কতটা চাপে ফ্রান্সের মুসলিমরা?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
 | প্রকাশিত : ০২ ডিসেম্বর ২০২০, ০৯:০১

ফ্রান্স সেদেশে ইমামদের 'প্রজাতন্ত্রের মূল্যবোধের সনদ' নামে নতুন এক সনদে স্বাক্ষর করার যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে তার বয়ান নিয়ে কথা বলতে ফ্রান্সের মুসলিম কাউন্সিলের প্রতিনিধিদের এ সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাকরোঁর সাথে বৈঠকে বসার কথা।

এই সনদে সই করার বিষয়টি ফ্রান্সের মুসলমানদের মধ্যে একটা বড় ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ফ্রান্সের বিশেষ করে উদার মানসিকতার ইমামরা এই সনদে স্বাক্ষর করার বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক চাপের মধ্যে রয়েছেন। দেশটির নয়টি পৃথক মুসলিম সংগঠনের জোট এই ফ্রেঞ্চ কাউন্সিল অব দ্য মুসলিম ফেইথ বা সিএফসিএম ইমামদের নিয়োগ এবং কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতে 'ন্যাশনাল কাউন্সিল অব ইমাম' নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সম্মত হয়েছে।

ফ্রান্সে এই সনদ নিয়ে বিতর্ক চললেও ফ্রান্সের সরকার এই সনদ কার্যকর করতে এবং ইমামদের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করতে যে বদ্ধপরিকর তার একটা প্রমাণ ফ্রান্সে পাকিস্তানের এক ইমামের সাম্প্রতিক কারাদণ্ড। প্যারিসের উত্তর শহরতলীর একজন পাকিস্তানি ইমাম লুকমান হায়দারকে দিনকয়েক আগে, ২৭শে নভেম্বর, ১৮ মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে টিকটক প্ল্যাটফর্মে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে উস্কানি দিয়ে ভিডিও বার্তা পোস্ট করার জন্য।

২০১৫ সালে ফ্রান্সে যাওয়া এই ইমামের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে, তিনি টিকটকে তিনটি ভিডিও বার্তা দিয়েছেন, যার প্রথমটিতে তিনি শার্লি এবদোতে ইসলামের নবীর কার্টুন ছাপা প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন, 'মুসলমানরা নবীর জন্য নিজেদের জীবন বলি দিতে প্রস্তুত'। দ্বিতীয়টিতে তিনি 'অমুসলিম এবং অবিশ্বাসীদের ওপর হামলার' কথা বলেন এবং বলেন 'তাদের স্থান দোজখে'। ২৫শে সেপ্টেম্বর পোস্ট করা শেষ ভিডিওতে তিনি পাকিস্তানি এক হামলাকারীর শার্লি এবেদোর সাবেক দপ্তরের বাইরে ছুরিকাঘাতে চার ব্যক্তিকে জখম করার 'সাহসিকতার' প্রশংসা করেন। ইমাম লুকমান হায়দারের সাজা খাটা শেষ হলে তাকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হবে।

ইমামদের যে 'প্রজাতন্ত্রের মূল্যবোধের সনদ' এ স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে, সেই সনদের বয়ানে থাকতে হবে যে, ফরাসী মূল্যবোধকে তারা স্বীকৃতি দেন, ইসলাম ধর্মকে রাজনৈতিক আন্দোলনের আদর্শ হিসাবে তারা প্রত্যাখান করেন এবং মুসলিম গোষ্ঠীগুলোতে বিদেশি হস্তক্ষেপও এই বয়ানে নিষিদ্ধ করতে হবে। এই সনদ নিয়ে কী ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে তা নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি।

'এই মূল্যবোধের সনদের সবকিছুর সাথে আমরা সকলে একমত নই,' বলেছেন ফ্রান্সের মুসলিম কাউন্সিল সিএফসিএম এর ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং প্যারিসের গ্র্যান্ড মসজিদের রেক্টর শেম্স এডিন হাফিজ। তবে তিনি বলছেন, 'ফ্রান্সে ইসলাম ধর্মের জন্য এটা একটা ঐতিহাসিক যুগ সন্ধিক্ষণ এবং মুসলিম হিসাবে আমরা একটা বড় দায়িত্বের মুখোমুখি'।

তিনি বলছেন আট বছর আগে তার চিন্তাভাবনা ছিল অন্যরকম। তিনি বিষয়টা দেখতেন ভিন্ন দৃষ্টিতে। তখন টলুসে এক হামলা চালিয়েছিল ইসলামপন্থী মোহাম্মদ মেরাহ। 'প্রেসিডেন্ট (সাবেক ফরাসি প্রেসিডেন্ট) সারকোজি এ নিয়ে কথা বলার জন্য ভোর পাঁচটায় আমার ঘুম ভাঙিয়েছিলেন,' তার মনে আছে। 'আমার মনে আছে আমি প্রেসিডেন্টকে বলেছিলাম: 'তার নাম মোহাম্মদ হতে পারে, কিন্তু সে একজন অপরাধী!' আমি অপরাধের সাথে আমার ধর্মকে জড়াতে চাইনি। কিন্তু আজ পরিস্থিতি বদলেছে। ফ্রান্সে ইমামদের সামনে বড় দায়িত্ব রয়েছে।'

ফরাসী সরকারের পরিকল্পনা হল সিএফসিএম-কে ফ্রান্সের ইমামদের একটি নথিভুক্ত রেজিস্টার তৈরি করতে হবে। এই তালিকাভুক্ত ইমামদের প্রত্যেককে এই সনদে স্বাক্ষর করতে হবে এবং সনদে সই করলে তবেই তারা ইমাম হিসাবে স্বীকৃতি এবং অনুমতিপত্র পাবেন। প্রেসিডেন্ট ম্যাকরোঁ অক্টোবর মাসে মুসলিম গোষ্ঠীগুলোর ওপর 'ব্যাপক চাপ প্রয়োগের' কথা বলেছেন। কিন্তু ফ্রান্সের জন্য কাজটা কঠিন। কারণ দেশটি নিজেদের 'ধর্মনিরপেক্ষ' বলে গর্ব করে থাকে।

ম্যাকরোঁ বলছেন তিনি রাজনৈতিক ইসলামের বিস্তার বন্ধের চেষ্টা করছেন। তিনি ধর্মপালনের ক্ষেত্রে কোনরকম হস্তক্ষেপ করতে চাইছেন না। তিনি এই ধরাণা দিতে চান না যে, তিনি কোন একটি বিশেষ ধর্মকে আলাদা করে দেখছেন। ফ্রান্সের মুসলিম গোষ্ঠীগুলোকে ফরাসী সমাজে সম্পৃক্ত করার, তাদের সমাজের অংশ করে নেবার জন্য সাম্প্রতিক কয়েক বছরে রাজনৈতিক অঙ্গনে চাপ বাড়ছে। ফ্রান্সে ইউরোপের সর্বাধিক সংখ্যক মুসলিমের বাস। দেশটিতে মুসলমান জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৫০ লক্ষ।

ফ্রান্সের মুসলিমদের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ অলিভিয়ের রয় বলছেন এই সনদের দুটি সমস্যা রয়েছে। এক হল বৈষম্য, কারণ এটি শুধু মুসলিমদের লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে। আর দ্বিতীয়টি ধর্মপালনের স্বাধীনতার অধিকার নিয়ে।

'আপনি যে দেশে আছেন সেদেশের আইন মানতে আপনি অবশ্যই বাধ্য,' তিনি বলেন, ''কিন্তু সেই দেশের মূল্যবোধ নিয়ে গর্ব করা আপনার জন্য বাধ্যতামূলক কেন করা হবে। আপনি সমকামী, উভলিঙ্গ অর্থাৎ এলজিবিটিদের বিরুদ্ধে বৈষম্য করতে পারেন না। কিন্তু ক্যাথলিক ধর্মের অনুসারীরা তো সমকামীদের বিয়ে অনুমোদন করে না।'

ফ্যাশান ডিজাইনার ইমান মেসতাউই বলছেন তার ভাষায় যাকে তাকে 'ঘৃণার চোখে দেখেন' তাদের কাছ থেকে তিনি নিয়মিত নানাভাবে হয়রানির শিকার হন। এরা হলেন কট্টরপন্থী কিছু মুসলমান যারা তার স্কার্ফ বা ওড়নার ডিজাইন নিয়ে সমালোচনা করেন - তারা বলেন তার ডিজাইন করা স্কার্ফ নারীর চুল পুরোপুরি ঢাকে না।

কিন্তু তিনিও মনে করছেন, 'ফরাসী মূল্যবোধে'র সনদে ইমামদের স্বাক্ষর করার ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। ফ্রান্সে অনেকেই মুসলিমদের পুরোপুরি ফরাসী হিসাবে মেনে নিতে চায় না।

'দাবিটা খুবই অদ্ভুত। আপনাকে দেখাতে হবে আপনি প্রজাতন্ত্রের মূল্যবোধের সাথে একমত, আপনি নিজেকে দেশটিতে একজন ফরাসি বলে ভাবুন, যেখানে কিন্তু ফরাসিরা আপনাকে ফরাসি বলে মনে করবে না,' তিনি ব্যাখ্যা করলেন।

'আমরা এ দেশে যাই করি না কেন- কর দেয়া থেকে শুরু করে সেনা বাহিনীতে অংশ নেয়া - কখনই কিন্তু সেটা যথেষ্ট মনে করা হবে না। আপনাকে প্রমাণ করতে হবে আপনি সত্যিকার অর্থে ফরাসী: আপনাকে শূকরের মাংস খেতে হবে, মদ পান করতে হবে, হিজাব পরতে পারবেন না, উরুর ওপর স্কার্ট পরতে হবে। এটা রীতিমত হাস্যকর।'

ঢাকা টাইমস/০২ডিসেম্বর/একে

সংবাদটি শেয়ার করুন

আন্তর্জাতিক বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :