প্রভাবশালীদের চাপে ব্যাংকিং খাত

মোয়াজ্জেম হোসেন, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ৩০ নভেম্বর ২০২২, ২২:২৫

নানামুখী চাপে রয়েছে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাত। খেলাপি ঋণ, মন্দ ঋণ, তারল্য ব্যবস্থাপনা, বড় খেলাপিদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ে মন্থর গতি, ব্যাংক খাতে দুর্নীতি, ব্যাংকগুলোর মুনাফা, সম্পদ ও ক্যাশ-ফ্লোতে অবনতিসহ বিভিন্ন কারণে এই চাপ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সময় শেষ হলেই পুরনো খেলাপি ঋণগুলো মন্দ মানের ঋণে পরিণত হচ্ছে। ঋণগুলো দেওয়ার সময় যথাযথ নিয়ম মেনে দেওয়া হয়নি। কিছু ব্যাংকের মালিকরা নিজেদের মতো পরিচালনা পর্ষদ ঘটন করে। এছাড়া ঋণ নিয়ে টাকা বিদেশে পাচার করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্টের সবশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন মাস শেষে ব্যাংকগুলোতে মোট খেলাপি ঋণ ১ লাখ ২৫ হাজার ২৭৫ কোটি টাকার মধ্যে মন্দ ঋণের পরিমাণ গিয়ে ঠেকেছে ১ লাখ ১২ হাজার ২১৯ কোটি টাকা। এতে দেখা যায়, মোট খেলাপি ঋণের মধ্যে ৮৯ দশমিক ৬ শতাংশ মন্দ ঋণ।

এছাড়া জুনের পরের তিন মাসে আরো ৯ হাজার কোটি টাকা বেড়ে গত সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকায়। এসময়ে মোট ঋণের মধ্যে খেলাপির অংশ বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এছাড়া গত এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি হওয়া ঋণের মধ্যে আদায় অযোগ্য ঋণ বেড়েছে ২৪ হাজার কোটি টাকা বা ২৭ দশমিক ২৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ শ্রেণিকরণের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ঋণ খেলাপি হওয়ার পর আদায় অযোগ্যের ‘পুরো লক্ষণ’ দেখা দিলে তাকে মন্দ মানের ঋণ হিসেবে ধরা হয়।

২০২১ সালের ৩ জানুয়ারি সোনালী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ন্যাশনাল ফিন্যান্স লিমিটেড, প্রিমিয়াম লিজিং এন্ড ফিন্যান্স লিমিটেড, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান-এর খেলাপি ঋণের আর্থিক অনিয়ম যাচাই বাছাইয়ে সংসদীয় কমিটি একটি সাব কমিটি গঠন করে।

অনুমিত হিসাব সংক্রান্ত সংসদীয় এ কমিটি জানিয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ব সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অবস্থা যথেষ্ট উদ্বেগজনক।

এক প্রতিবেদন কমিটি আরো জানায়, ‘ব্যাংকের অনেক গ্রাহককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকগুলোর ক্ষেত্রে ঋণের বিপরীতে জামানত নেই। ব্যাংকটির বড় খেলাপিদের থেকে বার্ষিক আদায়ের হার এক শতাংশেরও কম।

এদিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রায় অর্ধেক ব্যাংকের চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) আর্থিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। এছাড়া গত বছরের তুলনায় মুনাফা কমেছে ১৫টি ব্যাংকের। এর মধ্যে দুটি ব্যাংক লোকসানে রয়েছে। ১৯টি ব্যাংকের ক্যাশ-ফ্লো ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে। সম্পদমূল্য কমে গেছে ৭টি ব্যাংকের। এর মধ্যে মুনাফা, সম্পদ এবং ক্যাশ-ফ্লো, তিন সূচকেই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে চারটি ব্যাংকের। তিন সূচকের মধ্যে দুই সূচকে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ৭টির।

এছাড়া আইসিবি ইসলামী ব্যাংক চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের ব্যবসায় মুনাফার দেখা পেলেও, নয় মাসের হিসাবে আবার লোকসানের খাতায় নাম লিখিয়েছে। লোকসানের পাশাপাশি ব্যাংকটির সম্পদমূল্য এখনো ঋণাত্মক অবস্থায়। ন্যাশনাল ব্যাংক চলতি বছরের নয় মাসে শেয়ারপ্রতি লোকসান করেছে ১ টাকা ১১ পয়সা। গত বছরের একই সময়ে শেয়ারপ্রতি ৪২ পয়সা মুনাফা হয়। ব্যাংকটির সম্পদের পরিমাণও কমেছে।

অপরদিকে জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে মুনাফা, সম্পদমূল্য এবং ক্যাশ-ফ্লো, তিন সূচকেই ঋণাত্মক প্রভাব পড়েছে রূপালী ব্যাংক এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের। পাশাপাশি এবি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং উত্তরা ব্যাংকের মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হলেও ক্যাশ-ফ্লো রয়েছে ঋণাত্মক অবস্থায়। ক্যাশ-ফ্লো ঋণাত্মক হওয়ার অর্থ নগদ অর্থের সংকট দেখা দেওয়া।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সময় শেষ হলেই পুরনো খেলাপি ঋণগুলো মন্দ মানের ঋণে পরিণত হচ্ছে। এর মধ্যে আবার নতুন খেলাপি যুক্ত হচ্ছে। ফলে দেখা যায় খেলাপি ঋণের পুরো অংকটা অনাদায়ী থেকে যাচ্ছে।’

অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বলেন, মন্দ ঋণ বাড়তে থাকায় ব্যাংকের মুনাফা ও তারল্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। ঋণগুলো দেওয়ার সময়েই যথাযথ নিয়ম মেনে দেওয়া হয়নি। ঋণ নিয়ে টাকা বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। অনেকে ঋণ খেলাপি করাটাকে সংস্কৃতিতে পরিণত করেছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যাংকের কিছু অসাধু লোক এর মধ্যে যোগসাজসে থাকে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

তিনি বলেন, সুদের হার ৬-৯ শতাংশ বেঁধে দেওয়ার কারণে ব্যাংক খাতের অনেক ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়েছে। আমার মতে এটি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। সুদের হার বেঁধে দেওয়ার কারণে একদিকে ব্যাংকের মুনাফার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে ক্যাশ-ফ্লোতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

‘কিছু ব্যাংকের মালিকরা নিজেদের মত পরিচালনা পর্ষদ ঘটন করে। পরে তাদের আদেশ বাস্তবায়ন করে। বাংলাদেশ ব্যাংককে মেরুদন্ড আরও শক্ত করে অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’-যোগ করেন আবু আহমেদ।

(ঢাকাটাইমস/৩০নভেম্বর/আরকেএইচ/এমএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

অর্থনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :