দেশে হাম পরিস্থিতি
প্রতিরোধযোগ্য রোগে শত শত শিশুমৃত্যুর দায় কার!

বাংলাদেশ বহু বছর ধরেই দক্ষিণ এশিয়ায় টিকাদান কর্মসূচির একটি সফল উদাহরণ হিসেবে পরিচিত ছিল। গ্রামগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও শিশুদের হাতে টিকার দাগ ছিল রাষ্ট্রের সাফল্যের প্রতীক। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের ইপিআই কর্মসূচিকে বহুবার প্রশংসা করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক হাম (মিজেলস) পরিস্থিতি সেই সাফল্যের বর্ণিল ছবিতে বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ১৫ মার্চ থেকে ৩ মে পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ২৯৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা ৫ হাজারের বেশি এবং উপসর্গসহ আক্রান্ত হয়েছে ৪০ হাজারের বেশি শিশু। সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়; এগুলো শত শত পরিবারের কান্না, অসহায় বাবা-মায়ের দীর্ঘশ্বাস এবং রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতার নির্মম প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশে অতীতে কলেরা, ডেঙ্গু, করোনা কিংবা চিকুনগুনিয়ার মতো সংক্রামক রোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু হামের মতো পুরোনো ও প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ আবার ভয়াবহ আকারে ফিরে আসবে- এমন আশঙ্কা সাধারণ মানুষের মধ্যে খুব একটা ছিল না। কারণ হাম এমন একটি রোগ, যার কার্যকর টিকা বহু আগেই আবিষ্কৃত হয়েছে এবং যা নিয়মিত টিকাদানের মাধ্যমে প্রায় নিয়ন্ত্রণে এনে ফেলেছিল অনেক দেশ। কিন্তু বাংলাদেশে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখিয়ে দিল, জনস্বাস্থ্য কখনো স্থায়ী সাফল্যের গল্প নয়; এখানে সামান্য শৈথিল্যও বড় বিপর্যয়ের জন্ম দিতে পারে।
এই সংকটের দায় এককভাবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপানো কঠিন। তবে দায় এড়ানোরও সুযোগ নেই। কারণ রাষ্ট্র যখন নাগরিকের জীবন রক্ষার দায়িত্ব নেয়, তখন জনস্বাস্থ্যের ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রশ্নই সামনে নিয়ে আসে। সরকারের দায়িত্ব শুধু টিকা সংগ্রহ বা হাসপাতাল নির্মাণ নয়; দায়িত্ব হলো প্রতিটি শিশুর কাছে নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, প্রতিটি পরিবারকে সচেতন করা এবং প্রতিটি সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। হাম পরিস্থিতি নিয়ে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- এই অবস্থার সৃষ্টি হলো কেন? কেন এমন একটি রোগ, যা টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব, সেটি এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল? কেন শত শত শিশুর মৃত্যু ঠেকানো গেল না? কেন আক্রান্তের সংখ্যা এত দ্রুত বেড়ে গেল?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, প্রশাসনিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার, সামাজিক বাস্তবতা এবং রাষ্ট্রীয় সমন্বয়ের ঘাটতি- সবকিছুই সামনে চলে আসে। বাংলাদেশের ইপিআই কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরেই উন্নয়ন সাফল্যের অন্যতম প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। রাজনৈতিক বক্তৃতা থেকে আন্তর্জাতিক সম্মেলন- সবখানেই এই সাফল্যের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, টিকাদান কর্মসূচির কাঠামোর ভেতরে বহুদিন ধরেই কিছু দুর্বলতা জমা হচ্ছিল, যা এবার হাম পরিস্থিতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
গত আওয়ামী লীগ সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জনস্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ ও নজরের ঘাটতি ছিল। বিশেষ করে হামের মতো টিকাদান কর্মসূচি ও টিকা সংগ্রহে অবহেলা করা হয়েছে।
একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কেবল বড় বড় হাসপাতাল বা আধুনিক যন্ত্রপাতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; এর মূল ভিত্তি হলো স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। সেই জায়গাটিই বাংলাদেশে সবচেয়ে দুর্বল। যেকোনো সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত শনাক্তকরণ এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া। কিন্তু হাম পরিস্থিতিতে দেখা গেছে, আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার পরও দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকর জরুরি ব্যবস্থা দৃশ্যমান ছিল না।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছিলেন যে, দেশে টিকাদানের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে এবং হামের ঝুঁকি বাড়ছে। কিন্তু সেই সতর্কবার্তাগুলো বিগত সরকারগুলোর নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, সেটি এখন বড় প্রশ্ন।
অনেক এলাকায় আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করা যায়নি। কোথাও কোথাও পরিবারগুলো প্রথমে স্থানীয় ওঝা, কবিরাজ বা অপ্রশিক্ষিত চিকিৎসকের কাছে গেছে। আবার অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত পরীক্ষা বা চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না। ফলে রোগ ছড়ানোর সুযোগ আরও বেড়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আসলে কতটা প্রস্তুত ছিল? ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক কিংবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো কি যথেষ্ট জনবল, ওষুধ ও প্রশিক্ষণ পেয়েছিল? বাস্তবতা বলছে, দেশের অধিকাংশ প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র এখনো জনবল সংকটে ভুগছে। চিকিৎসক নেই, নার্স কম, ল্যাব সুবিধা সীমিত, ওষুধের ঘাটতি রয়েছে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো তথ্য ব্যবস্থাপনা। বাংলাদেশে এখনো অনেক স্বাস্থ্যতথ্য হাতে লিখে সংরক্ষণ করা হয়। ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর নয়। ফলে কোথায় কতজন আক্রান্ত হচ্ছে, কোন এলাকায় ঝুঁকি বাড়ছে, কোথায় জরুরি টিকা দরকার—এসব তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্তে ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে। জনস্বাস্থ্য সংকটে সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। কিন্তু তথ্যপ্রবাহ ধীর হলে সিদ্ধান্তও ধীর হয়ে যায়।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক আলোচনায় অবকাঠামো উন্নয়ন বড় জায়গা পায়। সেতু, এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র- এসব দৃশ্যমান উন্নয়ন জনগণের সামনে সহজে তুলে ধরা যায়। কিন্তু জনস্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান। ফলে রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে স্বাস্থ্য অনেক সময় পিছিয়ে পড়ে।
স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। এখানে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভ কম। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত সক্ষমতা বোঝা যায় সংকটের সময়। হাম পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে, বাহ্যিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানবসম্পদ ও স্বাস্থ্যনিরাপত্তায় বিনিয়োগ না করলে উন্নয়ন টেকসই হয় না।
স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বহু বছর ধরে জমে থাকা সংকট এখন প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে। হাম প্রতিরোধে টিকা সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। হাম প্রতিরোধে পূর্ণ টিকাদান জরুরি। এ বিষয়ে জনসচেতনতার পাশাপাশি তথ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রচারণাও জরুরি।
হাম শুধু একটি ভাইরাসজনিত রোগ নয়; এটি সামাজিক বৈষম্যেরও প্রতিচ্ছবি। যে শিশু অপুষ্টিতে ভোগে, যে পরিবার স্বাস্থ্যসেবার নাগাল পায় না, যে এলাকায় চিকিৎসক নেই- সেই শিশুর ঝুঁকি বেশি। ফলে হাম পরিস্থিতি আমাদের সমাজের গভীর বৈষম্যও সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশে শিশু অপুষ্টির হার এখনো উদ্বেগজনক।
সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো এখনো অনেকাংশে কেন্দ্রনির্ভর। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা সীমিত। কিন্তু জনস্বাস্থ্য সংকটে স্থানীয় উদ্যোগই সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে। কোন এলাকায় টিকাদান কম, কোথায় আক্রান্ত বাড়ছে, কোথায় জরুরি ক্যাম্প দরকার- এসব তথ্য স্থানীয় প্রশাসন সবচেয়ে ভালো জানে। অথচ বাস্তবে তাদের অনেক সময় পর্যাপ্ত ক্ষমতা বা সম্পদ দেওয়া হয় না।
কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে একসময় গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার বড় ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু অনেক ক্লিনিকে জনবল সংকট, ওষুধের ঘাটতি এবং তদারকির দুর্বলতা রয়েছে। ফলে সেগুলো প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারছে না।
হাম পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে, স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী না করলে জাতীয় পর্যায়ের পরিকল্পনাও কার্যকর হয় না। একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিশুদের ওপর। অথচ বাংলাদেশে শিশুস্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা অনেক সময় সীমিত পরিসরে আটকে থাকে। বাজেট, রাজনৈতিক বিতর্ক বা উন্নয়ন পরিকল্পনায় শিশুস্বাস্থ্য সব সময় অগ্রাধিকার পায় না।
শিশুদের টিকাদান, পুষ্টি, নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা এবং সচেতনতা- এসব বিষয়কে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ করতে হবে। শুধু সংকটের সময় জরুরি ক্যাম্পেইন চালালেই হবে না। প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা এবং মাঠপর্যায়ে ধারাবাহিক কার্যক্রম।
(ঢাকাটাইমস/১২মে/মোআ)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































