পাল্টে গেছে অবসর বোর্ডের চিত্র

মহিউদ্দিন মাহী
| আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১২:৪৬ | প্রকাশিত : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৮:২৬

খুলনার একটি বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলের সহকারী শিক্ষক মফিজুর রহমান। অবসরে গেছেন ২০১২ সালে। পেনশনের জন্য ওই বছরের জানুয়ারিতে আবেদন করেন। ২০১৫ সালেও তিনি পেনশনের টাকা পাননি। টাকার অভাবে চিকিৎসাও করাতে পারেননি এই শিক্ষক। তৎকালীন সুবিধা বোর্ডের সদস্য সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেও কোনো কাজ হয়নি।

২০১৬ সালে ১৩ জানুয়ারি অবসর সুবিধা বোর্ডের সদস্য সচিবের দায়িত্ব পান অধ্যক্ষ শরীফ আহমেদ সাদী। এরপর ফেব্রুয়ারিতে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন মফিজুর রহমান। এক মাসের মধ্যে পেনশনের টাকার ব্যবস্থা করেন তিনি। নিজে ফোন করে পেনশনের টাকা মফিজুর রহমানের হাতে পৌঁছে দেন শরীফ আহমেদ।

মফিজুর রহমান ঢাকা টাইমসকে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘অবসরের টাকা পাওয়ার জন্য অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। টাকা না দিতে পেরে বছরের পর বছর আমার আবেদনপত্রের ফাইল চাপা পড়ে ছিল। তবে শরীফ আহমেদ সাদী দায়িত্ব নেওয়ার পর তার কাছে আসামাত্রই তিনি টাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। এ রকম শিক্ষকদরদি নেতা আমাদের দরকার।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৬ সালে শরীফ আহমেদ সাদী অবসর বোর্ডে যোগ দেওয়ার পর থেকেই এখানকার পুরনো চিত্র পাল্টাতে থাকে। দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা জঞ্জাল ঝেড়ে ফেলে নতুন আঙ্গিকে অবসর বোর্ডকে ঢেলে সাজান তিনি।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে শরীফ আহমেদ সাদীর সময়কালে। এই সময়ে আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে ৪১ হাজার ২০০। আর অর্থ বিতরণ করা হয়েছে দুই হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ অবসরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত যত টাকা বিতরণ করা হয়েছে তার তিন ভাগের দুই ভাগ টাকা বিতরণ করেছেন তিনি একাই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শরীফ আহমেদ সাদী ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমি চেষ্টা করেছি একজন শিক্ষকও যাতে বিনা কারণে ভোগান্তির স্বীকার না হয়। প্রত্যেকটি আবেদন সুচারুরূপে নিষ্পত্তি করেছি। কোনো ধরনের হয়রানি বা ভোগান্তি যেন না হয় সেটি আমি বোর্ডে নিশ্চিত করেছি। সরাসরি আমার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ রেখেছি, যাতে কেউ বিভ্রান্ত না হয়।’

অনলাইনে আবেদনে নেই ভোগান্তি

চাকরি জীবন থেকে অবসরে গেলে পেনশনের টাকার জন্য অবসর বোর্ডে আবেদন করতে হয় বেসরকারি স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের। কিন্তু এই বোর্ড সম্পর্কে শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। এখানে আবেদন নিয়ে এলে দালালদের খপ্পরে পড়তে হয় তাদের। যে টাকা একজন শিক্ষক অবসরে গেলে পান তার একটি বড় অংশ খরচ করতে হয় দালালদের পেছনে।

তবে অবসর বোর্ডের এই পুরনো চিত্র এখন আর নেই। আবেদনপত্র নিয়ে কাউকে আর বোর্ডের বারান্দায় বসে থাকতে হয় না। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে অবসর বোর্ডে আবেদন জমা দেওয়া, টাকা পাওয়া অর্থাৎ সব প্রক্রিয়ায় অনলাইন পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। ফলে এখন আর আবেদন হারিয়ে যাওয়া এবং দালালদের পেছনে ছোটার কোনো সুযোগ নেই।

অবসর বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অনলাইনে আবেদন করেছেন ২৭ হাজার ৬২১ জন শিক্ষক ও কর্মচারী। এসব আবেদনের অনুকূলে এক হাজার ১৮০ কোটি ২৭ লাখ ৬৭ হাজার ৩০০ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে সদস্য সচিব শরীফ বলেন, ‘অনলাইনে আবেদনের ব্যবস্থা করেছি গত বছর। এটির ফলে আর কোনো শিক্ষক-কর্মচারী ভোগান্তির মুখে পড়বে না। কারণ সেই সুযোগই থাকবে না।’

বোর্ডের মনোগ্রাম পাল্টানোর গল্প

২০০৩ সালে অবসর কল্যাণ বোর্ডের যাত্রা শুরু হয়। ২০০৫ সালে এই বোর্ডের মনোগ্রাম তৈরি করা হয়। একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের মনোগ্রামের আদলে এই মনোগ্রাম তৈরি করেন বোর্ডের তৎকালীন সহকারী পরিচালক আবু হানিফ। ২০১৬ সাল পর্যন্ত এই মনোগ্রামেই চলে অবসর সুবিধা বোর্ডের কার্যক্রম। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর যেসব সদস্য সচিব এই বোর্ডে ছিলেন তাদের কারও চোখে পড়েনি এটি।

২০১৬ সালের জানুয়ারিতে অধ্যক্ষ শরীফ আহমেদ সাদী এই বোর্ডের সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তার চোখে ধরা পড়ে বিষয়টি। তিনি পরীক্ষা করে দেখলেন এটি ছাত্রশিবিরের মনোগ্রামের আদলে গড়া। পাঁচ কোনা বিশিষ্ট মনোগ্রামের ভেতরে ছুরিসহ আরও কিছু চিহ্ন রয়েছে, যা অবসর বোর্ডের সঙ্গে যায় না।

পরে তিনি এই মনোগ্রাম পরিবর্তনের জন্য বোর্ড সভায় উত্থাপন করেন। ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ নতুন মনোগ্রাম বোর্ড সভায় পাস হয়। নতুন মনোগ্রামে প্রতীক হিসেবে রাখা হয় মুক্তিযুদ্ধের অর্জিত রক্তখচিত লাল-সবুজের পতাকার প্রতীকী রূপ, অবসরের সর্বজনীন প্রতীক চশমা ও পশ্চিমাকাশে ডুবন্ত সূর্য, সাঁঝের বেলায় নীড়ে ফেরা পাখি এবং শিক্ষার প্রতীক হিসেবে বই।

তার এই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে শরীফ আহমেদ সাদী বলেন, ‘অবসর বোর্ডে যোগ দেওয়ার পরই এই মনোগ্রামটি আমার চোখে পড়ে। এরপর এটি নিয়ে অনুসন্ধান চালালাম। পরে ধরা পড়ল বোর্ডে একসময় শিবিরের এক কর্মকর্তা ছিলেন, তিনি এই মনোগ্রাম করেছেন। এরপরই আমি ব্যবস্থা গ্রহণ করলাম।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত