ফোন দেয়া মাত্রই বাসায় বাজার দিয়ে গেলো পুলিশ

আলাউদ্দিন আলিফ, বান্দরবান থেকে
 | প্রকাশিত : ০৫ এপ্রিল ২০২০, ২০:০৮

১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের জন্মদিন ছিল। কিছুদিন আগে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির নির্বাচনও শেষ হলো। দুইদিন ছুটি নিয়ে চলে এলাম পাহাড়ে। এ পাহাড় আমার জন্মস্থান। এখানেই আমার বাড়ি। বান্দরবানেই কেটেছে আমার শৈশব-কৈশোর। বাবা-মাও এখানে থাকেন।

নিজের গাড়িতে লং ড্রাইভ করে এসেছিলাম। ইচ্ছে ছিল শনিবার ঢাকায় ফিরে অফিস করবো। তখনো সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। দেখতে দেখতে পরিস্থিতি এমন কঠিন হলো যে এলাকা ছেড়ে যাওয়াটাই কঠিন হলো। অফিস বাসা থেকে কাজ করার সুযোগ দিচ্ছিল। তাই এখানেই কাটছে হোম কোয়েরেন্টেইনের দিনগুলো।

বাসায় পর্যাপ্ত বাজার ছিল। তাই টুকটাক জিনিস কেনা ছাড়া তেমন প্রয়োজনে আমরা কেউ বের হইনি। কিন্তু সময়টাতো আর কম নয়। প্রায় ১৫ দিন পর গতকাল বাজারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলো। আমি আবার অলস প্রকৃতির। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে বাজার করা আমার কাছে খুব বিরক্তিকর। তার উপর পাহাড় দিচ্ছে নীরবতার এক অদ্ভূত স্বাদ। কোন হৈ চৈ নেই। পর্যটকদের গাড়ির প্রতিযোগিতা নেই। শহরে কোলাহল নেই। এমন বান্দরবানের রুপ শেষ কবে দেখেছিলাম মনে নেই। গতকাল স্থানীয় সংবাদপত্র দৈনিক সচিত্র মৈত্রীতে দেখলাম বান্দরবান পুলিশ এ অঞ্চলের বসবাসকারী নাগরিকদের কোভিড-১৯ সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে বাসায় থাকতে উৎসাহ প্রদান করছেন। এমনকি বাসার বাজার, ঔষধ বা জরুরি কোন পণ্য লাগলেও তারা পৌঁছে দেয়ার জন্য কোন ফি না নিয়েই এই সেবা দেয়ার প্রচারণা চালিয়েছেন।

এসময় এমন একটা সেবা ঘরে থাকতে মানুষকে নিঃসন্দেহে উৎসাহিত করবে। আপনার প্রয়োজন পুলিশ মিটিয়ে দিলে অযথা কষ্টের দরকার কী?

‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’- বান্দরবানের বালাঘাটা পুলিশ লাইনে যাবার সময় এই লেখাটি সেই ছোটকাল থেকে দেখে এসেছি। এই লেখাটি বলা যতো সোজা মানুষকে বিশ্বাস করানো তত কঠিন। মা বাজারের কথা বলতেই বললাম, লিস্ট করে দাও। তোমার বাজার এবার পুলিশ করবে। আমার মা বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক বান্দরবান আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। হিসেবটা তার বরাবরই পাকা। তিনি বললেন, পুলিশ আনলেতো তোমার থেকে দ্বিগুণ চার্জ নিবে। বাবা বললেন, এতো খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি হবে। আমি বরং আমার লোককে দিয়ে বাজার করিয়ে দিবো। আমি বান্দরবান সদর থানার হটলাইন নাম্বারে ফোন করলাম। ওপাশ থেকে ফোন ধরলেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম চৌধুরী। বেশ বিনয়ের সঙ্গে বললেন, কী কী বাজার লাগবে তার নম্বরে ক্ষুদে বার্তায় পাঠিয়ে দিতে। তার টিম আমার সাথে যোগাযোগ করবে।

২০ মিনিট পরেই সহকারী উপ-পরিদর্শক মাজহারের ফোন। বললেন, আপনার দেয়া ফরমায়েশের ১ ও ২ নম্বর বাদ দিয়ে অন্যগুলো পাবেন। ঠিকানা নিশ্চিত করে ৩০-৩৫ মিনিটে আসার প্রতিশ্রুতি দিলেন। আমার বাজারের লিস্টে ছিল গরুর গোস্ত ১ কেজি, কলিজা ১ কেজি, কালো জিরা ৫০০ গ্রাম, লাল আটা প্যাকেট ২ কেজি, ১ টি কচি লাউ এবং দেশি টমেটো ১ কেজি। ২০ মিনিট পর এএসআই সাহেবের ফোন। বললেন, আপনার বাজার নিয়ে বাসার গেটে অপেক্ষা করছি। দয়া করে নিচ থেকে বাজারগুলো গ্রহণ করুন।

বাহ! বেশ তো! বাসার সামনে হওয়াতে গ্লাভস আর মাস্ক পড়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলাম না। মাজহার সাহেব বাজার বুঝিয়ে দিলেন। বাজারের রশিদও দিলেন। ১ হাজার টাকার নোট দিলেও বিরক্ত হননি। ২৮০ টাকা বাজারের খরচ রেখে ৭২০ টাকা ফিরিয়ে দিলেন।

যাওয়ার সময় সালাম দিয়ে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বিদায় নিলেন। না ভাই। ভুল পড়েন নি। যুক্তরাষ্ট্য বা যুক্তরাজ্যের পুলিশের কথা নয়। আমার দেশের পুলিশের কথাই বললাম।

বাসার বাজার করে দিতে পুলিশের গাড়ি এবং ৫ সদস্যের দল বাসার সামনে এসে যখন দাঁড়ালো তখন নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি মনে হচ্ছিল। পুলিশের এমন সেবা তাদের নিত্য নৈমিত্তিক কাজের মধ্যে না পরলেও দুর্যোগকালীন সময়ে বান্দরবানের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই প্রচেষ্টা সত্যিই প্রশংসনীয়। আমরাতো এমন পুলিশই দেখতে চাই, যাদের কাছে গেলে মানুষ আস্থা পাবে। সম্মান আর ভালোবাসা পাবে। একদিন উন্নত দেশের পুলিশরাও আমাদের অনুসরণ করবে। বান্দরবান পুলিশের নেয়া এই উদ্যোগকে আমি স্বাগত জানাই।

জরুরি বাজারের প্রয়োজনে অথবা ঔষধ কিনতে নির্ভয়ে পুলিশকে ফোন দিন। আপনার বাজার খুব দ্রুত পেয়ে যাবেন। আমি পৌঁছে দেয়ার খরচ না দিয়ে পুলিশের দ্রুত বাজার, ঔষধ এবং প্রয়োজনীয় পণ্যের সেবা গ্রহণ করছি। বান্দরবান সদর থানার অধিবাসী যদি আপনি হয়ে থাকেন, তবে এই সুবর্ণ সুযোগ নেয়ার সময় এখনি।

(ঢাকাটাইমস/৫এপ্রিল/এজেড)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :