উচ্ছেদে কার লাভ কার ক্ষতি?

কাজী রফিক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২১, ১৬:০৪ | প্রকাশিত : ০৭ মার্চ ২০২১, ১৫:৪১

সড়ক ও ফুটপাতে অবৈধ দখল উচ্ছেদে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযানে থামানো যাচ্ছে না অবৈধ দখল। তবে উচ্ছেদে অনেক দোকানির মালামাল নষ্ট হয়। অভিযান পরিচালনায় করপোরেশনের পকেট থেকে বের হয়ে যাচ্ছে অনেক অর্থ। বিপরীতে ফলাফল শূন্য। তাহলে এসব অভিযানের লাভটা কী? নগর কর্তৃপক্ষ বলছে, লাভ-ক্ষতির বিচার করবে জনগণ। সরকারের কোনো খরচই লোকসান নয়।

গত ১৩ জানুয়ারি রাজধানীর আগারগাঁও এলাকায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান চালায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। অভিযানে শিশুমেলা, শিশু হাসপাতাল ও জাতীয় অর্থপেডিকস হাসপাতালের সামনের সড়ক ও ফুটপাত দখল করে গড়ে তোলা ২৫টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। অভিযানের এক মাসের মধ্যে আবার পুরোপুরি দখলে চলে গেছে এখানকার সড়ক ও ফুটপাত।

স¤প্রতি উচ্ছেদস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, আগের মতোই দখলদারি জমে উঠেছে জায়গাটি। ফুটপাতে পণ্যের পসরা সাজিয়ে চলছে ব্যবসা। আর চলার পথ না পেয়ে ফুটপাত ছেড়ে সড়কে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন পথচারী এবং হাসপাতালে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা।

২০২০ সালে করোনাভাইরাসের প্রকোপের জন্য এ এলাকায় উচ্ছেদ পরিচালনা করা হয়নি। কিন্তু আগের বছর ২০১৯ সালে পাঁচবার একই জায়গায় উচ্ছেদ চালায় উত্তর সিটি।

শুরু আগারগাঁও নয়। উত্তরের সিটির অধিভুক্ত মোহাম্মদপুর এলাকার রিংরোডে প্রতিদিন বিকেলের পর সড়ক দখল করে বসানো হয় শতাধিক অবৈধ দোকান। বসিলা নতুন রাস্তায় একইভাবে বসছে আরও দেড় শতাধিক দোকান। মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর, মিরপুর ১, ২, ১২ ও ১৪ নম্বর এলাকায় এ ধরনের অবৈধ দোকানের সংখ্যা হাজারের বেশি। এগুলো কেবল জনগণের চলার পথেই বাধা নয়, বরং সড়কের যান চলাচলেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। সূত্র জানায়, এসব অবৈধ দোকানের অলিখিত অনুমোদন দিচ্ছে স্থানীয় নেতা ও জনপ্রতিনিধিরা।

স্থানভেদে দোকান বসানোর অনুমতি হিসেবে এককালীন এক থেকে পাঁচ হাজার টাকা নেয়া হচ্ছে। আর দৈনিক ১০০ থেকে ৩০০ টাকা করে চাঁদা তোলা হয় এসব দোকান থেকে। উচ্ছেদ, আবার দখল। এ যেন চোর-পুলিশ খেলা। জানতে চাইলে উত্তর সিটির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আজ উচ্ছেদ করলে দুই দিন, তিন দিন পর আবার বসে যায়। ক্রমাগতভাবে চলছেই। এখানে অস্বীকার করার কিছু নাই যে, একই জায়গা দুবার, তিনবার উচ্ছেদ করা হয়।

উচ্ছেদ কার্যক্রম থেকে শতভাগ ফল পেতে জনগণকে সম্পৃক্ত হতে হবে বলে মনে করছেন এই নগর কর্মকর্তা। বলেন, ‘এখানে যারা সুবিধাভোগী আছেন, চাকরিজীবী, স্থানীয় মানুষ- সবার মিলিত প্রয়াস যতক্ষণ না হবে, ততক্ষণে এটা শতভাগ বাস্তবায়ন হবে না। প্রতিদিন আমাদের টিম বের হচ্ছে। জনসম্পৃক্ততা যদি না হয়, তাহলে শতভাগ ফল আমরা পাব না। তবে দিন দিন সবকিছুর উন্নতি হচ্ছে, আস্তে আস্তে আরও হবে।’

উচ্ছেদের পেছনে সিটি করপোরেশনের ব্যয় হচ্ছে। অথচ তার ফলাফল দৃশ্যমান নয়। তাহলে উচ্ছেদের পেছনে করপোরেশনের খরচকে লোকসানের খাতায় ধরা হচ্ছে কি না জানতে চাইলে মোজাম্মেল হক বলেন, ‘রাষ্ট্রের সব কাজ লাভের, সব কাজ লোকসানের। জনগণের জন্য কাজ করছেন, এখানে লাভ-লসের কোনো প্রশ্ন নেই। মানুষের জীবনযাত্রার জন্য সরকার অনেক লোকসান দিচ্ছে। অনেক কলকারখানা সরকার লোকসান দিয়ে চালু রাখে কেন? জনগণের জন্য। রাষ্ট্রের সব কাজই জনগণের লাভের জন্যই করা হয়। ফাইনালি লাভই হবে।’

দক্ষিণ সিটিতেও অবৈধ দখলের কমতি নেই। করপোরেশনের অধিভুক্ত ধানমন্ডি সাত মসজিদ সড়কের দুই পাশ মিলিয়ে পাঁচ শতাধিক অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। নিউমার্কেটের ফুটপাত দখল করে প্রতিদিনই বসছে ব্যবসায়ীরা। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে সড়ক ও ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনার পরিমাণ শতাধিক। গত তিন মাসে বেশ কয়েকবার উচ্ছেদ করেও জায়গাটি দখলমুক্ত রাখতে পারেনি নগর কর্তৃপক্ষ। একই অবস্থা শাহবাগ মোড় এলাকায়। অবৈধ দখলের রাজত্ব হয়ে উঠেছে জাতীয় প্রেসক্লাব এলাকার ফুটপাত, পল্টন মোড়, গুলিস্তান দক্ষিণ সিটি নগর ভবনের বিপরীতের ফুটপাত, ফুলবাড়িয়া মোড়সহ আশপাশের এলাকা।

এসব এলাকার ফুটপাত ও দখলমুক্ত রাখতে দক্ষিণ সিটির উচ্ছেদ অভিযানও নিয়মিত। কিন্তু উচ্ছেদের পর ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই আবার দখল হয়ে যাচ্ছে জায়গাগুলো। দক্ষিণ সিটির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা রাসেল সাবরিন জানান, উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু উচ্ছেদের পর সার্বক্ষণিক পাহারা দেওয়া তাদের জন্য কঠিন। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিনিয়ত অভিযান পরিচালনা করছি। ব্যবস্থা নিচ্ছি। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক পাহারা দেওয়া কঠিন।’

রাসেল সাবরিন বলেন, ‘উচ্ছেদে খরচ হচ্ছে, যাদের মালামাল জব্দ করা হচ্ছে, তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা যখনই উচ্ছেদ করি, পরবর্তী একটা নির্দেশনা থাকে আমাদের সকলের প্রতি এই জায়গাটি যেন পুনরায় বেদখল না হতে পারে, আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।’ উচ্ছেদে কার লাভ হচ্ছে, কার ক্ষতি হচ্ছে? এমন প্রশ্নের জবাবে রাসেল সাবরিন বলেন, ‘উচ্ছেদে লাভ বলতে, জনদুর্ভোগ লাঘবের জন্য উচ্ছেদ। ফুটপাত যদি সম্পূর্ণটাই মানুষ দখল করে ফেলে তাহলে হাঁটার জায়গা তো থাকবে না। তাই জনস্বার্থে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। উচ্ছেদে কম খরচ হয় না। প্রতি অভিযানে আমাদের গাড়ি লাগছে, লোকজন লাগছে, লজিস্টিক লাগছে... এগুলো ব্যয় হচ্ছে। এটা লাভজনক চিন্তা করে তো অভিযান করি না। এটা তো জনস্বার্থে অভিযান করা। সিটি করপোরেশনের উদ্দেশ্য তো এখান থেকে লাভ করা না, মানুষের জনদুর্ভোগ লাঘব করা। লাভ হচ্ছে কি ক্ষতি হচ্ছে এর বিচার জনগণ করবে। আমরা অভিযান করছি আমি এটাই বলতে পারব।’

উচ্ছেদের স্থায়ী সমাধান চায় খোদ সিটি করপোরেশন। এ বিষয়ে একটি প্রস্তাবও এরই মধ্যে করা হয়েছে জানিয়ে দক্ষিণ সিটির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা বলেন, ‘স্থায়ী ব্যবস্থার জন্য আমরা প্রস্তাব দিয়েছি। পুলিশ, স্থানীয় কাউন্সিলরসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে একটি কমিটির প্রস্তাব আমরা মেয়র মহোদয়কে দিয়েছি। সেটি হয়ে গেলে পুনর্দখল বন্ধ হবে।’

(ঢাকাটাইমস/০৬মার্চ/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :