সারাদেশে কলেরা প্রতিরোধে টিকার ক্যাম্পেইন আজ থেকে শুরু

কলেরা একটি সংক্রামক রোগ, যার জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়া ভিব্রিও কলেরা। সাধারণত দূষিত পানি বা খাবারের মাধ্যমে এই জীবাণু মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের অনেকেরই কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার ডায়রিয়া হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে দ্রুত পানিশূন্যতা দেখা দিয়ে জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
কলেরা প্রতিরোধে সারাদেশে আজ শনিবার (২২ আগস্ট) থেকে শুরু হয়েছে দুই ডোজের ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন। ঝুঁকিপূর্ণ ১৪টি উপজেলা ও থানায় এই কর্মসূচির আওতায় প্রথম ডোজ দেওয়া হবে ২২ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হবে ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২৫ অক্টোবর।
সম্পূর্ণ সুরক্ষার জন্য নির্ধারিত সময় অনুযায়ী দুই ডোজই গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
কর্মসূচির আওতায় ১ বছর বা তার বেশি বয়সী সব নাগরিককে বিনামূল্যে কলেরার টিকা খাওয়ানো হবে। তবে গর্ভবতী নারীরা এই টিকাদান কর্মসূচির আওতাভুক্ত নন।
প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত নির্ধারিত কেন্দ্রগুলোতে টিকা দেওয়া হবে। সারাদেশে মোট ৫১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) লালবাগ, গেন্ডারিয়া, কদমতলী ও কামরাঙ্গীরচর থানার ১৭টি ওয়ার্ডে ১৯২টি কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রায় ১১ লাখ ৭০ হাজার মানুষকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) শেরেবাংলা নগর, খিলক্ষেত ও তেজগাঁও এবং মুন্সিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নির্ধারিত এলাকাতেও এই কর্মসূচি চলবে।
সম্প্রতি ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, একসময় কলেরায় গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যেত। বর্তমানে রোগটি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবের কারণে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
জাতীয় অন্যান্য টিকাদান কর্মসূচির মতো কলেরার এই ক্যাম্পেইন সফল করতেও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ভূমিকার প্রশংসা করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, পুরান ঢাকাসহ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ইপিআই কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে ডিএসসিসির। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ১৭টি ওয়ার্ডে কলেরার টিকাদান কর্মসূচিও সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ভিব্রিও কলেরি জীবাণুর সংক্রমণে কলেরা হয়। মুখে খাওয়ার এই টিকা কলেরা প্রতিরোধে সহায়তা করে এবং আক্রান্ত হলে রোগের তীব্রতা কমাতেও ভূমিকা রাখে।
কলেরার প্রধান লক্ষণ হলো তীব্র ও পানির মতো ডায়রিয়া। এর সঙ্গে আরও কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন—
- বারবার বমি ও ডায়রিয়া
- অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা
- তীব্র তৃষ্ণা
- মাথা ঘোরা
- পেশিতে খিঁচুনি
- হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া বা অনিয়মিত হওয়া
- প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া
- মুখ, ত্বক ও শ্লেষ্মা ঝিল্লি শুষ্ক হয়ে যাওয়া
- চোখ কোটরে ঢুকে যাওয়া
- রক্তচাপ কমে যাওয়া
কলেরার ডায়রিয়া অনেক সময় হঠাৎ শুরু হয় এবং দ্রুত শরীর থেকে বিপুল পরিমাণ তরল ও লবণ বেরিয়ে যেতে পারে। ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মারাত্মক পানিশূন্যতা তৈরি হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ আক্রান্ত ব্যক্তির তীব্র উপসর্গ দেখা যায় না। তবে গুরুতর ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা না পেলে অল্প সময়ের মধ্যেই মৃত্যু ঘটতে পারে।
তীব্র ডায়রিয়া ও বমির কারণে শরীর থেকে পানি ও প্রয়োজনীয় ইলেক্ট্রোলাইট দ্রুত কমে যায়। এতে ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে পেশিতে খিঁচুনি, রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং হাইপোভোলেমিক শকের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
গুরুতর পানিশূন্যতায় কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া, রক্তে শর্করা কমে যাওয়া এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। চিকিৎসা না পেলে এসব জটিলতা প্রাণঘাতী হতে পারে।
কলেরা প্রতিরোধে নিরাপদ পানি পান ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য—
- নিরাপদ, বোতলজাত বা ফুটানো পানি পান করতে হবে।
- প্রয়োজন হলে রাসায়নিকভাবে পরিশোধিত পানি ব্যবহার করতে হবে।
- খাবার তৈরি ও খাওয়ার আগে এবং টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুতে হবে।
- ভালোভাবে রান্না করা ও গরম খাবার খেতে হবে।
- কাঁচা বা কম রান্না করা সামুদ্রিক খাবার, বিশেষ করে ঝিনুক, এড়িয়ে চলতে হবে।
- দাঁত ব্রাশ, খাবার তৈরি, বাসন ধোয়া ও বরফ তৈরির জন্য নিরাপদ পানি ব্যবহার করতে হবে।
- দূষিত বা অপরিষ্কার পানি ও খাবার থেকে বিরত থাকতে হবে।
কলেরার ক্ষেত্রে দ্রুত পানিশূন্যতা তৈরি হওয়ায় গুরুতর ডায়রিয়া বা বারবার বমি হলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে প্রস্রাব কমে যাওয়া, অতিরিক্ত তৃষ্ণা, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, চোখ কোটরে ঢুকে যাওয়া বা অস্বাভাবিক নিস্তেজতার মতো পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
কলেরা প্রতিরোধে টিকার পাশাপাশি নিরাপদ পানি পান, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, টিকা নেওয়ার পাশাপাশি নিরাপদ পানি পান, খাবার ঢেকে রাখা এবং নিয়মিত হাত ধোয়ার মতো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাও জরুরি। কলেরা প্রতিরোধে এসব বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
(ঢাকাটাইমস/২২ আগস্ট/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন











































