যুদ্ধক্ষেত্র থেকে রাজনীতির ময়দানে অলি আহমদের আপসহীন পথচলা

মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখসারির যোদ্ধা থেকে রাজনীতির মাঠের দীর্ঘ পথচলা- ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমের জীবনজুড়ে রয়েছে নানা অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক জীবন, বিএনপি গঠন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার দাবিদার এই রাজনীতিক দীর্ঘ সময় ধরে দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছেন।
ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বাংলাদেশের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও সাবেক মন্ত্রী। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময় চট্টগ্রামে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহ ও পরবর্তী সশস্ত্র প্রতিরোধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অলি আহমদের ভূমিকার কথা বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক আলোচনায় উঠে এসেছে। তাঁর জীবনীতে উল্লেখ করা হয়, ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ তিনি বোয়ালখালীর ফুলতলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সেনাবাহিনী, বিডিআর, পুলিশ, আনসার ও মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে একটি যৌথ হেডকোয়ার্টার স্থাপন করেন। বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ পরিচালনায়ও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র ছিল প্রতিরোধ আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। অলি আহমদের জীবনী ও তাঁর অনুসারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২৭ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমানকে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার বিষয়ে তিনি উৎসাহ ও পরামর্শ দেন।
তবে স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভিন্ন ব্যক্তি ও পক্ষের বর্ণনা রয়েছে। এ কারণে অলি আহমদের ভূমিকার বিষয়টি তাঁর জীবনী ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক বক্তব্যের আলোকে বিবেচনা করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় কালুরঘাট, মীরসরাই, মস্তাননগর, করেরহাট, তুলাতুলী, হেয়াকু, চিকনছড়া, রামগড় ও বেলুনিয়ার মতো বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে অলি আহমদ অংশ নেন। এপ্রিল মাসে চট্টগ্রাম ও ফেনী অঞ্চলের একটি অংশের সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বলে তাঁর জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে।
১৯৭১ সালের জুলাই মাসে জেড ফোর্সের প্রথম ব্রিগেডের ব্রিগেড মেজর হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে ‘বীর বিক্রম’ খেতাবও পান।
স্বাধীনতার পর অলি আহমদের সামরিক জীবনও ছিল কর্মময়। মেজর থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল এবং পরে কর্নেল পদে উন্নীত হন। বিভিন্ন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সেনা সদর দপ্তর, অপারেশনস এবং সামরিক প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদেও কাজ করেন।
১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সালের মধ্যে দেশের সামরিক বাহিনীতে একাধিক বিদ্রোহের সময় তিনি শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন বলে তাঁর জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। ১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে কর্নেল পদে উন্নীত হওয়ার পর সামরিক চাকরি থেকে অবসর নেন তিনি।
সামরিক জীবন শেষে রাজনীতিতে সক্রিয় হন অলি আহমদ। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। বিএনপি গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক কাঠামো ও নামকরণে তাঁর ভূমিকা ছিল বলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনীতে দাবি করা হয়।
১৯৮০ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। একই বছরের মার্চে উপনির্বাচনে চট্টগ্রামের একটি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮২ সালে যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তাঁর মন্ত্রিসভায় প্রবেশ। সামরিক শাসন জারির আগ পর্যন্ত তিনি ওই পদে ছিলেন।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলে অলি আহমদ যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ১৯৯৬ সালের মার্চ পর্যন্ত তিনি এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন।
তাঁর দায়িত্বকালে দেশের সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং বড় সেতু নির্মাণের বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। যমুনা সেতু, দাউদকান্দি, রূপসা ও ভৈরব সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে তাঁর সময়ের ভূমিকার কথা তাঁর রাজনৈতিক জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে। যমুনা সেতুর নির্মাণকাজের একটি বড় অংশ তাঁর দায়িত্বকালে সম্পন্ন হয় বলেও দাবি করা হয়।
১৯৯১ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ত্রাণ, পুনর্বাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
১৯৯৬ সালের মার্চে অল্প সময়ের জন্য কৃষি, খাদ্য ও পানি সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর তাঁকে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওই সময় স্বল্প মেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে তাঁর জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে।
অলি আহমদ ১৯৮০, ১৯৯১, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি ও জুন, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিএনপির হয়ে একাধিকবার নির্বাচিত হওয়ার পর ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি—এলডিপির প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য হন।
বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘদিন রাজনীতি করার পর ২০০৬ সালে অলি আহমদের নেতৃত্বে এলডিপি গঠিত হয়। এরপর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলন ও কর্মসূচিতে তিনি সক্রিয় ছিলেন।
তাঁর অনুসারীদের দাবি, গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি মাঠে ছিলেন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও অবস্থান পরিবর্তন করেননি। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং পরবর্তী আন্দোলনেও তাঁর সক্রিয়তার কথা তারা তুলে ধরেন।
অলি আহমদের রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে তাঁর সততা ও আপসহীনতার দাবি। তাঁর রাজনৈতিক অনুসারীরা মনে করেন, দীর্ঘ সামরিক ও রাজনৈতিক জীবনে ক্ষমতা ও অর্থের প্রতি ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার ঊর্ধ্বে থেকে তিনি রাজনীতি করেছেন।
তাঁদের আরও দাবি, বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সমঝোতা বা ক্ষমতার প্রস্তাব এলেও তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে যাননি। এমনকি বিভিন্ন সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখা হলেও তদন্তে গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়নি—এমন দাবিও তাঁর সমর্থকদের পক্ষ থেকে করা হয়। এসব দাবির স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
১৯৩৯ সালের ১৩ মার্চ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার কুতুব পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন অলি আহমদ। গাছবাড়িয়া এন. জি. উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর করাচির ন্যাশনাল কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
সামরিক জীবনের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাতেও আগ্রহী ছিলেন তিনি। ২০০৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ব্রুকস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও সামরিক ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে গবেষণার জন্য পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনারারি রিসার্চ ফেলো হিসেবেও যুক্ত ছিলেন বলে তাঁর জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখসারির যোদ্ধা, ‘বীর বিক্রম’ খেতাবপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা, সাব-সেক্টর কমান্ডার, ব্রিগেড মেজর, জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী, বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা এবং একাধিকবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী—বিভিন্ন পরিচয়ে অলি আহমদের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামরিক জীবন বিস্তৃত।
তাঁর রাজনৈতিক সমর্থকদের মতে, এত দীর্ঘ অবদানের পরও রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁর যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। বিশেষ করে স্বাধীনতা পুরস্কার না পাওয়াকে তারা অলি আহমদের অবমূল্যায়ন হিসেবে দেখছেন।
অলি আহমদের জীবন ও রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে মূল্যায়ন করতে হলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, সামরিক নথি, রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের মানদণ্ড এবং তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড—সবকিছুকে ঐতিহাসিক তথ্য ও নিরপেক্ষ সূত্রের আলোকে বিবেচনা করা প্রয়োজন। দীর্ঘ এই পথচলায় যুদ্ধক্ষেত্র থেকে রাজনীতির ময়দান—দুই ক্ষেত্রেই অলি আহমদের ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের আলোচনায় একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
(ঢাকাটাইমস/০৯ আগস্ট/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































