নারীর ভোট, নারীর নেতৃত্ব—কেন সংসদে কমছে নারীর উপস্থিতি?

উম্মুল ওয়ারা সুইটি
  প্রকাশিত : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬:৪৬
অ- অ+

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের উপস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রায়ই গর্ব করা হয়। রাষ্ট্র পরিচালনার শীর্ষপর্যায়ে দীর্ঘদিন নারী নেতৃত্ব থাকার ইতিহাস আমাদের আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো— এই প্রতীকী সাফল্য কি তৃণমূল ও সংসদীয় প্রতিনিধিত্বে প্রতিফলিত হয়েছে? ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬–এর ফলাফল বলছে, উত্তরটি সুখকর নয়।

২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে পরবর্তী পাঁচটি নির্বাচনের তুলনায় এবার সরাসরি নির্বাচনে জয়ী নারী সংসদ সদস্যের সংখ্যা সর্বনিম্ন— মাত্র সাতজন। মোট ২৯৯ আসনের বিপরীতে এই সংখ্যা ২.৩৪ শতাংশ। এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি রাজনৈতিক কাঠামোর গভীরে থাকা এক সংকেত।

১. সংখ্যার ভাষায় বাস্তবতা

এবারের নির্বাচনে প্রায় দুই হাজার প্রার্থীর মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র ৪ শতাংশের কিছু বেশি। অথচ বাংলাদেশে নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষের প্রায় সমান। ভোটের লাইনে নারীর উপস্থিতি দৃশ্যমান, কিন্তু প্রার্থী তালিকায় তারা অদৃশ্যপ্রায়।

২০০৮ সালে ১৯ জন নারী সরাসরি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০১৪ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে ২৩-এ পৌঁছায়। ২০১৮ সালে ২২ এবং ২০২৪ সালে ১৯ জন। কিন্তু ২০২৬ সালে নেমে এলো ৭-এ। এই পতন আকস্মিক নয়; এটি একটি ধারাবাহিক রাজনৈতিক অনীহার ফল।

জুলাই সনদে ৫ শতাংশ নারী মনোনয়নের অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু বড় কোনো দলই তা কার্যকর করেনি। এমনকি ৫১টি দলের মধ্যে ৩০টি দল একজনও নারী প্রার্থী দেয়নি। সংখ্যার এই সংকোচন দেখায়— নারীর অংশগ্রহণ দলগুলোর কাছে অগ্রাধিকার নয়।

২. পারিবারিক উত্তরাধিকার বনাম রাজনৈতিক সক্ষমতা

এবার নির্বাচিত সাত নারীর প্রায় সবাই রাজনৈতিক পরিবার থেকে উঠে আসা। কেউ সাবেক মন্ত্রীর কন্যা, কেউ প্রয়াত নেতার স্ত্রী, কেউ প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য। প্রশ্ন উঠতে পারে— তাহলে কি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া নারীর জয় অসম্ভব?

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতিতে প্রার্থী নির্বাচন এখনো ‘নিরাপদ বিনিয়োগ’-এর মতো বিবেচিত হয়। অর্থ, সংগঠন ও প্রভাব— এই তিনের সমন্বয় যাদের আছে, তারাই টিকিট পান। নারীদের বড় অংশ আর্থিকভাবে দুর্বল, সংগঠনগতভাবে সীমিত এবং নিরাপত্তাহীনতার মুখে থাকেন। ফলে দলগুলো ঝুঁকি নিতে চায় না।

এই প্রবণতা নারী নেতৃত্বকে ‘উত্তরাধিকারনির্ভর’ করে তুলছে, যা দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রের জন্য স্বাস্থ্যকর নয়।

