জ্বালানি করিডোরে উত্তেজনা: বিশ্ব অর্থনীতির সামনে নতুন ঝুঁকি

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে দ্রুত তীব্রতর হয়ে ওঠা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আবারও বিশ্ব জ্বালানি ব্যবস্থাকে অনিশ্চয়তার কিনারায় ঠেলে দিয়েছে। শুরুতে আঞ্চলিক সামরিক সংঘাত হিসেবে দেখা দিলেও এখন এই উত্তেজনার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বৈশ্বিক আর্থিক বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ এবং জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর। এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এক সরু সামুদ্রিক করিডোর—Strait of Hormuz—যার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব তার ভৌগোলিক আকারের তুলনায় অসীমভাবে বেশি।
পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই প্রণালিটি পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হিসেবে পরিচিত। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এই পথ দিয়ে বিশ্ববাজারে পৌঁছে—যা বৈশ্বিক তেল ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশ। একই সঙ্গে বিশ্বের মোট ২০ থেকে ২২ শতাংশ এলএনজি রপ্তানিও এই করিডোর দিয়ে পরিবাহিত হয়, যার বড় অংশ আসে Qatar থেকে এবং যার প্রধান গন্তব্য এশিয়ার জ্বালানি-নির্ভর অর্থনীতিগুলো।
এই বিপুল জ্বালানি প্রবাহের কারণেই হরমুজ প্রণালিতে সামান্য অস্থিরতাও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক অভিঘাত সৃষ্টি করে। জ্বালানি আমদানিনির্ভর এশীয় অর্থনীতির জন্য এটি কেবল একটি সামুদ্রিক পথ নয়; বরং শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থার এক অপরিহার্য জীবনরেখা।
সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বাজারে ইতোমধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং সম্ভাব্য রপ্তানি বাধার কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের কিছু উৎপাদক উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যদি সংঘাত আরও বিস্তৃত হয় বা হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১৫০ থেকে ২০০ ডলার প্রতি ব্যারেল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এমন মূল্যবৃদ্ধি আধুনিক অর্থনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় জ্বালানি ধাক্কায় পরিণত হতে পারে।
ইতোমধ্যে বৈশ্বিক বাজারে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম সাম্প্রতিক সময়ে ৯৫ থেকে ১০০ ডলারের কাছাকাছি ওঠানামা করছে, কারণ বাজারে সম্ভাব্য সরবরাহ ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এদিকে এশিয়ার কিছু বড় রিফাইনারি মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে চীনের কয়েকটি বৃহৎ তেল শোধনাগার সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ১০ শতাংশের বেশি ক্রুড প্রসেসিং কমিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতি বিশ্ব জ্বালানি ব্যবস্থার একটি মৌলিক দুর্বলতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে—গত কয়েক দশকে জ্বালানি উৎস কিছুটা বৈচিত্র্যময় হলেও এর পরিবহন শৃঙ্খল এখনও কয়েকটি সংকীর্ণ ভৌগোলিক পথের ওপর নির্ভরশীল।
এই নির্ভরতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ এশিয়া। হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই শেষ পর্যন্ত এশীয় বাজারে পৌঁছে। China, India, Japan এবং South Korea—এই চারটি অর্থনীতি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। ফলে এই করিডোরে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে শুধু জ্বালানি নয়, বৈশ্বিক শিল্প উৎপাদন, পরিবহন খরচ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলেও ব্যাপক প্রভাব পড়বে।
তেলের পাশাপাশি এলএনজির ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি একই রকম সংবেদনশীল। ২০২৫ সালে আনুমানিক ১১২ বিলিয়ন ঘনমিটার এলএনজি হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে, যা বিশ্ব এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এই প্রবাহ ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক গ্যাস বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে এবং জ্বালানি মূল্যস্ফীতি নতুন করে বাড়তে পারে।
এই বৈশ্বিক অস্থিরতার ঢেউ থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। ভৌগোলিকভাবে দূরে থাকলেও বাংলাদেশের অর্থনীতি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বাজার ও বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
প্রথমত, বাংলাদেশ এখনও জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি এবং এলএনজির একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে তা সরাসরি দেশের আমদানি ব্যয় বাড়ায়, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি করে এবং শেষ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়।
দ্বিতীয়ত, উপসাগরীয় অঞ্চল বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। Saudi Arabia, United Arab Emirates, Kuwait, Bahrain এবং Qatar—এই দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে। জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়লে বা বীমা ব্যয় বেড়ে গেলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, কৃষিপণ্য এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তৃতীয়ত, এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স। উপসাগরীয় অঞ্চলে কয়েক মিলিয়ন বাংলাদেশি কর্মরত আছেন এবং তাদের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। যদি সংঘাতের কারণে এই দেশগুলোর অর্থনীতি ধীরগতির হয়, নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ কমে যায়, তাহলে শ্রমবাজার সংকুচিত হতে পারে এবং বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহেও চাপ তৈরি হতে পারে।
হরমুজ সংকট বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ভঙ্গুরতাও স্পষ্ট করে তুলছে। ইতোমধ্যে ট্যাংকার ও কার্গো জাহাজের বীমা প্রিমিয়াম বেড়েছে। কিছু শিপিং কোম্পানি বিকল্প পথ হিসেবে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে যাওয়ার পরিকল্পনা বিবেচনা করছে, যদিও এতে সময় ও খরচ উভয়ই বহুগুণ বাড়বে। তাছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিকল্প পাইপলাইন দিয়ে মাত্র ৩ থেকে ৩.৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল প্রতিদিন পরিবহন করা সম্ভব, যা হরমুজের স্বাভাবিক প্রবাহের তুলনায় অনেক কম।
এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় হরমুজ প্রণালির কার্যকর বিকল্প প্রায় নেই।
এই পরিস্থিতিতে বড় শক্তিগুলো সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় কৌশলগত তেলের মজুত ব্যবহার, বিকল্প উৎপাদন বাড়ানো এবং জ্বালানি সরবরাহ বৈচিত্র্যকরণের মতো পদক্ষেপ বিবেচনা করছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—জ্বালানি নিরাপত্তা ছাড়া অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের জন্যও এই সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্যকরণ, নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ, আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা জোরদার করা এবং নতুন রপ্তানি বাজার অনুসন্ধান—এই বিষয়গুলো এখন আর কেবল নীতিগত বিকল্প নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অপরিহার্য শর্ত।
ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে যে জ্বালানি পথ যখন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়, তখন তার অভিঘাত সীমান্ত পেরিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দেয়। হরমুজ প্রণালি সেই বাস্তবতারই প্রতীক—ভৌগোলিকভাবে ছোট হলেও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য এর গুরুত্ব অসীম।
আজ মধ্যপ্রাচ্যে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা হয়তো হাজার মাইল দূরে ঘটছে। কিন্তু এর অর্থনৈতিক ঢেউ খুব শিগগিরই ঢাকা বন্দরের কন্টেইনার টার্মিনাল, শিল্প কারখানা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচে এসে আঘাত করতে পারে।লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































