সংসদ নির্বাচনে কোন জোট এগিয়ে রয়েছে?

বাংলাদেশের ১২ই ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একদিকে ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি, অন্যদিকে সুশৃঙ্খল ধর্মভিত্তিক দল জামায়াতে ইসলামী। এই দুই শক্তির বাইরে 'জেনারেশন জি' বা তরুণ ভোটাররা এক বিশাল ফ্যাক্টর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ১৭ বছর পর বিদেশের মাটিতে থাকা রাজনৈতিক কর্মীদের ফেরা, খালেদা জিয়ার মৃত্যু এবং নতুন ভোটারদের মনস্তত্ত্ব-সব মিলিয়ে আগামী নির্বাচন হবে এক অভাবনীয় দ্বৈরথ। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক পরিবর্তনের উদাহরণ বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে কতটা প্রাসঙ্গিক, তা এখন আলোচনায় স্থান পেতে পারে।
বিএনপির সর্বনিম্ন ভোট ব্যাংক ৩২% এবং সর্বোচ্চ ৪০% হওয়ার সম্ভাবনা ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে যৌক্তিক। অন্যদিকে, জামায়াতের ভোট ৭% থেকে বেড়ে ১০% বা তার বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গাণিতিকভাবে, যদি আওয়ামী লীগের বিশাল ভোট ব্যাংক (যা গত নির্বাচনে গড়ে ৩০-৩৫% ছিল) নিষ্ক্রিয় থাকে বা অন্য কোথাও স্থানান্তরিত হয়, তবে জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে ব্যবধান কমে আসবে। ৩ আসন থেকে ১৬৯ আসনে পৌঁছানোর শ্রীলঙ্কান মডেল (NPP-এর বিজয়) প্রমাণ করে যে, গাণিতিক উল্লম্ফন অসম্ভব নয়। নির্বাচন কমিশনের পূর্ববর্তী পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সামান্য ৩-৫% ভোটের পরিবর্তনই ক্ষমতার পাল্লা বদলে দিতে পারে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের অভাবনীয় বিজয় এবং ছাত্রদলের পরাজয় আগামী জাতীয় নির্বাচনে তরুণ ও নতুন ভোটারদের মনস্তত্ত্বে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই ফলাফল দেশের মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তথা সাড়ে চার কোটি তরুণ ভোটারের মধ্যে বিএনপির সাংগঠনিক আবেদন কমে আসা এবং জামায়াত-শিবিরের প্রতি ক্রমবর্ধমান জনসমর্থনের প্রতিফলন হতে পারে। এটি জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির ভোটব্যাংকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার পাশাপাশি জামায়াতের রাজনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে জোরালো করছে। সামগ্রিকভাবে, এই মেরুকরণ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের ভোটের সমীকরণ বদলে দিতে পারে এবং ভোটের অংকে শিবিরের এই সাফল্য জামায়াতকে একটি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়ক হতে পারে।
৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ একটি বড় ফ্যাক্টর। বিএনপির বিরুদ্ধে সর্বমোট চাঁদাবাজির ৮০% এবং বৈষম্যবিরোধী/এনসিপির বিরুদ্ধে ১৫% অভিযোগ জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মনস্তাত্ত্বিকভাবে, সাধারণ মানুষ স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা চায়। জামায়াতের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ না থাকায় তাদের জন্য একটি 'ক্লিন ইমেজ' তৈরি করছে, যা নীরব ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সহায়ক।
সাড়ে ৪ কোটি তরুণ ভোটার এবার নির্বাচনের অন্যতম চালিকাশক্তি। এই জেনারেশন ঐতিহ্যবাহী রাজনীতির চেয়ে বর্তমানের আচরণ ও তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভরতা বেশি দেখে। জামায়াতের ডিজিটাল প্রচারণা এবং সুশৃঙ্খল ব্যবহার তরুণদের বড় অংশকে টানছে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জনমত যাচাই করলে দেখা যায়, তরুণরা আদর্শের চেয়ে 'পারফরম্যান্স' এবং 'ডিসিপ্লিন'কে গুরুত্ব দেয়। এই জেনারেশন এর ভোটের বড় অংশ জামাত এনসিপি জোটের ঝুলিতে যেতে পারে।
নির্বাচনে বিএনপি-র জন্য 'হাওয়া ভবন' ও 'খাম্বা' বিষয়ক অপপ্রচার বা বদনাম ভোটারদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ এই নামগুলো সাধারণ মানুষের কাছে দুর্নীতি ও অপশাসনের প্রতীকে পরিণত হতে পারে। এর ফলে ভোটারদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে এবং বিরোধীরা একে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে জনমনে বিএনপির প্রতি নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করতে পারে।
আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটার গোষ্ঠী এখন ছন্নছাড়া। এই ভোটগুলো কোথায় যাবে? জামায়াত জোটে এনসিপি থাকায় আওয়ামী লীগের ভোট জামায়াতের চেয়ে বিএনপি এর দিকে বেশি যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এটি নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণে 'কিংমেকার' হিসেবে কাজ করতে পারে ।
নির্বাচনকালীন সরকার কাঠামো এবং সংবিধানের সংস্কার নিয়ে চলমান বিতর্ক ভোটারদের প্রভাবিত করছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো যদি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা দেয়, তবেই জনমত অনেকটা জামায়াত-এনসিপির দিকে যেতে পারে।
সাধারণ মানুষ চায় দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। যে দল অর্থনৈতিক সংস্কারের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেবে, নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত ভোটাররা তাদের দিকেই ঝুঁকবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে 'চা-এর কাপে তুফান' বা চায়ের দোকানের আড্ডা জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। বর্তমানে সামাজিক মাধ্যমে বিএনপির দীর্ঘদিন হতে চলমান সংস্কৃতি এবং জামাতের 'সুশীল' সাজার চেষ্টা নিয়ে নানা কৌতুক ও ট্রল তৈরি হচ্ছে। এই রম্যগুলো প্রকারান্তরে ভোটের প্রচারণারই অংশ। তবে এই বিষয়টি উভয়পক্ষ প্রায় সমান অবস্থায় রয়েছে।
সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর কর্মী ও নারীদের মাঠপর্যায়ে এবং সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সক্রিয়তা ভোটারদের মধ্যে নতুন মেরুকরণ তৈরি করতে পারে। এটি দলের ভোটের ভিত্তি মজবুত করার পাশাপাশি প্রতিপক্ষ দলগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এছাড়া, নারী কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নারী ভোটারদের আকৃষ্ট করতে এবং জনসমর্থন বাড়াতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
৫ আগস্টের পর জামায়াতের কর্মীদের সহনশীল ব্যবহার এবং মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর সামাজিক চিত্র তাদের ভোট বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায়, মানুষের তাৎক্ষণিক স্মৃতি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক আনুগত্যের চেয়ে বেশি কার্যকর হয়।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও হেফাজত ইসলামের সাথে জামায়াতের দূরত্ব ভোটের মাঠে একটি বড় বাধা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
জামায়াতের বিরুদ্ধে নারী নেতৃত্ব ও আর্মিকে হুমকির অভিযোগগুলো তাদের নারী ভোটার ও সচেতন সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে। এটি বিএনপির জন্য সুবিধাজনক হতে পারে ।
বিএনপির সাথে নীরব ভোটারদের সম্পৃক্ততা কম হওয়ার কারণ হতে পারে দলটির মাঠ পর্যায়ের কিছু নেতাকর্মীর আগ্রাসী ভূমিকা। নীরব ভোটাররা সাধারণত অস্থিরতা অপছন্দ করে। তারা শেষ মুহূর্তে এমন দলকে বেছে নেয় যারা স্থিতিশীলতার গ্যারান্টি দেয়।
১৭ বছর পর বিএনপির চেয়ারম্যানের দেশে ফেরা তাদের দলীয় ও জোটের ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের প্রাণ চাঞ্চল্য দেখা গেছে। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সাধারণ মানুষের সহানুভূতি বিএনপির জন্য একটি বড় 'ইমোশনাল কার্ড'। ঐতিহাসিক ভাবে, বাংলাদেশে সহানুভূতির ভোট বড় ভূমিকা পালন করে।
জামায়াতের জনসভায় লোক সমাগম বেশি হলেও তারা সারা দেশ থেকে লোক ভাড়া করে বা সাংগঠনিকভাবে নিয়ে আসার অভিযোগ রয়েছে। এটি প্রকৃত স্থানীয় জনমতের প্রতিফলন নাও হতে পারে। অন্যদিকে বিএনপির জনসমর্থন অনেক বেশি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
বর্তমানে ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান-আমেরিকা সম্পর্ক এবং সীমান্ত ইস্যু জাতীয় নির্বাচনে দেশাত্মবোধের আবেগ তৈরি করবে। যে দল সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কঠোর অবস্থান দেখাবে, ভোটাররা তাদের জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রতীক মনে করবে। এক্ষেত্রে বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে এগিয়ে থাকলেও জামায়াতও একই সুর ব্যবহার করছে।
যে কোনো নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে যায়। বিএনপির গণ-মামলা দেওয়ার প্রবণতা তাদের ভাবমূর্তি সংকটে ফেলতে পারে। বিএনপির বিরুদ্ধে মামলার পাহাড় ও চাঁদাবাজি এবং জামায়াতের বিরুদ্ধে নারী বিষয়ক উক্তি, ব্যালট সিল জালিয়াতি ও ব্যাংক কর্মচারীকে মারধরের অভিযোগ উভয় দলকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।
অসংখ্য বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় অন্তত ৫০ টি আসনে বিএনপি পরাজয় নিশ্চিত হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিপরীত দিকে জামায়াতে ইসলামের নেতৃত্বের প্রতি অবিচল আস্থা ও একক প্রার্থী তাদের বিজয় সহজ করে দিতে পারে।
নারী ভোটার এই নির্বাচনে নিঃসন্দেহে ফলাফল নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কারণ বাংলাদেশের মোট ভোটারের অর্ধেকের বেশি নারী ভোটার। পুরুষ ভোটের মধ্যে অনেকে পলাতক এবং প্রবাসী হওয়ায় তুলনামূলক ভোট কম কাস্ট হবে। জামায়াত বিভিন্ন বিষয়ে নারীদেরকে আশ্বস্ত করতে পারলে তারাও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারি ভোট নিজেদের ঝুলিতে নিতে পারবে। অন্যথায় স্বাভাবিকভাবেই বিএনপি সুস্পষ্টভাবে নারী ভোটে এগিয়ে থাকবে।
জামাত শিবির এর রগ কাটা এবং বিএনপি ক্ষমতা থাকাকালীন পরপর পাঁচবার বাংলাদেশের দুর্নীতির বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অতীতের অভিযোগের বিষয়টি ভোটারদের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে। এই দুটি বিষয়ও ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলতে পারে।
জামায়াতের মূল স্লোগান হল আল্লাহর আইন চাই, সৎ লোকের শাসন চাই। সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠনটি বলছে ইসলামী শরিয়া অর্থাৎ আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করবে না। এটি ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, আগামী নির্বাচন কেবল ভোট নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তনের পরীক্ষা। বিএনপি যদি তাদের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা, চাঁদাবাজি, অতীতের রেকর্ড ও মামলার রাজনীতি বিষয়ে জনগণকে আশ্বস্ত করতে পারে,তবে তারা বিজয় অর্জন করতে পারে। এই যাত্রায় বিএনপি যদি ব্যর্থ হয়, তবে জামায়াত-এনসিপি জোট শ্রীলঙ্কার মতো চমক দেখাতে পারে। এতে অবাক হওয়ার মত কিছু থাকবে না। অন্যদিকে, নির্বাচনী ময়দানে কাঙ্খিত ফল পেতে হলে জামায়াতের জন্য ১৯৭১-এর বিষয়ে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করা এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসা সহায়ক হতে পারে। তথাপি, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ক্ষমতার মসনদ কার হবেÑতা নির্ভর করছে অনেকটা তরুণদের চাওয়া এবং দলগুলোর নিজেদের সংশোধনের মাধ্যমে অধিকাংশ ভোটারের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের উপর।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কথা সাহিত্যিক, প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল। ইমেইল এড্রেস : [email protected]
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































