দাগ রেখে গেলাম

কিছুক্ষণ আগে ঢাকা শহরে আমার সবচেয়ে প্রিয় বাসভবন অর্থাৎ ইস্কাটন গার্ডেন সরকারি অফিসার্স কোয়ার্টারসের 'অপরাজিতা' ভবনের সামনে গিয়েছিলাম। দেখলাম আমার উদ্যোগে রোপণ করা জ্যাকারান্ডা (নীল কৃষ্ণচূড়া) চারাটি দুর্বার গতিতে নীল আকাশ স্পর্শ করায় সচেষ্ট। দেখে ভালোই লাগলো। ২০১৯ সালের ২৪ জুন ইস্কাটন গার্ডেন সরকারি অফিসার্স কোয়ার্টারসে বসবাস শুরু করেছিলাম চামেলি-২ নং ফ্ল্যাটে। ঢাকা শহরে এমন সবুজের সমারোহ পেয়ে খুবই আনন্দিত হয়েছিলাম। ইস্কাটন এলাকার আভিজাত্যের সাথে পরিচয় বহুদিন আগে থেকেই। মনে আছে সেই ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে আমার মেজোবোনের জন্য ভাড়া বাসা খুঁজতে গিয়ে এক বাড়িওয়ালাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম- "ভাড়া এত বেশি চাচ্ছেন কেন?" জবাবে উনি বললেন, "আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবকে বলবেন, ইস্কাটন এলাকায় থাকেন- এটার একটা প্রেস্টিজ ভ্যালু আছে নাহ্?" সেই থেকে ইস্কাটনের আভিজাত্যের সাথে পরিচয়!
সেই অভিজাত ইস্কাটন গার্ডেন এলাকায় বসবাস করতে এসে দেখলাম- আসলেই অভিজাত। বেশির ভাগ বাসিন্দা গাড়িতে চলাচল করেন বলে রিকশা বা সিএনজি অটোরিকশা চালকরা তেমন চিনেন না। এত বড় প্রশস্ত রোডে বাসা হওয়া সত্ত্বেও মেহমানদেরকে বাসার লোকেশন বোঝাতে মিনিট পাঁচেকের লেকচার দিতে হয়। সমস্যা আরও জটিল হয়ে গেল একই নামে দুটো সরকারি অফিসার্স কোয়ার্টারস, মাঝখান দিয়ে খুবই প্রশস্ত রাস্তা। এক কলোনির আবার দুই দিকেই একাধিক গেইট। এমনকি ছোট আয়তনের কলোনিতেও দুটো গেইট। কোনো গেইটেরই নাম্বার না থাকায় রিকশা/ সিএনজি, এমনকি গাড়িতে আগত মেহমানরা বাসা খুঁজে পেতে খুবই সমস্যায় পড়তেন। এছাড়াও দুটো রাস্তাই ইস্কাটন গার্ডেন রোড নামে পরিচিত; যদিও দক্ষিণ পাশের রোডের নাম অফিসিয়াল নাম ওল্ড এলিফ্যান্ট রোড। কিন্তু সেই নামে কেউ চিনে না।
এমতাবস্থায়, কলোনির হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ অথবা মেসেঞ্জার গ্রুপে খুব জোরালোভাবে গেইটগুলোর ক্রমিক নাম্বার প্রদানের জন্য আবেদন জানালাম। অ্যাসোসিয়েশনের তৎকালীন নেতৃবৃন্দ এক পর্যায়ে গেইটের নাম্বার দিলেন। এর ফলে সমস্যা অনেকটাই দূর হলো। তবে গেইট নাম্বার দেয়ার সময় ১ নাম্বার গেইটের পরে ২ নং না দিয়ে ৩ নং দিয়ে তারপর আবার ২ নং কেন দেয়া হয়েছিল তা বলা কঠিন। বর্তমানে বন্ধ গেইটটার নাম্বার হচ্ছে ৩। এটাকে নাম্বারিং থেকে একেবারে বাদও দেয়া যেত। যা-ই হোক, যা হয়ে গিয়েছে সেটাই চলছে এবং মোটামুটি ভালোমতোই চলছে। আইনের ভাষায় এটাকেই বোধ হয় বলে 'ফ্যাক্টাম ভ্যালেট'!
এরপর আছে একটা মজার বিষয়। গেইট নাম্বার দেয়ার ফলে বাসা চিহ্নিতকরণ ও পথনির্দেশ বেশ সহজ হলেও সমস্যা কিছুটা থেকেই যায়। উত্তর পাশের কলোনিটা দক্ষিণ পাশের কলোনির চেয়ে সাইজে, ভবন ও ফ্ল্যাটের সংখ্যার দিক থেকে ছোট। কিন্তু 'ছোট কলোনি' বলা আবার ভালো দেখায় না, বাসিন্দাদের জন্য সম্মানজনক নয়। খেয়াল করে দেখলাম- উত্তর পাশের কলোনির সব ভবনের নামের শেষে 'লি' আছে- সোনালি, রূপালি, বর্ণালি, চামেলি, শেফালি, দীপালি, কাকলি, চৈতালি ইত্যাদি ১১টা নাম সম্ভবত। দুই কলোনি ছুঁয়ে যাওয়া দুটো রোডই ইস্কাটন গার্ডেন রোড নামে পরিচিত হওয়ায় পরিচিতির সুবিধার জন্য অনেকে উত্তর পাশের কলোনি সংলগ্ন হলি ফ্যামিলি হাসপাতালকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে সেই রোডকে হলি ফ্যামিলি গলিও বলে থাকে। এ প্রেক্ষাপট একদিন গ্রুপে মজা করে লিখলাম- ১১টা নিজস্ব 'লি' (সোনালি, রূপালি, কাকলি, চামেলি ইত্যাদি)-এর সাথে কাছাকাছি হলি ফ্যামিলি গলি; অর্থাৎ মোট ১৪টি 'লি'- এর এলাকা বলে উত্তর পাশের কলোনিকে ইস্কাটন গার্ডেন অফিসার্স কোয়ার্টারসের 'লি-জোন' বলা যেতে পারে।
ও মা! এরপর দেখি অনেকেই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে উত্তর পাশের কলোনিকে বোঝাতে 'লি-জোন' লিখে। এ সংক্রান্তে সবচেয়ে বেশি মজা পেয়েছিলাম ইস্কাটন গার্ডেন অফিসার্স কোয়ার্টারসের বাসা ছেড়ে দেয়ার সময় বাসাগুলোর কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ পিডব্লিউডির জনৈক ইঞ্জিনিয়ার যখন উত্তর পাশের কলোনিকে বোঝাতে 'লি-জোন' শব্দটা ব্যবহার করলেন!
২০২১ সালের মাঝামাঝি চামেলি-২ থেকে অপরাজিতা-৪০২-এ স্থানান্তরিত হয়েছিলাম। নিজের গ্রামের বাড়ি ছাড়া সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের বসবাসের এলাকা ছেড়ে গত ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ সরকারি বাসার তুলনায় বেশ ছোট একটা প্রাইভেট ভাড়া বাসায় ওঠেছি। চমৎকার ছিল ইস্কাটন গার্ডেন সরকারি অফিসার্স কোয়ার্টারসে বসবাসের অভিজ্ঞতা; বিশেষ করে অপরাজিতা ৪০২ ফ্ল্যাট ছিল অসাধারণ। সবসময়ই আলো-বাতাসের খেলা আর বৃষ্টি হলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টির সৌন্দর্য উপভোগ আর ছাদে গিয়ে সপরিবারে বৃষ্টিবিলাস! প্রায় বারোমাস ১নং গেইটে বাগানবিলাসের বর্ণিল উপস্থিতি। সবকিছু মিলিয়ে দারুণ এক বসবাস ছিল। সেই মুগ্ধতা আর ভালোলাগার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে অপরাজিতা ভবনের সামনে নিজের সুপার প্রিয় কিছু বৃক্ষও রোপণ করে এসেছি। দুটো জ্যাকারান্ডা (নীল কৃষ্ণচূড়া) যখন রোপণ করি তখন একটাও পাতা ছিল না। বর্ণিল বসন্তে পল্লবিত সে চারাগাছ বর্ষায় ধুয়েমুছে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে এক্কেবারে পরিপাটি। একদিন পুস্পিতও হবে ইনশাআল্লাহ।
কোনো এক মনীষী বলেছিলেন, "এই ধরাধামে এসেছিস যখন দাগ রেখে যা।" ইস্কাটন গার্ডেন সরকারি অফিসার্স কোয়ার্টারসের 'গেইট নাম্বার', উত্তর পাশের কলোনির 'লি-জোন' নাম আর নীল গগন স্পর্শকামী নীল কৃষ্ণচূড়া বোধ হয় আমার সেই দাগ হিসেবেই থেকে গেল।
সেই ছোটবেলায় হরলাল রায়ের লেখা রচনা বইয়ে পড়া দুটো লাইনও মনে পড়ছে-
"তোমার খাতার প্রথম পাতায় এঁকে দিলাম আল্পনা-
আমার ছবি কইবে কথা যখন আমি থাকব না।"
স্বাভাবিক সময়ের প্রায় পাঁচ বছর পূর্বে সরকারি অফিসার্স কোয়ার্টারস ছেড়ে দিলেও আমার রোপণ করা নীল কৃষ্ণচূড়া একদিন আমার কথা কইবে- এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
ইস্কাটন গার্ডেন সরকারি অফিসার্স কোয়ার্টারসের সকল বাসিন্দার জন্য অসীম শুভকামনা। পরম করুণাময়ের অপার করুণা তাঁদের সকলের উপর অবিরাম ধারায় বর্ষিত হোক।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন










































