চতুর কৌশলে ফতুর সাধারণ

কাজী রফিক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৬:২২ | প্রকাশিত : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০৮:২৭
ফাইল ছবি

রিকশায় করে দোকানের মালামাল নিয়ে যাচ্ছিলেন এক ব্যবসায়ী। কাকরাইল মোড়ে পার হওয়ার সময় লুঙ্গি পরা এক ব্যক্তি এসে ধাক্কা দেন। ব্যক্তির হাতে থাকা একটি থলে সড়কে পড়ে যায়। ওই ব্যবসায়ী সেটি তুলে দিতে গেলে বচসায় জড়ান ব্যবসায়ীর সঙ্গে। এরইমধ্যে মালামালসহ রিকশাটি গায়েব হয়ে যায়।

এদিক ওদিক খোঁজাখুঁজি করে রিকশাটির সন্ধান না পেয়ে আবু বক্কর নামের ওই ব্যবসায়ী আসেন পল্টন থানায়। অভিযোগ পেয়ে পুলিশ প্রতারকচক্রটির তিন সদস্যকে আটক করে। এমন অভিনব প্রতারণার কৌশলে ভাবিয়ে তুলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও।

অভিনব এই প্রতারণার ঘটনায় শেষ নয়। প্রায় প্রতিদিনই রাজধানীর পথেঘাটে হরেক রকমের প্রতারণার ঘটনা নতুন নয়। গোটা রাজধানীজুড়েই প্রতিদিন নানাভাবে প্রতারণার শিকার হয় সাধারণ মানুষ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় এসব প্রতারকচক্রের সদস্যরা ধরাও পড়ে। তবে পাল্টে যায় তাদের প্রতারণার ধরন। নিয়মিত অভিযানে প্রতারকচক্রের সদস্যদের আটকও করা হচ্ছে। তবে প্রতারণা কমার পরিবর্তে ধরন পাল্টে বরং বেড়েছে।

ঢাকা টাইমসের অনুসন্ধানে রাজধানীতে সক্রিয় এমন বেশ কয়েকটি প্রতারকচক্রের বিস্তারিত উঠে এসেছে। এলাকাভেদে একেক এলাকায় একেক ধরনের প্রতারকচক্র সক্রিয়। আর এসব চক্রের প্রতারণার শিকার হচ্ছে প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। কেউ কেউ হচ্ছেন একেবারে সর্বস্বান্ত।

সম্প্রতি সালাম পার্টি, গুলফাগিরি, পাউডার চক্র, তিন কার্ড, গায়ে ধাক্কা দিয়ে ঝামেলা তৈরি করাসহ এমন বেশ কিছু বিচিত্র পন্থায় রাজধানীতে প্রতারণা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতারকচক্রগুলো নিত্যনূতন কৌশল অবলম্বন করায় এ ধরনের ঘটনাগুলো প্রতারণার কিনা প্রাথমিকভাবে বুঝতেও বেগ পেতে হচ্ছে।

পাউডার চক্র

দুপুরে গার্মেন্ট থেকে খাবার খেতে বাসায় আসছিলেন রুনা। তাকে পেছন থেকে ডাক দিলেন এক নারী। বোরখা পরিহিত ওই নারী কথা বলতে চাইলেন রুনার সঙ্গে। বললেন, তিনি বিপদে আছেন।

রুনাও সরল মনে নারীর বিপদের কথা জানতে চাইলেন। ওই নারী জানালেন, তিনি একটি মিষ্টির কারখানায় কাজ করতেন। সেখানকার মালিক তার দিকে ভিন্ন চোখে তাকাত। একাধিকবার কুপ্রস্তাব দেয়ার পরও তিনি রাজি হননি। ফলে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এমনকি তাকে বেতনও দেননি। চাকরি ছেড়ে আসার সময় তিনি সেখান থেকে কেক তৈরির দামি পাউডার চুরি করে এনেছেন। যার বাজার মূল্য লাখ টাকার বেশি। এখন তিনি তা বিক্রি করতে চান।

নারীর আবেগমাখা কথায় গলে যান রুনা। সহযোগিতার আশ্বাস দেন। ওই নারী বলেন, তিনি কাউকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। রুনাকে দেখে তার বড় বোনের মতো মনে হয়েছে। তিনি যদি কম দামে হলেও সেই পাউডার কিনে নেন, তাহলে তিনি খুশি।

এক পর্যায়ে রুনা প্রায় ষাট হাজার টাকা সমমূল্যের স্বর্ণের কানের দুল ও চেইনের বদলে কিনে রাখেন সেই পাউডার। গহনা নিয়ে চলে যান ওই নারী। কথিত দামি পাউডার পাশের একটি বেকারি কারখানায় বিক্রির জন্য নিয়ে গেলে রুনা জানতে পারেন সেগুলো আসলে সুজি। কোনো কেক তৈরির পাউডার নয়।

ঘটনাটি গত ডিসেম্বরে রাজধানীর গাবতলী এলাকার। ঢাকা টাইমসের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একই প্রক্রিয়ায় নারী এবং পুরুষ উভয়ে বিভিন্ন জনের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে। এক্ষেত্রে প্রতারকরা নারীদের লক্ষ্য বানাচ্ছেন আর হাতিয়ে নিচ্ছেন স্বর্ণের গহনাসহ টাকাপয়সা।

গুলফাগিরি

কথিত পীর সেজে প্রতারণা করাকে প্রতারকদের ভাষায় বলা হয় ‘গুলফাগিরি’। পুরোনো হয়ে আসা এই প্রতারণার কৌশল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পাশাপাশি ঢাকার বাইরেও চলমান। তবে কৌশলের ধরনে পরিবর্তন এনেছে প্রতারকরা।

প্রায় ১০ বছর আগে রাজধানীতে গুলফাগিরি করতেন শফিক। তিনি রাজধানীর গাবতলী মাজার রোড এলাকার বাসিন্দা। বর্তমানে ভ্যানগাড়ি চালক। ঢাকা টাইমসের সঙ্গে আলাপকালে শফিক এই প্রতারকচক্রের বিষয়ে নানা তথ্য দেন।

রাজধানীর কুড়িল ফ্লাইওভার এলাকার একটি ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে শফিক জানান, তারা একটি গ্রুপে পাঁচজন থাকতেন। তাদের মধ্যে প্রধান একজন। যিনি পাগলের বেশভূষা ধারণ করে থাকে। বাকি চারজন তার চারপাশে ঘোরাফেরা করে।

পাগল সাজা ব্যক্তি পথচারীদের কাছে ভিক্ষা চাইবেন। এক্ষেত্রে পথচারী একা হলে তাকে উদ্দেশ করা হয়। যিনি ভিক্ষা দিবেন তার হাত থেকে ভিক্ষা নেয়ার সময় তার হাত চেপে ধরবেন। বলবেন, ‘অনেক পেরেশানি! যা চাস, পাস না। অনেক ইচ্ছাই অপূর্ণ। টাকা থাকে না। টাকা কই খরচ হয় জানোস না!’

এমন চটকদারি কথায় অন্যমনস্ক করে তোলা পথচারীকে নানা প্রলোভন দেখানো হয়। এক পর্যায়ে যখন পথচারীকে ওই প্রতারক সবকিছু বুঝাতে সমর্থ হন, তখন আসে দেনা-পাওনার বিষয়। তখন পাগল সাজা প্রতারক বলে, ‘আমি তো তোরে সব দিমু। আমি তো রাস্তার পাগল! আমারে কি দিবি?’ এ সময় পথচারীর কাছ থেকে কৌশলে টাকাপয়সা, মোবাইলফোনসহ নানা দামি জিনিসপত্র দিয়ে দেন।

শফিক জানান, টাকাপয়সা ও অন্যান্য জিনিসপত্র হাতে পাওয়ার পর পথচারীকে রাস্তার বিপরীত দিক থেকে ইট, পাথর বা অন্য কিছু দেখিয়ে তা নিয়ে আসতে বলা হয়। পথচারী রাস্তা পার হওয়ার সময় প্রতারকচক্রের একজন পাগলের বেশধারীকে পোশাক পরিবর্তনের সহযোগিতা করে। ১০ থেকে ১৫ সেকেন্ডের মধ্যে পোশাক পাল্টে যায়। ফলে পথচারী ফিরে এসে আর ওই প্রতারককে খুঁজে পান না।

শফিকের ভাষ্যমতে, গুলফাগিরিতে যুক্ত অনেকেই এখন এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। তবে অনেকেই এখনো এ পেশায় রয়ে গেছেন। যারা বিভিন্ন স্থানে একই প্রক্রিয়ায় এমন প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ বস করা তাবিজ ও নানা কিছু বিক্রি করে লোক ঠকাচ্ছে।

তিন কার্ড

রাস্তা দিয়ে চলার পথে অন্যমনষ্ক অবস্থায় নির্দিষ্ট এক বা একাধিক পথচারীর সঙ্গে ধাক্কা খাবে এক ব্যক্তি। ছাতা মাথায় ব্যক্তি বলছে, ‘আমার কথা শুনল না। পোলাডা গরিব, বুইঝা খেলা উচিত ছিল। কথাই শুনল না!’

ওই ব্যক্তির দৃষ্টি রাস্তার পাশে। সেখানে অপর এক ব্যক্তি তিনটি কার্ড নিয়ে জুয়ার আসর বসিয়েছেন। পাশে এক ব্যক্তি কান ধরে উঠবস করছে। আর বলছেন, ‘ভুল হইছে ভাই। আপনি আমার আব্বা। মাফ কইরা দেন। আমার টাকাগুলা দিয়া দেন। আমার ঘরভাড়ার টাকা।’

এখানে তিন কার্ড খেলার নিয়ম হচ্ছে, তিনটি কার্ডের মধ্যে একটি কার্ডের ভেতরের অংশে একটি ছবি রয়েছে, বাকি দুটি সাদা। যিনি জুয়াটি বসিয়েছেন তিনি দর্শকদের সামনে কার্ড তিনটি বারবার স্থানান্তর করবেন। এরপর নির্দিষ্ট একটি কার্ডের ওপর বাজি ধরার সুযোগ দেবেন। তিনটি কার্ডের মধ্যে কোন কার্ডে ছবি রয়েছে, তা শনাক্ত করতে পারলে বাজি ধরা টাকার পাঁচগুণ পাবে দর্শনার্থী।

বিষয়টি নিছক জুয়া মনে হলেও এটি আসলে জুয়া নয়। জুয়ার মাধ্যমে প্রতারণার ফাঁদ। চার থেকে পাঁচজন সদস্যের একটি চক্র এখানে প্রতারণার ফাঁদ পেতেছেন।

যিনি জুয়াটি বসিয়েছেন তিনি এ চক্রের প্রধান নন। ছাতা মাথায় ব্যক্তি, যিনি দর্শনার্থীদের নানা পরামর্শ দিচ্ছেন তিনিই প্রধান। আর কানধরে উঠবস করা ব্যক্তিও ওই চক্রেরই সদস্য। পাশে দাঁড়িয়ে লেখা দেখা এক বা দুজনও এই চক্রেরই সদস্য।

পথচারীদের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং তাদের খেলায় নিয়ে এসে সব কিছু লুটে নেয়াই এ চক্রের উদ্দেশ্য। রাজধানীর গাবতলী, বেড়িবাঁধ, উত্তরখান, দক্ষিণখান, বাড্ডা এলাকায় এই চক্রটিকে বেশি দেখা যায়।

গার্মেন্ট, নানা ধরনের শ্রমিক ও স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা এদের মূল লক্ষ্য। মাসের ৫ থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত বিভিন্ন গার্মেন্ট ও বাস টার্মিনাল এলাকায় এদের আনাগোনা বেশি থাকে।

রিকশায় প্রতারণা

রিকশাচালকের বেশে বর্তমানে রাজধানীতে সক্রিয় রয়েছে বেশ কিছু প্রতারকচক্র। চক্রের এক সদস্য রিকশাচালক সেজে বসে রাস্তার মোড়ে বা বিভিন্ন বড় অফিস, কারখানার সামনে বসে থাকেন। দামি জিনিসপত্রসহ কোনো যাত্রী দেখলে কম ভাড়ায় তাদের পরিবহন করেন এসব চালক।

যাত্রী নিয়ে কিছুদূর যাওয়ার পর বলেন, রিকশায় একটু সমস্যা হয়েছে, ‘আপনি একটু হেঁটে রাস্তাটা পার হন, আমি আসতেছি।’ অথবা, ‘রিকশায় মালামাল আছে। আপনারে দেখলে ট্রাফিক পুলিশ টাকা চাইব। আমি একা থাকলে বলব, রিকশার মালামাল। কম টাকা দিয়ে পারব।’

চালকের কথা শুনে যাত্রী রিকশা থেকে নেমে হাঁটা শুরু করলে কিছু দূর যেতেই রিকশা চালকের সঙ্গে যোগসাজশ থাকা চক্রের অপর এক সদস্য তাকে ধাক্কা দেয়। এ সময় চক্রের ওই সদস্যের হাত থেকে কিছু জিনিসপত্র পরে যায়। এ সময় দুজনের মধ্যে কথা বলাবলির মধ্যে রিকশা থেকে যাত্রীর দৃষ্টি সরে যায়। এই সুযোগে চালক রিকশা নিয়ে অন্য দিকে চলে যায়। সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের একাধিক ঘটনা ঘটেছে।

সালাম পার্টি

শিক্ষিত সমাজ বা বড় চাকরিজীবীদের বেশভূষা ধারণ করে ছিনতাই করে চলেছে একটি চক্র। এ চক্রের নাম সালাম পার্টি। এদের বাচনভঙ্গি বা চালচলনে রয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া। পথচারীদের চলাচলের সময় হঠাৎ সামনে হাজির হয়ে সালাম দেয় এই চক্রের সদস্যরা। যা অনেককে কৌতূহলী করে তোলে। আর সেই সুযোগে আশপাশ থেকে চক্রের আরও কয়েকজন সদস্য ওই পথচারীকে ঘিরে ফেলে। এ সময় কথা বলা ও দুষ্টুমির ছলে অস্ত্রের মুখে টাকাপয়সা ও মোবাইল ফোন নিয়ে নেয়া হয়।

এই চক্র ব্যাংক ও এটিএম বুথের পাশে অবস্থান নিয়ে থাকে। তারা লক্ষ্য রাখে কে বা কারা টাকা নিয়ে বের হচ্ছে। এরপর তাকে অনুসরণ করে এবং কিছুটা নির্জন জায়গার অপেক্ষায় থাকে। মাঝখানে যুক্ত হয় চক্রের অন্য সদস্যরাও। এরপর সুবিধামতো জায়গায় গিয়ে টাকা নিয়ে বের হওয়া ব্যক্তিকে সালাম দেয়। চক্রের সবাই মিলে তাকে ঘিরে ফেলে। কোট-প্যান্টের পকেটে কায়দা করে লুকিয়ে রাখা অস্ত্রের মুখে কথা বলার মধ্যেই পকেট থেকে টাকা-মোবাইল নিয়ে এরা সটকে পরে চক্রের সদস্যরা।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সিরিয়াস ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত উপ কমিশনার মাহমুদা আফরোজ লাকী ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘এ ধরনের অপরাধ ঢাকা শহরে আছে আমরা জানি। বিভিন্ন জনাকীর্ণ স্থানে এ ধরনের নানা ঘটনা ঘটে। আমরা এসব চক্রকে ধরতে নানা ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি। কখনো কখনো এসব চক্রকে ধরতে আমরা নিজেরাই ফাঁদ পাতি।’

র‌্যাব সদরদপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট গাউসুল আজম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘বিভিন্ন অপরাধ দমনে র‌্যাব নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে। এ সময় যদি কোনো প্রতারকচক্র পাওয়া যায় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়।

‘এ ছাড়া প্রতারকচক্রের প্রতি র‌্যাবের বিশেষ নজর রয়েছে। জনগণ রিপোর্ট টু র‌্যাব নামের অ্যাপের মাধ্যমে নিজের পরিচয় গোপন রেখে নানা অপরাধ এবং অপরাধীর তথ্য আমাদের জানাতে পারেন। এক্ষেত্রে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকি।’

(ঢাকাটাইমস/১২ফেব্রুয়ারি/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজধানী বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :