বিতর্কিত নিয়োগ দিয়েই ক্যাম্পাস ছাড়লেন রাবি ভিসি

ব্যুরো প্রধান, রাজশাহী
 | প্রকাশিত : ০৬ মে ২০২১, ২০:৫৭

শেষ কর্মদিবসের আগের দিন বিতর্কিত এডহক নিয়োগে শতাধিক ব্যক্তিকে চাকরি দিয়ে পুলিশি পাহারায় ক্যাম্পাস ছাড়লেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) প্রফেসর ড. এম আবদুস সোবহান। এ নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। নিয়োগের ঘটনা তদন্তে ইতোমধ্যে চার সদস্যের কমিটি গঠন করেছে শিক্ষামন্ত্রণালয়।

বৃহস্পতিবার (৬ মে) দুপুরে পুলিশ পাহারায় ক্যাম্পাস ছাড়েন ভিসি। এ দিনই ছিল তার শেষ কর্মদিবস।

এর আগে বুধবার (৫ মে) ভিসি অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান এডহকে নিয়োগের তালিকায় সই করেন। যা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। নিয়োগপ্রাপ্তদের সংখ্যাটা ১২৫ হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে ৮৫ জনের নামের তালিকা প্রকাশ হয়েছে।

ভিসি চলে যাওয়ার পরই নিয়োগপ্রাপ্তরা যোগদান করেন। প্রশাসন ভবনে তাদের কাগজপত্র নিয়ে ছোটাছুটি করতে দেখা যায়। নিয়োগ পাওয়া অধিকাংশই সাবেক ও বর্তমান ছাত্রলীগের নেতাকর্মী বলে জানা গেছে।

অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান ২০১৭ সালে ৭ মে উপাচার্য হিসাবে চার বছের জন্য নিয়োগ পান। নিয়োগযোগ্যতা শিথিল করে মেয়ে ও জামাতাকে নিয়োগ, বক্তব্যে জয়হিন্দ বলাসহ নানা বিতর্কিত কাজের জন্য মেয়াদের বেশিরভাগ সময় ছিলেন আলোচনায়। সর্বশেষ বিতর্কিত এডহক নিয়োগের ফলে ক্যাম্পাসে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ১০ ডিসেম্বর শিক্ষামন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব নিলীমা আফরোজ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে রাবিতে সকল ধরনের নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। কিন্তু তারপরও ভিসি এডহকে নিয়োগ দিয়ে গেলেন। অভিযোগ রয়েছে, এই নিয়োগের জন্য আগে মোটা অঙ্কের উৎকোচ নেয়া হয়েছে।

এদিকে ভিসির বিদায়ের দিনে সকাল থেকে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। বিদায়কে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার ভোর থেকে তার বাসভবনের আশেপাশে অবস্থান নেন চাকরিপ্রত্যাশী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপচার্যের বাসভবনের পাশে চাকরিপ্রত্যাশীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। সকাল নয়টার দিকে বাসভবনের পাশে অবস্থান নেন দুর্নীতি বিরোধী শিক্ষকরা। অপরদিকে দশটার দিকে ক্যাম্পাসে শো-ডাউন দেয় মহানগর ছাত্রলীগের শতাধিক নেতাকর্মী।

বিতর্কিত এই নিয়োগকে ঘিরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ নজরুল প্রশাসন ভবনে তালা লাগানো হয়। সকাল দশটার দিকে প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের দুর্নীতির বিরুদ্ধে শিক্ষকবৃন্দ ব্যানারে আন্দোলনরত শিক্ষকরা প্রশাসন ভবনে আসেন। বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের বের করে দেন। পরবর্তীতে প্রশাসন ভবনের গেইটের গার্ডকে তালা দিয়ে সেখান থেকে চলে যেতে বলেন।

সকাল থেকে ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ে উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান এডহক নিয়োগ দিয়েছেন। এতে রেজিস্ট্রার আব্দুস সালাম স্বাক্ষর করতে রাজি না হওয়ায় তাকে অব্যহতি দেয়া হয় এবং সহকারী-রেজিস্ট্রার মামুনকে রেজিস্ট্রার হিসাবে দায়িত্ব দেয়া হয়। দুপুর সাড়ে ১২টায় উপাচার্যের বাসভবন থেকে সহকারী রেজিস্ট্রার মামুন-উর-রশিদ এবং রেজিস্ট্রার দপ্তরের সহকারী রেজিস্ট্রার তরিকুল আলম বেরিয়ে আসেন।

এ সময় মহানগর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা প্যারিস রোডেই মামুন-অর-রশীদকে ঘিরে ধরেন। তাকে মারধর শুরু করলে হবিবুর রহমান হলের সেকশন অফিসার আব্দুল্লাহ আল মাসুদ এগিয়ে যান। মহানগর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মাসুদকে মারধর করে তার জামা ছিড়ে ফেলেন। এসময় শরীরচর্চা শিক্ষা বিভাগের সহকারী পরিচালক কামরুজ্জামান চঞ্চলও তাদের মারধরের শিকার হন। এরপর সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিপ্রত্যাশী ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান নেতাকর্মীরাও এগিয়ে গেলে দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। সেখানে পুলিশ ও ডিবির সদস্যরা লাঠিপেটা করে মহানগর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সরিয়ে দেয়ার চেষ্টার করেন। শেষপর্যন্ত মহানগর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মমতাজউদ্দিন কলা ভবনের সামনে দিয়ে দৌড়ে ও মোটরসাইকেলে নিয়ে পালিয়ে যান।

সংঘর্ষের বিষয়ে জানতে চাইলে মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিরাজুম মুবিন সবুজ বলেন, রোজার দিন আমাদের কোনো কাজ ছিলো না, তাই ক্যাম্পাসে গিয়েছিলাম ঘুরতে। সেখানে দেখি মারপিট লেগে গেল। রাবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি গোলাম কিবরিয়া বলেন, ক্যাম্পাসে চাকরি প্রত্যাশী ও মহানগর ছাত্রলীগের মধ্যে গেঞ্জাম হয়েছে। এর সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মতিহার থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিদ্দিকুর রহমান মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, আমরা এখন ব্যস্ত। সামগ্রিক বিষয়ে জেনে ডিসক্লোজ করা হবে। সার্বিক বিষয়ে প্রক্টর অধ্যাপক লুৎফর রহমানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

অব্যাহতির বিষয়ে রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আব্দুস সালাম বলেন, গতকাল সকালে উপাচার্য মহোদয় আমাকে ফোন করে বলেন তিনি গাড়ি পাঠাচ্ছেন আমি যেন আসি। বিষয়টি আমার কাছে সন্দেহজনক মনে হয় কারণ আমার কাছে গাড়ি আছে। তখন আমি খবর নিয়ে জানতে পারি এডহক নিয়োগের জন্য আমাকে ডাকা হচ্ছে। তখন আমি ফোন অফ করো অন্যত্র চলে যাই। গাড়ি এসে ফিরে যায়।

তিনি আরও বলেন, উপাচার্যের সঙ্গে আমার আগেও কথা হয়েছিল। তখনও আমি বলেছি- এটা সম্ভব নয়। কারণ নিয়োগ বন্ধের সরকারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অফিসে না যাওয়ায় তাকে অব্যহতি দেওয়া হয়েছে কি না সেটি অবগত নয় বলে জানান অধ্যাপক আব্দুস সালাম।

উপাচার্যের ক্যাম্পাস

দুপুর আড়াইটার দিকে পুলিশ পাহারায় ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন উপাচার্য। এসম সাংবাদিকরা নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন পরে জানতে পারবেন। ক্যাম্পাস ত্যাগ করার পরপরই এডহকে নিয়োগ পাওয়া ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা উপাচার্যের বাসভবনে গিয়ে যোগদান করেন।

এডহকে কতজনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কেউ এ নিয়ে মুখ খুলছেন না। তবে চাকরি পাওয়া একাধিক সদস্য জানান, নিয়োগ পাওয়া সংখ্যা ১৪০-১৪৫। এছাড়া তাদের নিয়োগপত্রে ০৫ উল্লেখ করা হয়েছে। নিয়োগপত্রে ডেপুটি রেজিস্ট্রার ইউসুফ আলী স্বাক্ষর রয়েছে বলেও জানান।

অধ্যাপক আবদুস সোবহান শিক্ষকতা পেশা থেকে আগেই অবসর নেন। তবে দ্বিতীয়বারের মতো তিনি ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান ২০১৭ সালে। এর আগে ২০০৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি প্রথম মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ভিসির বিরুদ্ধে একের পর এক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। তিনি সবচেয়ে বিতর্কিত হন শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা পরিবর্তন করে। গত বছরের ৪ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনিয়ম ও দুর্নীতির ৩০০ পৃষ্ঠার একটি অভিযোগপত্র প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসিতে জমা দেন শিক্ষকদের একাংশ। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তদন্তে নামে ইউজিসি। তদন্ত শেষে ২৫টি অভিযোগের প্রমাণ পায় ইউজিসি। পরে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশসহ মোট ৭৩৬ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় ইউজিসির তদন্ত কমিটি। ক্যাম্পাসে তার বিরুদ্ধে সব সময় সক্রিয় ছিলেন শিক্ষক সমিতি ও দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষকেরা।

বিদায়বেলায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য এডহক নিয়োগের ফলে ক্যাম্পাসের স্থিতিশীল পরিবেশ বিনষ্ট হবে বলে মনে করছেন বিশ্ববদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপকরা। তারা বলছেন, এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। পাশাপাশি সরকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করা হলো।

দুর্নীতি বিরোধী শিক্ষকদের মুখপাত্র অধ্যাপক সুলতান উল ইসলাম টিপু বলেন, এ নিয়োগের ফলে পরবর্তীতে যে প্রশাসন আসবে তাকে এর মাশুল দিতে হবে। ইউজিসি যদি এডহকের বেতন দিতে অস্বীকৃতি জানায় তখন ক্যাম্পাসে একটা অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হবে। শিক্ষক সমিতির সাধা অধ্যাপক আশরাফুল আলম খান বলেন, এ নিয়োগের ফলে আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছ। এছাড়া পরবর্তী ভিসি যিনি হবেন তার জন্য চ্যালেঞ্জি হবে। কারণ এতোগুলো লোকের বেতান ভাতা, চাকরি স্থায়িকরণে চাপ। এই নিয়োগ লজ্জাজনক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

এদিকে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এই নিয়োগের ঘটনা তদন্ত চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে শিক্ষামন্ত্রণালয়। কমিটির সদস্যরা হলেন- ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক মুহাম্মাদ আলমগীর আহ্বায়ক এবং ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক জামিনুর রহমানকে সদস্য সচিব করা হয়। এছাড়া কমিটিতে সদস্য হিসাবে আছেন, ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক আবু তাহের, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচীব মো. জাকির হোসেন আখন্দ।

বৃহস্পতিবার বিকালে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব শামীমা বেগম স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

ঢাকাটাইমস/০৬মে/ইএস

সংবাদটি শেয়ার করুন

শিক্ষা বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :