জাল টাকার জালে সাধারণ মানুষ            

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক
  প্রকাশিত : ১৬ মার্চ ২০২৬, ১৯:৩১
অ- অ+

রোজা, ঈদ, কোরবানি, পহেলা বৈশাখসহ বিভিন্ন উৎসব-পার্বণে বাজারে যেন নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়। নানা আয়োজনের সামগ্রী কেনাকাটা, নতুন পোশাক-পরিচ্ছদ, স্বজনদের জন্য উপহার কেনা- হাতে হাতে ঘুরে বেড়ায় হাজার হাজার কোটি টাকা। যদিও এখন লেনদেনে উল্লেখযোগ্য অংশ ডিজিটালে নিষ্পত্তি হচ্ছে, তবু দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এখনো নগদ লেনদেনে অভ্যস্ত। এই সুযোগটাই নেয় একটি অদৃশ্য চক্র। নগদ লেনদেনের ঢেউয়ের ভেতরে তারা ছড়িয়ে দেয় জাল নোট। সেই প্রতারণার শিকার রিকশাচালক, দিনমজুর, ছোট দোকানদার ফেরিওয়ালা এমনকি সাধারণ মানুষ। তাদের হাতে যেমন নেই নোট যাচাইয়ের যন্ত্র কিংবা সুবিধা, তেমনি ব্যস্ততার ভিড়ে একটু থেমে দেখার সুযোগও নেই।

আপনি কি কখনো ভেবেছেন, সারাদিন পরিশ্রম করে হাতে পাওয়া টাকাটা আসল কি না? বেশির ভাগ মানুষ ভাবেন না। ভাবার কথাও নয়। কিন্তু এই না ভাবার সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছে অপরাধীরা

টাকা কখনোই শুধু কাগজের টুকরো নয়। এটি মানুষের ঘামঝরা পরিশ্রমের প্রতিফলন, রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক। যখন সেই টাকার সত্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে, তখন নড়বড়ে হয়ে ওঠে পুরো বাজারব্যবস্থা। জাল নোট সরাসরি আঘাত হানে না, বরং ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে অর্থনীতির ভেতরে বিষ ছড়ায়। এতে আসল টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, দ্রব্যমূল্য ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, আর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অজান্তেই বেড়ে যায়। এই চাপ সবার আগে অনুভব করেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ, আর তাদের ওপরই এর প্রভাব পড়ে সবচেয়ে তীব্রভাবে।

তবে এর ক্ষতি কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকে না। জাল নোটের বিস্তার বাজারে অস্থিরতা তৈরি করে, বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ফাটল ধরায়, ব্যাংকিং খাতে তারল্যের ওপর বাড়ায় চাপ। সরকারের রাজস্ব আদায় ব্যাহত হয়, উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নও হয়ে ওঠে কঠিন। অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থনীতিতে একটি টাকার প্রভাব অনেক সময় পাঁচ গুণ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। সেই হিসাবে জাল নোটের কারণে সৃষ্ট ক্ষতির পরিধি কতটা গভীর হতে পারে, একটু ভাবলেই তার ভয়াবহতা বোঝা যায়

বিভিন্ন সূত্রে অভিযোগ উঠেছে, প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার জাল নোট ইতিমধ্যে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কারণ টাকার স্বাভাবিক প্রবাহ একবার বিঘ্নিত হলে অর্থনীতিতে যে ধাক্কা লাগে, তা সামলে উঠতে অনেক সময় লেগে যায়। তাই এটি কেবল আর্থিক অপরাধের বিষয় নয়, এটি সরাসরি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত।

সাম্প্রতিক অভিযানে দেশের বিভিন্ন জেলায় বড় অঙ্কের জাল নোট, আধুনিক ছাপার যন্ত্র এবং ছোট আকারের গোপন কারখানার সন্ধান মিলেছে। এসব ঘটনা ইঙ্গিত দেয়, বিষয়টি কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। এর পেছনে কাজ করছে সুসংগঠিত একটি আন্তর্জাতিক চক্র। সীমান্তের ওপার থেকে এক লাখ টাকার জাল নোটের বান্ডেল মাত্র ৩৬ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। নোটগুলো এমন নিখুঁতভাবে তৈরি যে বিশেষজ্ঞের চোখ ছাড়া অনেক সময় আসল থেকে আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে

জাল নোট তৈরির জন্য মূলত দুটি কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রথম পদ্ধতিতে উন্নতমানের কাগজে কৃত্রিম সিকিউরিটি থ্রেড বসিয়ে স্ক্যানার ও প্রিন্টিং মেশিনের সাহায্যে বিভিন্ন মূল্যমানের নোট ছাপা হচ্ছে। বাইরে থেকে দেখলে এগুলো অনেকটাই আসল নোটের মতো মনে হয়। দ্বিতীয় পদ্ধতিটি আরও কৌশলী। এতে আসল নোটকে রাসায়নিক দ্রব্য দিয়ে ধুয়ে প্রায় সাদা করে ফেলা হয়, তারপর তার ওপর নতুন করে বেশি অঙ্কের মূল্যমান ছাপিয়ে দেওয়া হয়। ফলে একটি ১০০ টাকার নোট মুহূর্তেই হয়ে যায় ৫০০ টাকার নোট। কাগজটি আসল হওয়ায় সাধারণ মানুষের পক্ষে সেটি আলাদা করে ধরা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই অবৈধ ব্যবসা এখন সামাজিক মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফেসবুক, টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ্যেই জাল নোট বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। সেখানে এক লাখ টাকার জাল নোট পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১০ থেকে ১৮ হাজার টাকায়। নতুন ক্রেতার আস্থা অর্জনের জন্য কেউ কেউ নমুনা নোট পাঠাচ্ছে, এমনকি মানি ব্যাক গ্যারান্টির কথাও বলছে। এই দৃশ্য দেখলেই বোঝা যায়, আইনের ভয় এদের কাছে কতটা সামান্য

এটিএম বুথও এখন নিরাপদ নয়। বেশ কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে, এটিএম থেকে টাকা তোলার পর গ্রাহক জাল নোট পেয়েছেন। ব্যাংকে টাকা জমা দিতে গিয়ে বিপদে পড়েছেন। কারণ যার কাছে জাল নোট পাওয়া যাবে, আইনের চোখে সে-ই অপরাধী। বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, কোনো ব্যাংক যদি জাল নোট গ্রহণ করে, সেই ব্যাংকের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে

তাহলে আসল নোট চিনবেন কীভাবে? নোটটি আলোর বিপরীতে ধরুন। বাঘের মাথা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মনোগ্রামের জলছাপ স্পষ্ট দেখা যাওয়ার কথা। নকল নোটে এই জলছাপ অস্পষ্ট ও নিম্নমানের হয়। এরপর নোটটি আঙুলে স্পর্শ করুন। আসল নোটের কালি খসখসে অনুভূত হয়, নকলে সেই অনুভূতি নেই, মসৃণ ও পিচ্ছিল লাগে। টাকার অঙ্কের ওপর সরাসরি তাকালে লালচে রং দেখা যাবে, তির্যকভাবে তাকালে সবুজ বা সোনালি হয়ে যাবে। নকল নোটে এই রং পরিবর্তন হয় না। ১০০, ২০০ ও ৫০০ টাকার নোটের বাঁ পাশে নিরাপত্তা সুতা আছে, যা নাড়াচাড়া করলে হলোগ্রাফিক চকচকে ভাব দেখা যায়। জাল নোটে সেই চকচকে ভাব থাকে না

দেশজুড়ে এমন অসংখ্য মানুষ আছেন যারা বছরের পর বছর জমানো সঞ্চয় নিয়ে ব্যাংকে গিয়ে জেনেছেন পুরোটাই নকল। মেয়ের বিয়ের জন্য রাখা টাকা, ছেলের পড়াশোনার স্বপ্ন, চিকিৎসার জন্য জমানো কষ্টার্জিত অর্থ, এক মুহূর্তে সব ধুলোয় মিশে গেছে। এই বেদনার দায় কেবল অপরাধীদের নয়, যারা আইন প্রয়োগে গড়িমসি করেন তাদেরও। দণ্ডবিধির ২৩২ থেকে ২৫৪ ধারায় জাল নোট তৈরি ও ব্যবহারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত শাস্তির বিধান আছে। কিন্তু ছোট বাহক ধরলেই সমস্যা মিটবে না। যারা এই নেটওয়ার্কের মূল কারিগর, যারা অর্থায়ন করছে, যারা সীমান্ত পার করাচ্ছে, তাদের জালে না আনলে এই অপরাধ কখনো থামবে না।

ভারত ২০১৬ সালে ডিমনিটাইজেশনের মতো চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিল শুধু জাল নোটের কারণে। রাতারাতি ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট বাতিল হয়ে গিয়েছিল। সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছিলেন, কিন্তু জাল নোটের প্রচলন অনেকটাই কমেছিল। বাংলাদেশ কি সেই কঠিন পথে যেতে চায়, নাকি এখনো সময় আছে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার?

দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সামনেই আছে। ডিজিটাল লেনদেন। মোবাইল ব্যাংকিং, কার্ড পেমেন্ট, ডিজিটাল ওয়ালেটে জাল টাকার কোনো জায়গাই নেই। তরুণ প্রজন্ম এই পথে ইতিমধ্যে হাঁটছে। এখন দরকার গ্রামাঞ্চলে, প্রত্যন্ত এলাকায় এবং বয়স্ক মানুষদের কাছেও এই সুবিধা পৌঁছে দেওয়া। নগদ নির্ভরতা যত কমবে, অপরাধচক্রের শক্তি তত কমবে। বৈশ্বিকভাবেও এই প্রবণতা স্পষ্ট। কাউন্টারফিট মানি ডিটেকশন মার্কেট ২০২৩ সালে ৩.৫৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং ২০৩২ সাল নাগাদ ৫.৪৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস আছে। পৃথিবীর প্রতিটি দেশ এই সমস্যার বিরুদ্ধে প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে

এই লড়াই শুধু সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একার নয়, প্রতিটি নাগরিকেরও। কোনো নোট নিয়ে সন্দেহ হলে সেটি নিজের কাছে রাখবেন না, আবার অন্য কারও হাতেও তুলে দেবেন না। বরং দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানান। সামাজিক মাধ্যমে যদি কোথাও জাল নোট বিক্রির বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে, সেটিও রিপোর্ট করুন। কারণ একটি জাল নোট যখন হাত বদল হয়ে আরেকজন নিরীহ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, তখন তার ক্ষতির ভারে আমাদের সামান্য হলেও অংশ থেকে যায়।

রোজার এই পবিত্র মাসের শেষ সময়ে কেনাকাটায় লেনদেন আরও বেশি হচ্ছে। সমাগত ঈদের এই আনন্দঘন মুহূর্তে একটি ছোট অনুরোধই যথেষ্ট। প্রতিটি লেনদেনে একটু সচেতন থাকুন। হাতে নোট নেওয়ার আগে একবার ভালো করে দেখুন, স্পর্শ করে অনুভব করুন। আপনার সেই কয়েক সেকেন্ডের সতর্কতাই হয়তো একটি পরিবারের বড় ক্ষতি ঠেকিয়ে দিতে পারে।

জাল টাকা প্রতিরোধ করা মানে শুধু অর্থ সুরক্ষা নয়। এটি মানুষের পরিশ্রমের মর্যাদা রক্ষা করা, রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা অটুট রাখা। এর মধ্যেই আছে আমাদের সন্তানদের জন্য একটি সৎ, নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য সমাজ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি। তাই জাল টাকা প্রতিরোধে দায়িত্ব আমাদের সবার

লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে মাঠে নামবে দুদক
দুই মামলায় জামিন পেলেন চিন্ময় কৃষ্ণ দাস, মুক্তি মিলছে না
উত্তরখানে যুবককে গুলি করে হত্যা, কারণ অজানা
কলাবাগানে স্ত্রী-শাশুড়িকে হত্যার অভিযোগে জামাতা গ্রেপ্তার
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা