বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা

অ্যাডভোকেট সুবল চন্দ্র সাহা
| আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০১৬, ১৩:৪৫ | প্রকাশিত : ০৬ অক্টোবর ২০১৬, ১৬:৪৪

বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। এ পুজো শুধু বাঙালি হিন্দুদের ভেতরই সীমাবদ্ধ নয়, সম্প্রদায়ের গণ্ডি পেরিয়ে দুর্গোৎসব আজ জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সর্বজনীন এ দুর্গোৎসবকে ঘিরে সবার মধ্যে গড়ে ওঠে এক সৌহার্দ্য, প্রীতি ও মৈত্রীর বন্ধন।

সৃষ্টির আদিকাল থেকে মানুষ অশুভ শক্তিকে পরাভূত করে শুভশক্তি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করে চলেছে। দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা এ শুভশক্তিরই প্রতীক। দেবী দুর্গা সব দেব-দেবীর সমন্বিত পরমা শক্তি। অসুর দলনে যিনি চণ্ডী, শরণাগতদের কাছে তিনিই সাক্ষাৎ লক্ষ্মী-স্বরূপিনী ; মঙ্গলদায়িনী জগম্ময়ী মা। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সব স্তরে এ শুভশক্তি প্রতিষ্ঠার চিরন্তন সংগ্রামই মাতৃবন্দনার মূলমন্ত্র। আসুরিক শক্তির দ্বারা নির্যাতিত মানুষ তাই মায়ের আশীর্বাদ প্রার্থনা করে। মন্দিরে মন্দিরে দুর্গামূর্তি স্থাপন করে তারা মাতৃবন্দনায় রত হয়।

আমরা বাঙালি। বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। এ মাতৃভূমির স্বাধীনতা নিষ্কণ্টক পথে আসেনি। আসেনি ফুলশয্যার মতো একক কোনো গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের যুদ্ধের মাধ্যমে। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে আনতে হয়েছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে রচিত হয় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ দলিল পবিত্র সংবিধান। উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত জনগণের গণতান্ত্রিক সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। সংবিধানের সংযোজন করা হলো অন্যান্য মূলনীতির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতা।

কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য, ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পরবর্তীকালে ক্ষমতা দখলকারী শাসক গোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পরস্কৃত করে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগে হত্যাকারীদের বিচার প্রক্রিয়া আইন করে রুদ্ধ করা হয়। সেনাশাসক আসুরিক শক্তি প্রয়োগে সংবিধান থেকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতা মুছে ফেলেন।
১৯৮৮ সালে আরেক সেনাশাসক আরো এক ধাপ এগিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের ধর্মকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম ঘোষণা করেন। ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা পরিণত হয় দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে। ধর্মান্ধতা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লোপ পেতে থাকে। সংখ্যালঘুদের ওপর নেমে আসে অত্যাচারের খড়গ। তবে পেশিশক্তির বলে সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা মুছে ফেলা হলেও মুক্তিকামী মানুষের অন্ত থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুছে ফেলা যায়নি। রক্তের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বাঙালি সব সময়ই অসাম্প্রদায়িক ও শান্তিপ্রিয়।

সৌভাগ্যক্রমে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি আজ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। বিশ্বনন্দিত নেত্রী বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা পুনঃসংযোজন করেছেন। সাংখ্যালঘু সম্প্রদায় ফিরে পেয়েছে তাদের নাগরিক অধিকার।

দুর্গাপূজা বছরে তিনবার অনুষ্ঠিত হয়। শাস্ত্রে বর্ণিত আছে, সত্যযুগে রাজা সুরথ রাজ্যচ্যুত হয়ে বনে আশ্রয় নেন। নিকটাত্মীয় ও আমত্যবর্গের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে রাজা সমাধিকেও বৈশ্য বাড়ি ছেড়ে বনে চলে আসতে বাধ্য হন। মহাসংকটে নিপতিত উভয়ই বিপদ থেকে মুক্তি পেতে ঋষি মেধসমুণির শরণাপন্ন হন। সত্যদ্রষ্টা মুণিবরের পরামর্শে তারা দুর্গতিনাশিনী দুর্গাদেবীর পুজো করেন। তবে এ পুজো বসন্তকালে অনুষ্ঠিত হয় বলে এ পুজোকে বাসন্তী পূজা বলে।

বাসন্তী পূজাই কালের স্বাভাবিক পুজো। এ পুজোতে বোধন পুজোর প্রয়োজন হয় না।

ক্রেতাযুগে যুগবতার রামচন্দ্র রাবণকে বধ করার জন্য দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন। শরৎকালে এ পুজো অনুষ্ঠিত হয়েছিল বলে এ পুজোকে শারদীয় দুর্গোৎসব বলে।

