লটারি বাতিল: আমরা কি শিশুদের শৈশব কেড়ে নিচ্ছি?

শিক্ষা ব্যবস্থায় আবারও এক বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে—স্কুলে ভর্তি হবে লটারিতে, নাকি পরীক্ষার মাধ্যমে? সরকার ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে লটারি পদ্ধতি বাতিল করে ভর্তি পরীক্ষায় ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। কিন্তু এই বিতর্কের গভীরে গেলে দেখা যায়, এটি শুধু একটি ভর্তি পদ্ধতির প্রশ্ন নয়—এটি আমাদের শিক্ষা দর্শন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে মৌলিক এক দ্বন্দ্ব।
শিশুদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে খুব ভেবে চিন্তেই নিতে হয়। আমরা কি চাই- সমতা (লটারি)
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কারণ দুই পক্ষের যুক্তিই শক্তিশালী—এবং দুই দিকেই রয়েছে বাস্তব ঝুঁকি।
লটারির পক্ষে যুক্তি: সমতার স্বপ্ন
লটারি পদ্ধতি চালুর পেছনে ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শন—সব শিশুর সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের বাস্তবতায়—আর্থিক বৈষম্য স্পষ্ট। শহর-গ্রামের শিক্ষার ব্যবধান বড়। এরমধ্যে কোচিং নির্ভরতা ব্যাপক।
এই প্রেক্ষাপটে লটারি ছিল একটি “লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড” তৈরি করার চেষ্টা।
মূলত, “ভর্তি পরীক্ষা আসলে সুবিধাপ্রাপ্তদের আরও সুবিধা দেয়।” কারণ পরীক্ষার আগে প্রস্তুতি লাগে, আর প্রস্তুতির জন্য লাগে টাকা। ফলে লটারি অনেকের কাছে ছিল ন্যায়বিচারের প্রতীক।পরীক্ষার পক্ষে যুক্তি: মেধার মূল্যায়ন
অন্যদিকে পরীক্ষার পক্ষে যারা, তারা বলছেন— “শিক্ষায় কোনো বাছাই না থাকলে মান ধরে রাখা কঠিন।”
তাদের যুক্তি—ভালো স্কুলে সীমিত আসন।
সবার জন্য সমান মানের শিক্ষা এখনও সম্ভব হয়নি
তাই কিছু বাছাই দরকার।পক্ষে বিপক্ষে মত যাই থাকুক - এটা তো ঠিক এখানে একটি বাস্তবতা আছে—বাংলাদেশে এখনও “স্কুল বৈষম্য” প্রবল। কিছু স্কুল অত্যন্ত ভালো, আর কিছু স্কুলের মান খুবই দুর্বল। ফলে অভিভাবকদের মধ্যে “ভালো স্কুলে ঢোকা” নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়।
কাজেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: শিশুরা কোথায়?
এই পুরো বিতর্কে সবচেয়ে কম আলোচিত বিষয়— শিশুর মানসিক ও মানসিক বিকাশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন সতর্ক করে বলেছেন— “প্রথম শ্রেণির শিশুকে পরীক্ষায় বসানো মানে তাকে অকালেই প্রতিযোগিতার যুদ্ধে ঠেলে দেওয়া।”মনোবিজ্ঞান বলছে—৫–৭ বছর বয়সে শিশুদের শেখা হওয়া উচিত খেলাধুলা ও আনন্দের মাধ্যমে
এই বয়সে ‘ফেল’ বা ‘পাস’ ধারণা তাদের আত্মবিশ্বাসে আঘাত করে।
দীর্ঘমেয়াদে এটি শিক্ষাভীতি তৈরি করতে পারে
অর্থাৎ, ভর্তি পরীক্ষা শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়—এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও তৈরি করে।কোচিং অর্থনীতি: অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী বাস্তবতা
বাংলাদেশে শিক্ষা শুধু শিক্ষা নয়—এটি একটি বড় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রও। ভর্তি পরীক্ষা চালু মানেই—কোচিং সেন্টারের প্রসার।গাইড বইয়ের বাজার। প্রাইভেট টিউশনের বিস্তার ঘটবে।
অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, এই খাত দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ফলে প্রশ্ন ওঠে—“আমরা কি শিক্ষাকে আরও বেশি বাজারনির্ভর করে ফেলছি?”বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত দেশে—
প্রাথমিক স্তরে ভর্তি হয় এলাকা ভিত্তিক বা সরাসরি
কোনো ভর্তি পরীক্ষা থাকে না
কারণ তারা বিশ্বাস করে— “শিক্ষার শুরুতে সমতা, পরে প্রতিযোগিতা।”
বাংলাদেশ কি সেই পথে হাঁটবে, নাকি উল্টো পথে যাবে—এটাই এখন মূল প্রশ্ন।এই বিতর্কের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উত্তর হতে পারে—
মধ্যপন্থা সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে।
প্রথম–পঞ্চম শ্রেণি: লটারি বা এলাকা ভিত্তিক ভর্তি
ষষ্ঠ–নবম শ্রেণি: সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা
কোচিং নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি।
সব স্কুলের মান সমান করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
কারণ সমস্যার মূল জায়গা ভর্তি পদ্ধতি নয়— স্কুলগুলোর মানের বৈষম্য।শেষ কথা: আমরা কী ধরনের সমাজ চাই?
এই প্রশ্নটি শুধু শিক্ষা নীতির নয়—এটি আমাদের সমাজের প্রতিচ্ছবি। আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই—যেখানে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই প্রতিযোগিতার চাপে বড় হয়?
নাকি যেখানে তারা সমান সুযোগ নিয়ে ধীরে ধীরে নিজেদের গড়ে তোলে?লটারি বা পরীক্ষা—কোনোটিই একক সমাধান নয়।
কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত— শিশুর স্বার্থই হওয়া উচিত সব সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে।
কারণ আজকের ভর্তি নীতি ঠিক করবে—আগামী দিনের নাগরিক কেমন হবে।
(ঢাকাটাইমস/১৭ মার্চ/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































