বিশ্লেষকদের মতামত: ১০ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তারেক রহমান বসছেন প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেসরকারিভাবে ঘোষিত ২৯৭টি আসনের ফলাফলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পেয়েছে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২৯৭টির মধ্যে ২০৯টি আসনে জয় পেয়েছে দলটি। সরকারপক্ষের সূত্র জানিয়েছে, আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন হতে পারে। প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতায় ফিরতে যাচ্ছে বিএনপি। দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান-ই হচ্ছেন নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী।
এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দুই দশক পর আবারও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরছে বিএনপি। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে এই বিজয়কে দলীয় নেতাকর্মীরা “রাজসিক প্রত্যাবর্তন” হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। নির্বাচনের আগে দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপড়েন, আন্দোলন-সংগ্রাম ও নির্বাসনের অধ্যায় পেরিয়ে তারেক রহমানের এই উত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক বাস্তবতার সূচনা করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, সরকার গঠনের প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করা হবে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন মন্ত্রিসভা গঠন হতে পারে। দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন তারেক রহমানই।
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর বিএনপি নেতারা বলেন, এটি শুধু একটি নির্বাচনী জয় নয়, বরং “গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের বিজয়”। দীর্ঘদিন পর জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে ক্ষমতায় আসার সুযোগকে তারা নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিপুল জনসমর্থনের এই বিজয় বিএনপির জন্য যেমন বড় অর্জন, তেমনি সামনে রয়েছে কঠিন চ্যালেঞ্জও। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, প্রশাসন সংস্কার, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা—এসব ইস্যুতেই নতুন সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে।
এদিকে, দলীয় প্রধান হিসেবে তারেক রহমান-এর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে জনগণের উচ্চ প্রত্যাশা পূরণ করা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। বিশ্লেষকদের মতে, জনগণের সমর্থনকে শক্তিতে পরিণত করে কার্যকর শাসন নিশ্চিত করতে পারলে নতুন সরকার বাংলাদেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানকে বড় ধরনের যেসব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে, তার মধ্যে রয়েছে—গণতান্ত্রিক অধিকার সংরক্ষণ করা; মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখা; ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গঠন করা; রাষ্ট্রের সব পর্যায় থেকে দুর্নীতি দূর করা; উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান থেকে দেশের সুরক্ষা প্রদান; কার্যকর নিরপেক্ষ ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম আমলাতন্ত্র গঠন; রাষ্ট্রের সামষ্টিক অর্থনীতিকে টেনে তোলা; মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলা; কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরির মাধ্যমে রাষ্ট্রে স্থিতিশীলতা আনা।
গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সংঘাতের পর গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা নতুন সরকারের প্রথম পরীক্ষা হবে। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখা এবং সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঝুঁকি মোকাবিলাও জরুরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সব মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার সংরক্ষণ, দারিদ্র্য ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন এবং উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান প্রতিরোধ করা। তার মতে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে না পারলে জনপ্রত্যাশা পূরণ কঠিন হবে।
প্রশাসন ঢেলে সাজানো বড় পরীক্ষা
গত সরকারের সময় প্রশাসনে দলীয়করণ ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে জনমনে ক্ষোভ রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রশাসনিক সংস্কারে কাঙ্ক্ষিত সফলতা না পাওয়ায় প্রশাসন বর্তমানে অনেকাংশে অকার্যকর ও গতিহীন হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সাবেক জনপ্রশাসন সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, “রাষ্ট্র একটি ঘর, সরকার তার ছাউনি আর আমলাতন্ত্র তার খুঁটি। খুঁটি নড়বড়ে হলে ঘর টিকে না।” তার মতে, পেশাদারিত্বকে গুরুত্ব দিয়ে আমলাতন্ত্র পুনর্গঠন করতে না পারলে সরকারের নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হবে।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সামষ্টিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা। রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিল্পখাতে স্থবিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংকোচনের কারণে দেশের অর্থনৈতিক গতি মন্থর হয়ে পড়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও রাজস্ব ঘাটতির মধ্যে সরকার পরিচালনা কঠিন হবে। কর কাঠামো পুনর্বিন্যাস, বাজার ব্যবস্থার সংস্কার এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি দমন
বিশ্লেষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং ব্যাংকিং খাতের সংকট মোকাবিলা নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। গত দেড় দশকে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও সরকারের বড় দায়িত্ব হবে।
কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা
বিশ্ব রাজনীতির জটিল প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের সামনে রয়েছে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা, ভিসা জটিলতা নিরসন এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবন জরুরি হয়ে উঠেছে।
বিশিষ্ট কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবীর বলেন, বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশকে এমন কূটনৈতিক অবস্থান নিতে হবে, যাতে কোনো আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বে দেশ জড়িয়ে না পড়ে এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বজায় থাকে।
প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, বিএনপির সামনে যেমন বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি রয়েছে বড় সম্ভাবনাও। নির্বাচনে বড় জয় এবং দেশে ফেরার পর জনসমর্থনের যে চিত্র দেখা গেছে, তা নতুন সরকারের জন্য শক্তিশালী রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে কাজ করতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, বিপুল জনসমর্থনকে কাজে লাগিয়ে তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকার কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে দেশের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের নতুন পথ রচনা করতে পারে।
(ঢাকাটাইমস/১৪ ফেব্রুয়ারি/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