শাস্ত্রে বর্ণিত আছে মাঘ থেকে আষাঢ় মাস পর্যন্ত ছয় মাসকে উত্তরায়ণ বলে। এ সময় দেবতাদের এক দিন। দেবতারা জেগে থাকেন। শ্রাবণ থেকে পৌষ সংক্রান্তি পর্যন্ত  ছয় মাসকে দক্ষিণায়ন বলে। এ সময় দেবতাদের এক রাত্রি। তারা ঘুমিয়ে থাকেন।  তাই দেবতাদের জাগ্রত করে রামচন্দ্র মহাষষ্ঠীতে ষষ্ঠাদিকল্প বা  বোধনপুজো  করেছিলেন। এ জন্য শারদীয় এ দুর্গোৎসবকে অকাল বোধন বলে। হেমন্ত ঋতুতেও মা দুর্গার আগমন ঘটেছিল। যা কাত্যায়নী দুর্গাপূজা নামে খ্যাত।

প্রাচীনকাল থেকেই সনাতন ধর্মের  দুটি ধারা প্রচলিত। একটি বৈদিক এবং অন্যটি তান্ত্রিক। বৈদিক ধারার ভিত্তি বেদান্ত দর্শন, যার মূলে রয়েছে ব্রহ্মবাদ। আর তন্ত্রশাস্ত্রের মূল ভিত্তি শক্তিবাদ, যার রূপায়ন ঘটেছে শ্রীচ-ি গ্রন্থে। উভয়ের মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে পার্থক্য পরিলক্ষিত হলেও আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে উভয়ই এক ও অভিন্ন। ব্রহ্মই আদ্যাশক্তি জগম্ময়ী দেবী দুর্গা।

বিশ্বব্রহ্মা- রক্ষা এবং নির্যাতিত, নিপীড়িত ও অপশাসনে অত্যাচারিত জীবের দুর্গতি হরণ করার জন্য দেবী দুর্গার আবির্ভাব হয়। দেবতাদের সম্মিলিত তপস্যার জ্যোতি থেকে সৃষ্ট আদ্যাশক্তি মহামায়া দুর্গা নাম ধারণ করে মর্ত্যলোকে আগমন করেন। তান্ত্রিক সাধকরা দেবী দুর্গাকে মাতৃজাতির প্রতীক করুণাময়ী বলে তাকে নারী মূর্তিতে কল্পনা করেছেন। আসলে তিনি নারীও নন, পুরুষও নন। বস্তুত তিনি এক ও অভিন্ন। জীব ও জগতের কল্যাণের জন্য যে রূপ ধারণ করার প্রয়োজন মনে করেন, তিনি সেই রূপই ধারণ করেন। মাতৃসাধক শ্রীশ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলেছেন, ‘তোমরা যাঁকে ‘ব্রহ্ম বলো আমি তাঁকে মা বা ব্রহ্মময়ী বলি। ব্রহ্মময়ী এক ও অভিন্ন।’ বিশ্ববরেণ্য দার্শনিক ড. মহানামব্রত  ব্রহ্মচারীজি বলেছেন, ‘ব্রহ্মময়ী মহাশক্তিকে আমরা জড় বলতে পারি না। তিনি স্বয়ম্ভু স্বপ্রকাশ ও চৈতন্যময়ী।’ তাঁকেই তো ধর্মচার্য্যাগণ পরমেশ্বর বলে উপাসনা করেন। ঈশ্বর ও ঐশীশক্তির মধ্যে কোনো তফাত নেই।’

বিশ্বপ্রকৃতির অনাদি আদি আদ্যাশক্তি মহামায়া জগম্ময়ী দেবী দুর্গা। তিনি কখনো ত্রিভুজা, কখনো অষ্টভুজা,  আবার কখনো দশভুজা হিসেবে আবির্ভূত হন। বস্তুত যিনি ব্রহ্ম তিনিই শক্তি। তিনিই দেবী দুর্গা। দুর্গাপূজা মূলত শক্তির আরাধনা। দুূর্বলের কোনো আত্মজ্ঞান হয় না। জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য চাই শক্তির সাধনা। ব্রহ্মের পরিপূর্ণতা লাভ করে শক্তিতে। আর শক্তির পরিপূর্ণতার রূপায়ন ঘটে জগৎ সৃষ্টিতে। বৈদিক মন্ত্রে তাই প্রতিধ্বনি শোনা যায় ‘সর্বংখলিদ্বংব্রহ্ম’ বিশ্বের সবকিছুই ব্রহ্মময়। ঈশ্বর এক, অদ্বিতীয় ও নিরাকার। তবে বিভিন্ন দেব-দেবীও ঈশ্বরেরই অংশ। ঈশ্বরই বিভিন্ন শক্তির ‘প্রকাশ মাত্র’। ভক্ত ঈশ্বরেরই প্রতীক। মূর্তিতে তার হৃদয়ের অর্ঘ্য দেবতার উদ্দেশে নিবেদন করে করুণা লাভের চেষ্টাই পুজো বা উপাসনা। পুজারির আরাধ্য দেবতার মৃন্ময়ী মূর্তি তার মানসলোকে চিন্ময়ী হয়ে ওঠে। তাই মূর্তিপূজা পুতুলপূজা নয়। মাটির তৈরি মূর্তিকে হিন্দুরা পুজো করে বলাটা সঠিক নয়।

জগতে শক্তির  বিভিন্নতা দৃশ্যমান হলেও শক্তি মূলত এক ও অভিন্ন। তন্ত্রশাস্ত্র ‘শ্রীশ্রী চ-ী’ গ্রন্থে বিভিন্ন রূপভেদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। চ-ী গ্রন্থের তিনটি খ-ে ১৩টি অধ্যায় রয়েছে। দুর্গতিনাশিনী আদ্যাশক্তি মহামায়ার সঙ্গে দুর্দ- দানব অসুরদের সম্মুখ যুদ্ধের বিবরণ এতে বিধৃত হয়েছে। চ-ীর প্রথম অংশে রয়েছে মধু-কৈটব বধ; মধ্য খ-ে মহিষাসুর বধ এবং উত্তর খ-ে শম্ভু-নিশম্ভু সংহারকাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে।

আধুনিক বিজ্ঞান ও সনাতন ধর্মের প্রাচীন ঋষিগণ শক্তির অস্তিত্ব স্বীকার করেন। তবে উভয়ের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পার্থক্য আছে। আধুনিক বিজ্ঞান বিশ্বের সব বস্তুতে শক্তির প্রকাশ অবলোকন করেন। আর প্রাচীন ঋষিগণ বিশ্বাস করতেন সমগ্র বিশ্বব্রহ্মা- একটি মহাশক্তি। এ শক্তিকে বিজ্ঞানীরা মানবকল্যাণে ব্যবহার করেন। আর মুণি-ঋষিরা জীবজগতের হিতার্থে শক্তির উপাসনা করেন। আমরা সাংসারিক জীব। আমাদের ভুললে চলবে না, দুর্গাপূজা শুধু বাহ্যিক আড়ম্বর অনুষ্ঠানের পুজো নয়। জাগতিক ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও শক্তি অর্জন করাটাই পুজোর প্রধান উদ্দেশ্য।

আজ দুর্গাপূজার অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিকতার পরিবর্তে বহিরাঙ্গের উৎসব ও আয়োজন মুখ্য হয়ে উঠেছে। মানুষ আজ নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ ভুলে গিয়ে জড়বাদের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। ফলে মানুষ স্বল্প সময়ে জ্ঞানশূন্য হয়ে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির আশ্রয়ে বিশাল বিত্ত-বৈভবের মালিক হচ্ছে। সবাই যেন প্রাচুর্যের পাহাড় গড়ে তোলার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ! তাই আজ সমাজজীবন থেকে এ দুর্গতি বিনাশ করার জন্য মা দুর্গার আশীর্বাদ অপরিহার্য। জীবমাত্রেই ঈশ্বরের প্রতীক। আমার অস্তিত্ব  ঈশ্বরের অস্তিত্ব। ঈশ্বরের সত্তাই আমার সত্তা। এ দৃঢ় বিশ্বাস মনে রেখে যিনি ঈশ্বরের উপাসনা করেন, তিনিই প্রকৃত ভক্ত ও প্রকৃত সাধক।

তাই আসুন, দুর্গোৎসবের এ শুভ দিনে আমাদের প্রার্থনা হোক- আমরা সমাজজীবন থেকে হিংসা, বিদ্বেষ, সন্ত্রাস, সংকীর্ণতা ধুয়ে-মুছে ফেলি। আসুরিক শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে মনুষ্যত্বের বেদিমূলে দেশ ও জাতিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করি। আদ্যাশক্তির মহামায়ার মহামন্ত্রে উজ্জীবিত হই। আত্মবিশ্বাস ও আত্মশক্তিতে বলীয়ান হই। মানুষের অহংসত্তার গভীরে যে শাশ্বত বিশ্বজনীন মানবসত্তা লুকিয়ে রয়েছে, তা দেবী দুর্গার আশীর্বাদে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রস্ফুটিত করে তুলি। জ্যোতির্ময়ী দুর্গতিনাশিনী জগম্ময়ী মা দুর্গা আমাদের সহায় হোন।

লেখক:  সভাপতি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ফরিদপুর জেলা শাখা।
[email protected]

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত