সরকারের জবাবদিহির বড় দায়িত্ব বিরোধী দলের

এম রহমান
 | প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ১৪:৫২
জাতীয় সংসদ ভবন

সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল সুর জনগণের ক্ষমতানির্ভর একটি ক্ষমতা কাঠামো। সংবিধানের ৭ (১) অনুচ্ছেদ মতে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে’। মূলত জনগণ নির্বাচনে ভোট প্রদানের মাধ্যমে এই ক্ষমতার হস্তান্তর করে জনপ্রতিনিধিদের হাতে। জনপ্রতিনিধিরা সংসদের মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের তিনটি মূল বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার বিভাজন করে থাকে। তা হলো-সংসদ, নির্বাহী বিভাগ এবং বিচার বিভাগ।

এই সংসদই নির্বাহী প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী, সংসদের স্পিকার এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করে। মূলত রাষ্ট্রপতি তার ওপর সংসদ কর্তৃক অর্পিত ক্ষমতাবলে বিচার বিভাগসহ অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ করেন। এখানে স্পষ্ট যে, মূল ক্ষমতার সূত্র কিন্তু একটাই, সংসদ বা জনপ্রতিনিধিরা। একজন ভোটার যখন ভোট দেন তখন তিনি পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য সংসদের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার আইন-কানুন, বাজেট, পরিকল্পনা প্রণয়নসহ সব ক্ষমতা অর্পণ করেন।

২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে চার লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা আয় ধরে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। ধরা যাক, আগামী পাঁচ বছরে একইভাবে মোট ২৪০০ লাখ কোটি টাকার বাজেট নির্ধারণ করা হবে। এই ২৪ লাখ কোটি টাকা এদেশের মানুষের পকেট থেকেই সরকার তুলবে। এই ট্যাক্স নির্ধারণ, সংগ্রহ এবং তার ব্যয় করার যে ক্ষমতা তা জনগণ এই ভোটের মাধ্যমে প্রদান করে। এদেশের একজন ভিক্ষুকও সাবান কিনতে গিয়ে ভ্যাট দেয়। ভোটার আছে ১০ কোটি, মাথাপিছু প্রতি ভোটারের পকেট থেকে প্রতি মাসে চার হাজার টাকা, বছরে ৪৮ হাজার। অর্থাৎ, পাঁচ বছরে মোট দুই লাখ ৪০ হাজার টাকা সংগ্রহ করা হবে।

জনগণের পকেট থেকে এই বিশাল অংকের টাকা সংগ্রহ করা হয়। এই টাকা সংগ্রহ ও তার ব্যয়ের ক্ষমতা অর্পণের আয়োজনে সেই সাধারণ ভোটারের ভোটাধিকারকে সম্মান করা, তাদের প্রতি প্রতিশ্রুত দলীয় প্যাকেজ (ইশতেহার) কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করা একটি রাজনৈতিক দলের সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

যাদের টাকায় সরকার চলবে; নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাদের কাছ থেকে এই ক্ষমতা নেয়া হয়েছে; যাদের জন্য সরকার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে, তারাই মূল ক্ষমতার উৎস।

রাজনীতি মানে এই বাজেট। হয়তো বাজেটের নিয়ন্ত্রণই এদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূল প্রলোভন। রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহারে নির্বাচনের পূর্বে ঘোষণা করে, প্রশাসনিক কাঠামো কেমন হবে, নীতি আদর্শ, প্রাইওরিটি এরিয়া, সংস্কার, উন্নয়ন, কর্মপরিকল্পনা। এক কথায় প্রজেক্ট প্রপোজাল (ইশতেহার) জনগণের উদ্দেশে প্রচার করে, যে প্রতিশ্রুতিগুলো ও প্রপোজালগুলো জনসমর্থন পাবে, তারাই সরকারে আসবে এবং দেশ প্রতিশ্রুত পন্থায় পরিচালনা করবে। কিন্তু, এই ইশতেহারে বর্ণিত প্রতিশ্রুতি যদি সরকার বাস্তবায়ন করতে না পারে, তার জন্য আদালত এটা নিশ্চিত করতে পারে না। কেউ আদালতে গিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবে না। কেননা, এগুলো দলের মিশন ও ভিশন। এগুলো আইনি উপায়ে বলবৎ যোগ্য নয়। তাইতো, এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সঠিকভাবে হচ্ছে কি না, তা দেখভাল করার জন্যই জনগণকে নির্ভর করতে হয়, বিরোধী দল, মিডিয়া বা সংসদীয় কমিটির ওপর। কিন্তু এই জবাবদিহিতার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সংসদ সদস্যরাই জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। তাদের কর্মের জবাব, একমাত্র পরবর্তী নির্বাচন ছাড়া দেয়ার সুযোগ থাকে না।

কিন্তু সরকার গঠনের মাধ্যমে যেহেতু সরকার দলীয় সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে নির্বাহী বিভাগের অধীন প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক মন্ত্রিপরিষদ গঠন করা হয়; সেহেতু ওই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা তখন সরকার বা রাষ্ট্রের অংশ হয়ে যায়। তখন ক্ষমতা কাঠামোতে তিনটি স্তর সৃষ্টি হয় জনগণ, রাষ্ট্র এবং মাঝখানে থাকে বিচার বিভাগ।

এ ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের শাসনকালে সবকিছু প্রতিশ্রুতি ও জনগণের চাহিদা মোতাবেক হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য থাকেন অন্যান্য সংসদ সদস্য। বিভিন্ন সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে মন্ত্রণালয়গুলোর কার্যক্রমকে সংসদের কাছে জবাবদিহি রাখা হয়। কিন্তু সংবিধানের ৭০নং অনুচ্ছেদের কারণে, সরকার দলীয় সংসদ সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারেন না।

৭০নং অনুচ্ছেদে আছে- ‘কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি-(ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোন নির্বাচনে সংসদ-সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।’

কিন্তু জনগণ তার প্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকল্পে তার হাতে একমাত্র উপায় থাকে বিরোধী দল। একমাত্র বিরোধী দলই সরাসরি জনগণের পক্ষে সরকারের কার্যক্রম, মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনার ক্ষেত্রে অর্থপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিরোধীদলের ব্যাপারে আমরা খুব বেশি মাথা ঘামাই না। ভাবি তারা সরকারের বাইরে মানে তারা ক্ষমতাহীন। আমাদের মনে রাখা উচিত, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা কিন্তু তাদের নিজ নিজ অধিক্ষেত্রের মেজোরিটি মানুষের জনসমর্থন নিয়ে সংসদে এসেছে। সরকারদলীয় সংসদ সদস্য এবং বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা ও জনসমর্থনের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। বরং সরকারকে সমালোচনা করা, জনগণের কাছে নিজেদের দলীয় ইমেজ পুনরুদ্ধারের জন্য জনস্বার্থ সংরক্ষণে তারাই মুখ্য ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার সামর্থ্য ও সাহস রাখে। সংবিধান সংশোধনসহ জনগুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ণকালে বিরোধী দলই একমাত্র জনস্বার্থ, মানুষের চাওয়া, উদ্বিগ্নতা, জনগণের প্রত্যাশা এবং সাধারণের পক্ষে সংসদে কথা বলতে পারে।

সরকারদলীয় অবস্থান ও সিদ্ধান্ত মূলত নির্ধারণ করেন দলীয়প্রধান। যেহেতু বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দলীয় প্রধানই সাধারণত সরকার প্রধান হন সেহেতু সরকার দলীয় প্রধান বা প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত ও অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করার বা দলীয় প্রধানকে প্রশ্ন করার আইনগত অধিকার হারায় ওই ৭০নং অনুচ্ছেদের কারণে। তাছাড়া, সংবিধানে মন্ত্রিপরিষদে কে থাকবে বা থাকবে না, সেটাও সংবিধান প্রধানমন্ত্রীর একক হাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

সংবিধানের ৫৫ (১) অনুচ্ছেদে রয়েছে- ‘প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি মন্ত্রিসভা থাকিবে এবং প্রধানমন্ত্রী ও সময়ে সময়ে তিনি যেরূপ স্থির করিবেন, সেইরূপ অন্যান্য মন্ত্রী লইয়া এই মন্ত্রিসভা গঠিত হইবে। (২) প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বা তাঁহার কর্তত্বে এই সংবিধান-অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রযুক্ত হইবে।’

কার্যত সরকারের বা মন্ত্রিপরিষদের ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতার অধীন হয়। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, সরকার মানে প্রধানমন্ত্রী এবং তার অধীনে নির্বাহী বিভাগের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের চাওয়াকে সমালোচনা করার একমাত্র জায়গা বিরোধী রাজনৈতিক দল।

সংসদীয় কমিটির কাছে মন্ত্রিপরিষদের দায় ও জবাবদিহিতার বিধান থাকলেও মূলত সরকার দলীয় সংসদ সদস্যরা কমিটির প্রধান থাকেন, তাই সাধারণত দলীয় মন্ত্রীদের কার্যক্রমের ত্রুটি ও ভুল-ভ্রান্তি স্বভাবতই তাদের প্রতিবেদনে খুব বেশি উঠে আসে না।

অন্যদিকে সংবিধানের ৪৮ (১) নং অনুচ্ছেদে বলা আছে-‘বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকিবেন, যিনি আইন অনুযায়ী সংসদ-সদস্যগণ কর্তৃক নির্বাচিত হইবেন।’ কার্যত দলীয় প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর চাওয়া মতেই সাধারণত রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করা হয়। আবার রাষ্ট্রপতির ইম্পিচমেন্টের ক্ষমতা যেহেতু সংসদের, সেহেতু মহামান্য রাষ্ট্রপতিও দলীয় অবস্থান, নিজের পদের নিরাপত্তা এবং সংসদের নিকট দায় এর কারণে সরকার দলীয় প্রধান (প্রধানমন্ত্রী) এর ইচ্ছের বাইরে যেতে চান না।

প্রধানমন্ত্রী বা দলীয় প্রধান যখন একচ্ছত্র ক্ষমতার চর্চা করেন, তখন তার অধীনে সরকার দলীয় সবার কৃতকর্মের দায়-দায়িত্বও তার কাঁধে বেশি বর্তায়। দু-চার জন মন্ত্রীর কর্মকাণ্ডের দায় পুরো দলকে বহন করতে হয়। যেমন: প্রশ্ন ফাঁস, শেয়ার বাজার কেলেংকারি, নিরাপদ সড়ক, দ্রব্যমূল্য এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড প্রভৃতি বিষয়গুলোর কোনোটিই দলীয় প্রধানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণাধীন ইস্যু নয়। তবুও আওয়ামী লীগকে দলীয়ভাবে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে।

এজন্য প্রধানমন্ত্রী বা সরকার দলীয় প্রধানের দলের অন্যান্য সদস্যদের জবাবদিহিতা ও নজর রাখার ভার কিছুটা বিরোধীদল বা ছায়া সরকারের কাঁধে দিলে জনগণের পক্ষে সরকারের কর্মকাণ্ডের প্রকৃত চিত্র জনগণের উদ্দেশ্যে সংসদে বিরোধী দল তুলে ধরতে পারে।

এছাড়া প্রধানমন্ত্রী যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রতিশ্রুতি নিয়ে সরকার পরিচালনা করতে আগ্রহী সেটি অনেকাংশে নিশ্চিত হয় যদি সত্যিকারের কার্যকর বিরোধীদল সংসদে ছায়া সরকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে।

ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াতে অপোজিশন লিডারকে শ্যাডো কেবিনেট গঠনের ক্ষমতা দেয়া হয়, ছায়ামন্ত্রী পদের ব্যবস্থা রয়েছে। তাদের মূল কাজ হলো, সরকারি দলের নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন তদারকি করা এবং সরকারকে তাদের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা। এমনকি কেবিনেটের মন্ত্রীরা সংসদে প্রায় সমর্যাদার আসন অলংকৃত করেন।

গত বছর ডিসেম্বরে ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র প্রধানমন্ত্রিত্ব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল ব্রেক্সিটে তার অবস্থানের দরুণ। সেখানে সরকার দলীয় সংসদ সদস্যদের আস্থা ভোটে তাকে টিকে থাকতে হয়েছে। গণতান্ত্রিক চর্চা এতটা কার্যকর যে, প্রধানমন্ত্রীকে নিজ দলের আস্থা ভোটের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে।

পরিশেষে, এটা বলা চলে, সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ফলপ্রসূ করতে সত্যিকারের ভোটাধিকারের প্রায়োগিক দিক কার্যকর করতে এবং জনগণের দেয়া ট্যাক্সের টাকার সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে, শক্তিশালী বিরোধী দলের কোনো বিকল্প নেই। এজন্য বলা হয়-Absolute Power corrupts absolutel. বিরোধী দলবিহীন বা নামসর্বস্ব বিরোধীদল বা স্ট্রাটেজিক বিরোধী দল সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তারের বদলে সরকারের ইচ্ছে বাস্তবায়নের একটা হাতিয়ারে পরিণত হয়। জনগণের দায় থেকে যদি বিরোধীদল ভূমিকা না রেখে শুধু ক্ষমতার ভাগে অংশ নেয়ার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণে সহায়ক নয় এবং ক্ষমতার পালাবদলের হাওয়া পরিবর্তন এর সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টির জন্য খুব বেশি কার্যকর নয়। এজন্য জনগণের স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে একটি শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষই জনগণের মূল প্রতিনিধি হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি করা ক্ষমতা কাঠামোতে সংশ্লিষ্ট সবার গুরুত্বপূর্ণ দায় ও দায়িত্ব।

লেখক: কলামিস্ট

 

 

  

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত