ফার্মের মুরগি খাওয়া কি ঝুঁকিপূর্ণ? যা বলছে গবেষণা

বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবারের কাছে ফার্মের বা ব্রয়লার মুরগি এখন বিলাসী খাবার নয়; এটি দৈনন্দিন আমিষের অন্যতম প্রধান উৎস। গরু ও খাসির মাংসের তুলনায় কম দাম, সহজলভ্যতা এবং দ্রুত রান্নার সুবিধার কারণে বাজারে এর চাহিদা ব্যাপক। ব্রয়লার মুরগি নিয়ে নানা ধরনের প্রচলিত ধারণা থাকলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি নিজে ক্ষতিকর নয়। বরং নিরাপদ উৎপাদন, সঠিক সংরক্ষণ ও স্বাস্থ্যসম্মতভাবে রান্না করা হলে ব্রয়লার মুরগি উচ্চমানের প্রোটিন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টির অন্যতম উৎস হতে পারে।
ব্রয়লার মুরগি নিজে কোনোভাবেই ক্ষতিকর নয়। এতে উচ্চমানের প্রোটিনের পাশাপাশি ভিটামিন বি-১২, ভিটামিন বি-৬, নিয়াসিন (ভিটামিন বি-৩), ফসফরাস, সেলেনিয়াম ও জিংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান রয়েছে।
তবে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে—ফার্মের মুরগি কি আসলেই নিরাপদ?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় ব্রয়লার মুরগিকে ‘বিষাক্ত’, ‘হরমোন দেওয়া’ কিংবা বিভিন্ন রোগের কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। আবার খামার সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ দাবি করেন, এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ। তবে বিভিন্ন গবেষণার ফল বলছে, এই দুই চরম অবস্থানের কোনোটিই পুরোপুরি সঠিক নয়।
গবেষকদের মতে, ব্রয়লার মুরগি নিজে কোনো বিষাক্ত খাবার নয়। তবে খামারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পদ্ধতি, ওষুধ প্রয়োগের পর নির্ধারিত সময় না মানা, খাদ্যের মান, জবাইয়ের পরিবেশ এবং সংরক্ষণব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে মাংসের নিরাপত্তা।
২০২৬ সালের ৪ এপ্রিল প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় বাংলাদেশ, ভারত ও ভিয়েতনাম থেকে সংগ্রহ করা ৫৫৮টি মুরগির বুকের মাংস পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় ৬৯ ধরনের পশুচিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়।
এর মধ্যে বাংলাদেশের নমুনা ছিল ২৭৩টি। এসব নমুনা ৯৯টি খামার ও ৫০টি বাজার বা বিক্রয়কেন্দ্র থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল।
গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের ৪০টি নমুনায় অর্থাৎ ১৪ দশমিক ৭ শতাংশে অন্তত একটি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের পরিমাণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত সর্বোচ্চ অবশিষ্টাংশ সীমা (MRL) অতিক্রম করেছে।
এর মধ্যে নয়টি নমুনায় কোনো কোনো ওষুধের মাত্রা নির্ধারিত সীমার ১০ গুণেরও বেশি ছিল।
তিন দেশের মোট ৫৫৮টি নমুনার মধ্যে ১১ দশমিক ৬ শতাংশ নমুনা নির্ধারিত মান পূরণ করেনি। উৎপাদন পর্যায়ের নমুনায় অনিয়মের হার ছিল বেশি।
তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, কোনো মাংসে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পাওয়া মানেই সেটি বিষাক্ত বা খাওয়ার অযোগ্য—এমন সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
খাদ্যে কোনো ওষুধের অবশিষ্টাংশ কতটুকু গ্রহণযোগ্য থাকবে, তার একটি বৈজ্ঞানিক সীমা নির্ধারণ করা থাকে। এটিই সর্বোচ্চ অবশিষ্টাংশ সীমা বা MRL।
কোনো নমুনায় অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া গেলে প্রথমে দেখতে হয়—কোন ওষুধ পাওয়া গেছে, কত পরিমাণে পাওয়া গেছে এবং তা নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে কি না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর বড় কারণ হতে পারে ‘উইথড্রয়াল পিরিয়ড’ না মানা।
মুরগিকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার পর শরীর থেকে ওষুধের মাত্রা নিরাপদ পর্যায়ে নামতে একটি নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সেই সময় শেষ হওয়ার আগেই মুরগি বাজারজাত করা হলে মাংসে ওষুধের অবশিষ্টাংশ থেকে যেতে পারে।
২০২৩ সালে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকে মাংস, ডিম, পোলট্রি খাদ্য ও মলের ২৩০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়।
প্রাথমিক পরীক্ষায় ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ নমুনায় অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়। শুধু ব্রয়লার মাংসের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৩৫ শতাংশ।
তবে বিস্তারিত পরীক্ষায় দেখা যায়, মাংসের মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ নমুনায় অ্যান্টিবায়োটিকের পরিমাণ নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে।
অর্থাৎ কোনো নমুনায় ওষুধের উপস্থিতি পাওয়া এবং সেটি স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ মাত্রায় থাকা—দুটি ভিন্ন বিষয়।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের গবেষকদের ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগৃহীত ২৯৫টি ব্রয়লার মুরগির নমুনা পরীক্ষা করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, অধিকাংশ অ্যান্টিবায়োটিক, আর্সেনিক ও ক্রোমিয়ামের মাত্রা নির্ধারিত সীমার মধ্যে ছিল। এ কারণে গবেষকরা সামগ্রিকভাবে ব্রয়লার মাংসকে খাওয়ার উপযোগী বলে উল্লেখ করেন।
তবে একই গবেষণায় সিসার মাত্রা নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া যায়।
পরীক্ষিত নমুনায় গড়ে প্রতি কেজিতে ২৬৩ দশমিক ৮ মাইক্রোগ্রাম সিসা পাওয়া যায়, যেখানে গবেষণায় ব্যবহৃত সীমা ছিল প্রতি কেজিতে ১০০ মাইক্রোগ্রাম।
গবেষণায় বলা হয়, অধিকাংশ উপাদান নিরাপদ সীমার মধ্যে থাকলেও সিসার মাত্রা ছিল ব্যতিক্রম।
২০১৮ সালের একটি গবেষণায় দেশের বিভিন্ন খামার ও বাজার থেকে সংগ্রহ করা ১৬০টি মুরগির নমুনা পরীক্ষা করা হয়।
গবেষণায় বুকের মাংসের বিভিন্ন নমুনায় সিপ্রোফ্লক্সাসিন, ডক্সিসাইক্লিন, অ্যামোক্সিসিলিন, অক্সিটেট্রাসাইক্লিন ও এনরোফ্লক্সাসিনের উপস্থিতি পাওয়া যায়।
তবে গবেষণাটিতে ব্যবহৃত পরীক্ষাপদ্ধতি মূলত উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত করেছিল; সব ক্ষেত্রে নিরাপদ সীমা অতিক্রম করেছে কি না, তা নিশ্চিত করেনি।
গবেষণা বলছে, মুরগির মাংসে ওষুধের অবশিষ্টাংশ থাকার পেছনে বড় কারণ খামারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের অনিয়ম।
বাংলাদেশের বাণিজ্যিক খামারিদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৪২ দশমিক ৯ শতাংশ খামারি রোগ হওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলকভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করেন।
অনেক খামারি আগের চিকিৎসায় বেঁচে যাওয়া ওষুধ পুনরায় ব্যবহার করেন। আবার অনেকে নির্ধারিত উইথড্রয়াল পিরিয়ড সম্পর্কেও জানেন না।
২০২৫ সালের আরেক গবেষণায় দেশের ৩৪০টি বাণিজ্যিক খামার পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, ৯৩ দশমিক ২ শতাংশ খামারে কোনো না কোনো পর্যায়ে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে।
ফার্মের মুরগির ক্ষেত্রে শুধু ওষুধ নয়, জীবাণু সংক্রমণও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
২০২১ সালের একটি গবেষণায় ঢাকার চারটি কাঁচাবাজার ও তিনটি সুপারশপ থেকে সংগ্রহ করা ৫২টি মুরগির মাংসের নমুনা পরীক্ষা করা হয়।
এর মধ্যে সাতটি নমুনায় সালমোনেলা পাওয়া যায়। কাঁচাবাজারের নমুনায় জীবাণুর উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি ছিল।
গবেষকদের মতে, অপরিচ্ছন্ন জবাই প্রক্রিয়া, দূষিত পানি, নোংরা সরঞ্জাম এবং সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ না করায় মাংস দ্রুত অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে।
মুরগি ভালোভাবে রান্না করলে সালমোনেলা ও অন্যান্য খাদ্যবাহিত জীবাণুর ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো যায়।
বিশেষজ্ঞরা সাধারণত মুরগির ভেতরের তাপমাত্রা প্রায় ৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছানোর পর খাওয়ার পরামর্শ দেন।
কাঁচা মুরগি ধোয়ার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে বলা হয়। কারণ পানির ছিটায় জীবাণু রান্নাঘরের অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তবে রান্না মাংসের জীবাণু ধ্বংস করতে পারলেও অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বা উৎপাদন ব্যবস্থার অনিয়মের সমাধান করতে পারে না।
গবেষণার ভিত্তিতে ফার্মের মুরগিকে এককথায় ‘বিষাক্ত’ বলা যায় না। আবার বাজারের সব মুরগি সমান নিরাপদ—এমন নিশ্চয়তাও নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোক্তাদের উচিত—
- পরিচ্ছন্ন ও বিশ্বস্ত উৎস থেকে মুরগি কেনা
- ভালোভাবে সংরক্ষিত মাংস বেছে নেওয়া
- দুর্গন্ধযুক্ত বা অস্বাভাবিক রঙের মাংস এড়িয়ে চলা
- সম্পূর্ণ রান্না করে খাওয়া
তবে ভোক্তার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো—মুরগি দেখে বোঝার উপায় নেই সেটিকে কখন অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছে বা নির্ধারিত সময় মানা হয়েছে কি না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ মুরগির বাজার নিশ্চিত করতে শুধু আশ্বাস নয়, নিয়মিত পরীক্ষা ও তথ্য প্রকাশ জরুরি।
খামার, জবাইখানা ও বাজার থেকে নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা করে কত শতাংশ মাংসে অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া যাচ্ছে, কত শতাংশ নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে প্রতিটি খামারে ব্যবহৃত ওষুধের রেকর্ড, পশুচিকিৎসকের পরামর্শ এবং বাধ্যতামূলক বিরতির সময় নিশ্চিত করা দরকার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রাণিসম্পদ খাতে অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহার অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণু তৈরির অন্যতম কারণ।
তাই ফার্মের মুরগি নিয়ে মূল প্রশ্ন শুধু ‘খাওয়া যাবে কি না’ নয়। বরং প্রশ্ন হলো—কোন মুরগি নিরাপদ, কীভাবে তা নিশ্চিত করা হচ্ছে এবং সেই তথ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না।
(ঢাকাটাইমস/১৫ জুলাই/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































