সেই চকি আড্ডা আজ ‘চকি সংসদ’

মঞ্জুর রহমান, মানিকগঞ্জ
 | প্রকাশিত : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১৬:৫২

বিগত সেনা-সমর্থিত সরকারের সময় নিজেদের আড্ডাস্থল হারিয়ে বিকল্প হিসেবে শুরু করেন এক দোকানের সামনে রাখা চৌকিতে বসে আড্ডা। মানিকগঞ্জের সেই চৌকি আড্ডা এখন ‘চকি সংসদ’।

আজ এই চকি সংসদ ১০ বছর পেরিয়ে ১১ বছরে পা দিল। দশম বর্ষপূর্তি উৎসব উপলক্ষে নানান ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন চকি সংসদের সদস্যরা। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় চকি সংসদ স্থলে স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে শুরু হবে অনুষ্ঠান। এরপর গানবাজনা-কুইজসহ থাকছে নানা আয়োজন।

সংসদের সদস্যদের কাছ থেকে জানা যায়, তাদের আড্ডাস্থলটি ছিল বিবেকানন্দ ক্লাবে। কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তি ও সুশীল সমাজের মানুষকে নিয়ে জমত সেই জম্পেশ আড্ডা। ২০০৭ সালে সেনাশাসিত তত্ত্ব¡াবধায়ক সরকারের সময় বিবেকানন্দ ক্লাবের আড্ডাস্থল থেকে কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে সেনাবাহিনীর সদস্যরা। বন্ধ হয়ে যায় বিবেকানন্দ ক্লাবের আড্ডা।

এতে বিপাকে পড়েন আড্ডার মানুষ মানিকগঞ্জের সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা। কিন্তু ঠেকিয়ে রাখা যায়নি তাদের। তারা ভিন্ন বুদ্ধি অবলম্বন করতে থাকেন। তখনকার জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন খান, সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট দীপক কুমার ঘোষ, হায়দার আলী ও সদর আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসিব উদ্দীন সেলিমসহ ছয়-সাতজন ব্যক্তি শহরের পুরান কাঁচাবাজারের আবির মিষ্টি দোকানের সামনে বসা শুরু করলেন। সেখানে চা থেকে শুরু করে সব ধরনের খাবারের সমারোহ। দ্রুতই এই আড্ডাস্থলের খোঁজ পেয়ে গেলেন অন্য সাথিরা।

আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে আড্ডার সদস্যসংখ্যা। এরপর এই আড্ডাস্থলের নাম দেয়া হয় ‘চকি সংসদ’। বর্তমানে শহরের আলোচিত এই চকি সংসদের সদস্য ৫০ জনের ওপর। প্রতিদিন রাত আটটা থেকে  সাড়ে ১০টা পর্যন্ত চলে আড্ডা। এই সংসদে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাসদ, জাতীয় পার্টিসহ বাম রাজনৈতিক দল, শিক্ষক, ক্রীড়াবিদ, পবিবেশবিদ এবং সুশীল সমাজের নেতারা প্রতিদিন অংশ নেন। মাঝে মাঝে এই আড্ডার আলোচনা চলে রাত ১১টা পর্যন্ত।

চকি সংসদে আলোচনার বিষয়বস্তু থাকে দেশ-বিদেশে ঘটে যাওয়া প্রতিদিনের আলোচিত ঘটনা।  নিজ নিজ দলের দর্শন-নীতি অনুসারে কথা বলেন আড্ডার মানুষগুলো। মাঝে মাঝে আড্ডা থেকে ওয়াকআউট করেন কেউ কেউ; কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে এসে যোগ দেন।

চকি সংসদে চলে প্রাসঙ্গিকভাবে রাজনৈতিক আলোচনা-সমালোচনা; যুক্তি দিয়ে অন্য পক্ষের কথা খণ্ডানো, হাসিঠাট্টা। সব বিষয়ের ওপর আলোচনা চলে এই চকি সংসদে।  
চকি সংসদের অন্যতম সদস্য খান বাহাদুর আওলাদ হোসেন খান কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক ও লেখক-সাংবাদিক সাইফুদ্দিন আহম্মেদ নান্নু ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আড্ডা হলো মানুষের জীবনের অপরিহার্য ভেন্টিলেটর। নিত্যদিনের জীবনযন্ত্রণা দূর করতে এর কোনো বিকল্প নেই।’
আড্ডার আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক মানুষের জানার জগৎকে সমৃদ্ধ করে, অনেক ভুল জানাকে শুধরে দেয় উল্লেখ করে সাইফুদ্দিন আহম্মেদ নান্নু বলেন, মানিকগঞ্জের চকি সংসদও ঠিক তেমনি এক শুভ্র আড্ডা। আর এর আড্ডাবাজরা সমাজের উজ্জ্বলতর মানুষ।

চকি সংসদ গড়ে ওঠার গল্প শোনালেন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক পরিবেশবিদ অ্যাডভোকেট দীপক কুমার ঘোষ। ঢাকাটাইমসকে তিনি বলেন, ‘এক-এগারোর মধ্য দিয়ে আসা সেনা-সমর্থিত সরকার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বর্তমান পৌর মেয়র গাজী কামরুল হুদা সেলিমসহ বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতাকে গ্রেপ্তার করে। তাদের শুভাকাক্সক্ষী, সহকর্মী, সহযোদ্ধারা একত্র হয়ে পুরান কাঁচা বাজার এলাকায় চকিতে বসে মত ও ভাববিনিময় শুরু করেন। এখানে বসেই সে সময়ের পরিস্থিতি উত্তরণের উপায় নিয়ে আড্ডার মধ্যে আলোচনা হয়। তাতে প্রায় সব দলের নেতাকর্মী, পেশাজীবীরা অংশ নিতেন। সেই ২০০৭ সালে শুরু হওয়া চকি আড্ডা আজ ‘চকি সংসদ’।

এই চকি সংসদের আরেক সদস্য মালয়েশিয়া প্রবাসী ডা. মোহাম্মদ নাসিমুল ইসলাম ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘একসময় দেশের টানে দেশে যেতাম। এখন চকির টানে দেশে যেতে হয়।’ তিনি আরো বলেন, জমে থাকা রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক কথা, ক্ষোভ সবকিছুই সেখানে সেন্সর ছাড়া বলা যায় বলেই তার আকর্ষণ দিনে দিনে বাড়ছে।

(ঢাকাটাইমস/১০ফেব্রুয়ারি/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত