যানবাহনে যাত্রী হয়রানি বন্ধ হবে কবে?

একটি আধুনিক, গতিশীল এবং উন্নত রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো তার সুশৃঙ্খল ও জবাবদিহিতামূলক গণপরিবহন ব্যবস্থা। ২০২৬ সালের জুনে দাঁড়িয়ে আমরা যখন দেশের মেগা প্রকল্পগুলোর সুফল ভোগ করছি—মেট্রোরেলের বর্ধিত রুট, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কিংবা ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের আংশিক চালু হওয়া যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে—ঠিক তখনই সাধারণ বাস, লেগুনা এবং সিএনজি ও ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার মতো গণপরিবহনে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের চিত্রটি আমাদের আধুনিকায়নের দাবিকে বড় ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ করে। প্রতিদিন সকালে কর্মস্থলে যাওয়ার যুদ্ধ থেকে শুরু করে রাতে বাড়ি ফেরা পর্যন্ত—সাধারণ মানুষের যাতায়াতের পুরো পথটাই যেন এক অন্তহীন মানসিক ও শারীরিক লাঞ্ছনার নামান্তর। সমকালীন বাংলাদেশে গণপরিবহন খাতে যাত্রী হয়রানির যে চিত্র প্রতিনিয়ত দেখা যাচ্ছে, তা কোনো সভ্য দেশের নাগরিক অধিকারের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। এমতাবস্থায় সচেতন নাগরিক মাত্রই মনে একটি তীব্র প্রশ্ন জাগে—যানবাহনে এই চির চেনা যাত্রী হয়রানি আসলে বন্ধ হবে কবে?
দুই. হয়রানির বহুমাত্রিক রূপ: পরিসংখ্যান ও বাস্তবতার আলোয়
আমাদের দেশে গণপরিবহনে যাত্রী হয়রানির রূপ ও ধরণ এতটাই বৈচিত্র্যময় ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে যে, একজন যাত্রী ঘর থেকে বের হওয়ার পর থেকে গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতি পদে পদে জিম্মি হয়ে পড়েন। এই হয়রানির প্রধান প্রধান খাতগুলো বিশ্লেষণ করলে একটি ভয়াবহ নৈরাজ্যের চিত্র ফুটে ওঠে:
- ভাড়ার নৈরাজ্য ও কৃত্রিম উপায়ে কিলোমিটার বৃদ্ধি: বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (BRTA) কর্তৃক নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা প্রতিটি বাসে ঝুলিয়ে রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও ২০২৬ সালেও তার কোনো কার্যকর প্রয়োগ নেই। ওয়েবিল ও চেকার বসিয়ে 'লকড-গেট' বা 'স্পেশাল সার্ভিস'-এর নামে দূরত্বের চেয়ে দ্বিগুণ-ত্রিগুণ ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। ২০২৩ সালের শেষের দিকে প্রবর্তিত ই-টিকেটিং ব্যবস্থা ২০২৬ সালের মাঝামাঝি এসে বাস মালিকদের অনীহা ও তদারকির অভাবে প্রায় ভেস্তে গেছে। এ নিয়ে প্রতিবাদ করলেই বাসের চালক ও সহকারীদের (হেল্পার) হাতে যাত্রীদের অপদস্থ হতে হয়।
- নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের নিরাপত্তাহীনতা: বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ২০২৫-২৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গণপরিবহনে যাতায়াতকারী প্রায় ৮০ শতাংশ নারী কোনো না কোনোভাবে শারীরিক, মানসিক বা শাব্দিক (Verbal) হেনস্তার শিকার হন। বাসে ওঠার সময় কৃত্রিম ভিড় তৈরি করে নারীদের স্পর্শ করা, সংরক্ষিত আসন পুরুষদের দখলে থাকা এবং চালক-সহকারীদের আপত্তিকর অঙ্গভঙ্গি এখন নিত্যদিনের ঘটনা। এছাড়া গণপরিবহনে প্রতিবন্ধী বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের যাতায়াতের জন্য ন্যূনতম কোনো ব্যবস্থা বা সহমর্মিতা নেই।
- ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও রুটের জবরদখল: বিআরটিএ-এর নিজস্ব হিসাবমতেই, দেশের সড়কগুলোতে এখনো কয়েক লাখ ফিটনেসবিহীন, কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী এবং লক্কড়-ঝক্কড় যানবাহন চলাচল করছে। সুপ্রিম কোর্ট ও হাই কোর্টের বারবার নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও এসব গাড়ি অবলীলায় রাজধানীসহ মহাসড়কগুলোতে চলছে। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে যাতায়াত করতে বাধ্য করা সাধারণ যাত্রীদের জন্য অন্যতম বড় হয়রানি।
- ডিজিটাল অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং ও সিএনজির স্বেচ্ছাচারিতা: সাধারণ বাসের বিকল্প হিসেবে গড়ে ওঠা অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং (উবার, ইনড্রাইভ ইত্যাদি) সেবাগুলো এখন বড় চালক-সিন্ডিকেটের কবলে। ২০২৬ সালের জুনের বর্তমান চিত্র হলো, চালকেরা অ্যাপে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়ে 'অফ-অ্যাপে' চুক্তিতে দ্বিগুণ ভাড়ায় যেতে যাত্রীদের বাধ্য করছে। অন্যদিকে, সিএনজি অটোরিকশাগুলো মিটারে চলা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে।
তিন. নৈরাজ্যের নেপথ্যে: জবাবদিহিতা ও আইনের অভাব
যানবাহনে যাত্রী হয়রানির এই সংস্কৃতির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব এবং পরিবহন মালিক-শংশ্লিষ্ট শক্তিশালী সিন্ডিকেটের একচেটিয়া আধিপত্য। অনেক সময় দেখা যায়, পরিবহন খাতের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ দেশের নীতিনির্ধারণী বা রাজনৈতিক কাঠামোর সাথে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত। ফলে সাধারণ যাত্রীদের স্বার্থের চেয়ে পরিবহন মালিকদের বাণিজ্যিক মুনাফাই বেশি প্রাধান্য পায়।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ভূমিকাও এখানে প্রশ্নবিদ্ধ। মাঝেমধ্যে বিআরটিএ-এর ভ্রাম্যমাণ আদালত বা ট্রাফিক পুলিশ কিছু জরিমানা করলেও তা সাময়িক হুজুগ মাত্র। অভিযান শেষ হতেই পরিস্থিতি আবার আগের জায়গায় ফিরে যায়। বাসের চালক ও হেল্পারদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো পেশাদারিত্ব নেই; নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা আচরণগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। দৈনিক জমার চুক্তিতে (Daily Target) বাস চালানোর কারণে চালকদের মধ্যে বেশি ট্রিপ মারার এবং বেশি যাত্রী তোলার এক আত্মঘাতী প্রতিযোগিতা তৈরি হয়, যার বলি হতে হয় সাধারণ মানুষকে।
চার. মেগা প্রজেক্ট বনাম গণপরিবহনের বৈষম্য
যোগাযোগ অবকাঠামোতে দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ বাসের নৈরাজ্য কমেনি। কারণ দেশের ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ এখনো সাধারণ বাসের ওপরই নির্ভরশীল। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক মেট্রোরেল থেকে নেমে যখন একজন যাত্রীকে লোকাল বাসে উঠে ভাড়ার জন্য কন্ডাক্টরের সাথে তর্কে জড়াতে হয়, তখন উন্নয়নের আসল বৈষম্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাসের আধুনিকায়ন এবং রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি (এক রুটে এক কোম্পানি) করার ঢাকা নগর পরিবহন বা 'বাস রুট রেশনালাইজেশন' উদ্যোগটি গত কয়েক বছর ধরে ফাইলচাপা পড়ে আছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সিন্ডিকেটের বাধার মুখে এই আধুনিক উদ্যোগগুলো আলোর মুখ দেখছে না।
পাঁচ. হয়রানি বন্ধে করণীয়: একটি সমন্বিত রোডম্যাপ
যানবাহনে যাত্রী হয়রানি রাতারাতি বন্ধ করা সম্ভব নয়, তবে সরকারের সদিচ্ছা এবং কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এই নৈরাজ্য অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এর জন্য জরুরি কিছু পদক্ষেপ নিচে আলোচনা করা হলো:
ক. ক্যাশলেস ট্রান্সপোর্ট ও ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল: বাসে ম্যানুয়াল বা নগদ টাকায় ভাড়া আদায় সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। 'র্যাপিড পাস' বা স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে ক্যাশলেস ভাড়া আদায় বাধ্যতামূলক করা এবং পুরো ঢাকাকে ৫ থেকে ৬টি নির্দিষ্ট কোম্পানির অধীনে এনে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি দ্রুত বাস্তবায়ন করা ছাড়া বিকল্প নেই। এতে চালকদের মধ্যে যাত্রী ধরার প্রতিযোগিতা বন্ধ হবে।
খ. কঠোর ডিজিটাল নজরদারি ও মনিটরিং অ্যাপ: বিআরটিএ এবং ট্রাফিক পুলিশের সমন্বয়ে একটি কেন্দ্রীয় অ্যাপ চালু করতে হবে, যেখানে যাত্রীরা বাসের নম্বর দিয়ে তাৎক্ষণিক হয়রানি বা অতিরিক্ত ভাড়ার অভিযোগ (ছবি বা অডিওসহ) করতে পারবেন এবং সেই অভিযোগের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সমাধান হতে হবে। প্রতিটি বাসে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন বাধ্যতামূলক করা উচিত, যা নারী যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভূমিকা রাখবে।
গ. রাইড শেয়ারিং ও সিএনজির ওপর কঠোর তদারকি: অফ-অ্যাপে ট্রিপ নেওয়া রাইডিং চালকদের আইডি চিরতরে ব্লক করা এবং লাইসেন্স বাতিলের আইন করতে হবে। সিএনজি অটোরিকশার ক্ষেত্রে ডিজিটাল মিটারের সাথে ট্রাফিক কন্ট্রোল রুমের সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
ঘ. শ্রমিকদের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও ডোপ টেস্ট: পরিবহন শ্রমিকদের দৈনিক জমার চুক্তিতে বাস দেওয়া আইন করে নিষিদ্ধ করতে হবে। তাদের নির্দিষ্ট মাসিক বেতন, কর্মঘণ্টা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিয়োগপত্রের আওতায় আনতে হবে। ডোপ টেস্ট (মাদক পরীক্ষা) শতভাগ কার্যকর করে তবেই চালকদের লাইসেন্স নবায়ন করতে হবে।
ঙ. স্বতন্ত্র নারী-শিশু ও স্কুল-কলেজ সার্ভিস বাস চালু: ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও যাতায়াতের ঝুঁকি বিবেচনায় নিরাপদ ভ্রমণের নিশ্চয়তা দিতে মহানগরীর প্রতিটি রুটে ডেডিকেটেড 'নারী-শিশু ও স্কুল সার্ভিস বাস' অবিলম্বে চালু করা প্রয়োজন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সময় অনুযায়ী বিশেষ বাস সার্ভিস থাকলে শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাতায়াত সহজ হবে এবং অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা ও অতিরিক্ত ব্যক্তিগত যানবাহনের চাপ অনেক হ্রাস পাবে। গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা ও হয়রানি রোধে এই সেবাটি একটি কার্যকর ঢাল হিসেবে কাজ করবে, যা কর্মজীবী নারীদের নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌঁছাতে সহায়তা করবে। উন্নত বিশ্বের ন্যায় নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে এই বিশেষ বাসগুলো পরিচালিত হলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে এবং সাধারণ বাসের ওপর থেকে অতিরিক্ত ভিড়ের চাপ কমবে। সরকারের উচিত বিআরটিসি (BRTC) ও বেসরকারি পরিবহন মালিকদের সমন্বয়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক বিশেষায়িত বাসের ব্যবস্থা করে এই মানবিক ও জনবান্ধব সেবাকে টেকসই করা।
উপসংহার
যানবাহনে যাত্রী হয়রানি কেবল যাতায়াতের সমস্যা নয়, এটি একজন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারের লঙ্ঘন। স্বাধীন দেশের একজন ট্যাক্স প্রদানকারী নাগরিক হিসেবে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও মর্যাদাপূর্ণ যাতায়াতের সুযোগ পাওয়া প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। ২০২৬ সালের এই অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার যুগে আমরা যদি আমাদের গণপরিবহন খাতকে একটি আধুনিক ও শৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে আনতে না পারি, তবে আমাদের স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য অধরাই থেকে যাবে। পরিবহন খাতের গডফাদার ও সিন্ডিকেটের চেয়ে সাধারণ জনগণের স্বস্তি অনেক বড়—এই সত্যটি প্রশাসনকে উপলব্ধি করতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর আইনি প্রয়োগ এবং যাত্রী সাধারণের সচেতনতার সম্মিলিত প্রয়াসই পারে এই অন্ধকার অধ্যায়ের অবসান ঘটাতে। আমরা একটি নিরাপদ, আরামদায়ক এবং হয়রানিমুক্ত গণপরিবহন ব্যবস্থার অপেক্ষায় আছি, যেখানে প্রতিটি যাত্রা হবে স্বস্তির, আতঙ্কের নয়।
লেখক: জনস্বাস্থ্য ও সমাজনীতি বিষয়ক গবেষক; শিক্ষক ও চেয়ারম্যান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ
(ঢাকাটাইমস/১৭ জুন/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