৩. কাঠামোগত বাধা: অর্থ, পেশিশক্তি ও সাইবার বুলিং

রাজনীতিতে অর্থ ও পেশিশক্তির আধিপত্য নতুন নয়। কিন্তু নারীদের জন্য এটি দ্বিগুণ বাধা। নির্বাচনী প্রচারে বিপুল ব্যয়, কর্মী সংগঠিত করা, মাঠে সক্রিয় থাকা— সবকিছুতেই সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত প্রতিবন্ধকতা কাজ করে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাইবার বুলিং ও চরিত্রহননের রাজনীতি। নারী প্রার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হন বেশি। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক সময় লিঙ্গবিদ্বেষে রূপ নেয়। পরিবার ও সমাজের চাপও নারীদের নিরুৎসাহিত করে।

৪. দলীয় গণতন্ত্রের সংকট

দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র দুর্বল হলে নতুন নেতৃত্ব গড়ে ওঠে না। নারীদের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ, তৃণমূল থেকে নেতৃত্ব বিকাশের পরিকল্পনা—এসব প্রায় অনুপস্থিত। অনেক দল কাগজে-কলমে নারী উইং রাখলেও নীতি নির্ধারণী কমিটিতে নারীর অংশগ্রহণ সীমিত।

আরপিও অনুযায়ী ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্বের লক্ষ্য দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায়। কিন্তু বাস্তবে তা এগোয়নি। কোটাভিত্তিক সংরক্ষিত আসন থাকলেও সরাসরি নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ বাড়েনি। সংরক্ষিত আসন নারীর কণ্ঠস্বর আনে, কিন্তু সরাসরি নির্বাচনের রাজনৈতিক বৈধতা ভিন্ন।

৫. আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট ও তুলনা

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও নারী প্রতিনিধিত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে। তবে অনেক দেশে দলীয় কোটার বাধ্যবাধকতা কঠোরভাবে মানা হয়। নেপাল ও পাকিস্তানে দলীয় তালিকায় নির্দিষ্ট শতাংশ নারী রাখা বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশে সেই অঙ্গীকার থাকলেও প্রয়োগ দুর্বল।

৬. সমাধান কী

১. বাধ্যতামূলক মনোনয়ন কোটা: শুধু অঙ্গীকার নয়, আইনগতভাবে কার্যকর বাধ্যবাধকতা প্রয়োজন।

২. তৃণমূল নেতৃত্ব উন্নয়ন কর্মসূচি: স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত নারী নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা তৈরি।

৩. নিরাপত্তা ও সাইবার সুরক্ষা: নারী প্রার্থীদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা কাঠামো।

৪. রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা: অর্থের প্রভাব কমালে নারী অংশগ্রহণ বাড়তে পারে।

৫. দলীয় নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি।

বাংলাদেশে নারী ভোটার শক্তিশালী, কিন্তু নারী নেতৃত্ব দুর্বল। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন আমাদের সামনে একটি আয়না ধরেছে। শীর্ষ নেতৃত্বে নারী থাকলেই নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন সম্পূর্ণ হয় না। সংসদে, দলীয় কাঠামোয় এবং তৃণমূলে নারীর উপস্থিতি নিশ্চিত না হলে গণতন্ত্র অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।

নারী প্রতিনিধিত্বের এই সংকটকে সাময়িক ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি কাঠামোগত সংকট— যার সমাধানও কাঠামোগত হতে হবে। এখন প্রশ্ন একটাই: রাজনৈতিক দলগুলো কি এই সংকেত বুঝবে, নাকি নারীর প্রতিনিধিত্ব আরও সংকুচিত হবে আগামী নির্বাচনে?

লেখক: সাংবাদিক।

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
নালিতাবাড়ীতে গলায় বাদাম আটকে ৩ বছরের শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু
আগামীকাল থেকে বাধ্যতামূলক হচ্ছে বাংলা কিউআর
পতেঙ্গায় কোস্ট গার্ডের অভিযানে বিপুল বিদেশি মদ, বিয়ার ও সিগারেট জব্দ
ই-অরেঞ্জের প্রধান উপদেষ্টা মাসুকুর রহমান গ্রেপ্তার
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা