুষের সবচেয়ে বড় অনিরাপত্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত। এই সীমান্ত শুধু ভূখণ্ডকে আলাদা করেনি; এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি, পরিবার, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনকেও বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করেছে।
সীমান্ত রক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। একটি রাষ্ট্রের নিজস্ব আইন, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার অধিকার রয়েছে। কাজের সন্ধানে বা অন্য কোনো কারণে সীমান্ত অতিক্রম করাও অপরাধ হতে পারে। কিন্তু অপরাধের বিচার এবং মানুষের মৌলিক অধিকার- এই দুটি বিষয়কে এক করে দেখা যায় না। একজন মানুষ আইন ভঙ্গ করতে পারেন, কিন্তু সেই কারণে তার মানবিক মর্যাদা বাতিল হয়ে যায় না। বিশেষ করে যখন সেই মানুষের সঙ্গে শিশু থাকে।
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী, শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ সব সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে। একটি শিশু কোনো অপরাধ করেনি। সে সীমান্ত পেরোনোর সিদ্ধান্ত নেয়নি। তাহলে কেন ভারত তাকে এভাবে অমানবিকভাবে সীমান্তে ঠেলে দেবে? কেউ অবৈধভাবে গিয়ে থাকলে সরকারের সঙ্গে আলোচনা ও প্রমাণ সাপেক্ষে তাদের প্রত্যর্পণ করতে পারে। কিন্তু অবৈধ অনুপ্রেবেশের দোহাই দিয়ে কাউকে এভাবে ঠেলে দিতে পারে না।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘পুশইন’ শব্দটি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অভিধানে বহুল আলোচিত। এর অর্থ হলো কোনো ব্যক্তিকে যথাযথ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সীমান্ত পার করে অন্য দেশে ঠেলে দেওয়া। যদি কেউ সত্যিই বাংলাদেশের নাগরিক হন, তাহলে তাকে ফেরত পাঠানোর জন্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। দুই দেশের প্রশাসন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পরিচয় যাচাই ও হস্তান্তরের ব্যবস্থা আছে। এই প্রক্রিয়া এড়িয়ে কাউকে রাতের অন্ধকারে সীমান্তে এনে ছেড়ে দেওয়া কোনো সভ্য রাষ্ট্রের আচরণ হতে পারে না।
এতে শুধু একটি দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হয় না; সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানুষ। একজন মানুষ হঠাৎ করে এমন অবস্থায় পড়েন, যেখানে তিনি আইনগতভাবে অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে যান। তিনি কার হেফাজতে? তার নিরাপত্তার দায়িত্ব কার? তার চিকিৎসার ব্যবস্থা কে করবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অস্পষ্ট হয়ে যায়। আর যখন তাদের সঙ্গে শিশু ও নারী থাকে, তখন বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
এই ঘটনার সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক হলো স্থানীয় মানুষের ভূমিকা। স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের খাবার ও পানি দিয়েছেন। কেউ হয়তো নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে সাহায্য করেছেন। বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের একটি বড় শক্তি হলো এই মানবিক সংস্কৃতি। বিপদে মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ায়। ধর্ম, রাজনীতি, পরিচয় কিংবা কাগজপত্রের হিসাব না কষে আগে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখে। এই মূল্যবোধই আমাদের সমাজকে টিকিয়ে রেখেছে।
তবে বাস্তবতা হলো, স্থানীয় মানুষের সহানুভূতি কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। কয়েক বোতল পানি বা কিছু খাবার জীবন বাঁচাতে পারে, কিন্তু সংকটের সমাধান করতে পারে না। সমাধান আসতে হবে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ থেকে। আমরা প্রায়ই সীমান্তকে মানচিত্রের রেখা হিসেবে দেখি। কিন্তু শিশুদের কাছে সীমান্তের অর্থ কী? ফাতেমা খাতুন কিংবা ফাহিমা খাতুন হয়তো জানেই না ভারত কী, বাংলাদেশ কী, আন্তর্জাতিক আইন কী কিংবা কূটনৈতিক প্রক্রিয়া কী। তারা শুধু জানে ক্ষুধা কী। তারা জানে গরমে কষ্ট কী। তারা জানে রাতে ভয় পাওয়া কী।
বাংলাদেশের অবস্থানও সহজ নয়। যথাযথ পরিচয় যাচাই ছাড়া কাউকে গ্রহণ করা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এই যুক্তি অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে শূন্যরেখায় অবস্থান করা কোনো ব্যক্তি যদি নিজেকে বাংলাদেশি বলে দাবি করেন, তাহলে দ্রুত তার পরিচয় যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা সীমান্তের মাঝখানে আটকে পড়েন। কেউ শরণার্থী, কেউ অভিবাসী, কেউ পাচারের শিকার, কেউ আবার রাজনৈতিক সংঘাতের বলি। তাদের সবার মধ্যে একটি মিল- তারা ধীরে ধীরে ভাষাহীন হয়ে যান। তাদের কণ্ঠস্বর সংবাদে আসে, ছবি ছাপা হয়, আলোচনা হয়। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার টেবিলে তারা উপস্থিত থাকেন না। তাদের জীবন নিয়ে অন্যরা সিদ্ধান্ত নেয়।
রৌমারীর ওই ছয়জন মানুষও সেই বাস্তবতার অংশ। তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে রাষ্ট্র, প্রশাসন, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং নিরাপত্তা সংস্থার আলোচনা। কিন্তু তাদের ক্ষুধা, ভয় ও যন্ত্রণা তাৎক্ষণিক। সেই যন্ত্রণা কোনো বৈঠকের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করে না।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক বহুমাত্রিক। অর্থনীতি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, সংস্কৃতি- সব ক্ষেত্রেই সহযোগিতা রয়েছে। এই সম্পর্কের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে তখনই, যখন সীমান্তে মানবিক আচরণের নিশ্চয়তা থাকবে। সীমান্তে কোনো সমস্যা দেখা দিলে সেটিকে কেবল নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে না দেখে মানবিক সমস্যা হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। কারণ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রকৃত পরীক্ষা হয় সংকটের মুহূর্তে। মানুষের জীবন রক্ষার ক্ষেত্রে যদি দুই দেশ দ্রুত ও কার্যকর সমাধান দিতে পারে, তাহলে সেটিই হবে প্রকৃত বন্ধুত্বের পরিচয়।
রৌমারীর শূন্যরেখায় বসে থাকা ছয়জন মানুষ আমাদের সামনে একটি আয়না তুলে ধরেছেন। সেই আয়নায় আমরা শুধু তাদের দুর্দশা দেখি না; আমরা দেখি রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা, দারিদ্র্যের নির্মমতা, অভিবাসনের বাস্তবতা এবং মানবতার চ্যালেঞ্জ। কোনো সভ্য সমাজের জন্য এটি স্বস্তির দৃশ্য নয় যে দুই শিশু তিন দিন ধরে দুই দেশের মাঝখানে আটকে থাকবে, আর পৃথিবী তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করবে। আইন প্রয়োজন। সীমান্ত প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়াও প্রয়োজন। কিন্তু এসবের কেন্দ্রবিন্দুতে যদি মানুষ না থাকে, তাহলে সবকিছুই অর্থহীন হয়ে যায়।
লেখক: সংবাদকর্মী।
(ঢাকাটাইমস/১৮জুন/মোআ)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































