উচ্চ মাত্রার ভূমিকম্প মোকাবিলায় প্রস্তুত হচ্ছে দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
  প্রকাশিত : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৯:৫৮| আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১১:২৪
অ- অ+

ভূমিকম্প ঝুঁকি নিরূপণে দেশের ১০টি ঝূঁকিপূর্ণ শহরে কাজ করার কথা জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। যদি উচ্চ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়, তা সামাল দেওয়ার প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, ‘ভূমিকম্প ঝুঁকি নিরূপণ করতে ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেটসহ দশটি শহরের ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। সে অনুযায়ী কাজ চলছে।’

এদিকে তুরস্ক ও সিরিয়ার মতো শক্তিশালী ভূমিকম্প ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা শহরে অনুভূত হলে কী হতে পারে- তা চিন্তা করতেই শিহরে ওঠার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। যদি রিখটার স্কেলে ৭ বা ৮ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয় তাহলে রাজধানীর অধিকাংশ ভবন ধসে পড়বে বলে মনে করছেন তারা। তবে ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা বলছেন, ভূমিকম্পসহ যেকোনো ধরনের দুর্যোগ পরবর্তী উদ্ধার অভিযানে প্রস্তুত তারা।’

২০১৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগ এবং কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ল্যামন্ট-ডোহার্টি আর্থ অবজারভেটরি সেন্টার পরিচালিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমিকম্পের ঝুঁকি রয়েছে বাংলাদেশেও। মাটির নিচে ভারতীয়, ইউরেশিয়ান ও মিয়ানমার প্লেটের সংযোগস্থলের ওপর বাংলাদেশের অবস্থান। এ কারণেই এই ঝুঁকি।

উল্লেখ্য, মাটির নিচে পাথর ও অন্যান্য খনিজের বিশাল আকৃতির (শত বা হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ) খণ্ডগুলোকে প্লেট বলে। অনমনীয় এই প্লেটগুলো চলমান অবস্থায় থাকে। চলতে চলতে একটির সঙ্গে অন্যটির ঘর্ষণ বা সংঘর্ষের ফলে অনেক সময় ফাটল তৈরি হয়। মাটির নিচের ওই ঘর্ষণ বা ফাটল থেকে ভূপৃষ্ঠে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ২০১৬ সালের ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও মিয়ানমার টেকটনিক প্লেটের মাঝে বাংলাদেশের অবস্থান। এই প্লেট কয়েকশ’ বছর ধরে শক্তি সঞ্চয় করছে এবং গত একশ বছরে বাংলাদেশে বা আশপাশের অঞ্চলে বড় কোনো ভূমিকম্প হয়নি। তাই যেকোনো সময় হতে পারে ভূমিকম্প। যার মাত্রা হতে পারে রিখটার স্কেলে ৮-এর কাছাকাছি। ভারত-বার্মা প্লেটের ওপরে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের অবস্থান হওয়ায় সেখানে ঝুঁকির মাত্রা বেশি। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে সেসব এলাকা।

এদিকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) গবেষকরা বলছেন, কোনো এলাকায় সাধারণত একশ বা দেড়শ বছর পরপর ৭ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হতে পারে। সেই হিসাবে যেকোনো সময় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প বাংলাদেশে হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তারা জানান, ৮ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার শঙ্কা সাধারণত থাকে আড়াইশ বছর পরপর।

বুয়েটের গবেষকরা জানান, ১৮৭০ থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও মিয়ানমার টেকটনিক প্লেটের বিভিন্ন জায়গায় ছয়টি বড় ভূমিকম্প হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটির মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৫। আরেকটি হয়েছে ৮ দশমিক ৫ মাত্রার।

১৮৬৯ সালে ভারতের কুচবিহারে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়, ১৮৮৫ সালে পশ্চিমবঙ্গে হয় ৭ দশমিক ১ মাত্রার, ১৮৯৭ সালে ভারতের আসামে ৭ দশমিক ৭ মাত্রা, ১৯১৮ সালে বাংলাদেশের শ্রীমঙ্গলে ৭ দশমিক ৬ মাত্রার ও ১৯৩০ সালে আসামের ধুবরি জেলায় ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। ১৭৬২ সালে বার্মা যা বর্তমানে মিয়ানমার, এর আরাকানে ৮ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়।

কী ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতাভুক্ত এলাকায় ২০২২ সাল নাগাদ ২১ লাখের মতো পাকা ভবন রয়েছে বলে জানাচ্ছেন বুয়েটের ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদরা। এর মধ্যে বহুতল ভবন প্রায় সাত লাখ। তাদের হিসাবে, চট্টগ্রামে পাকা ভবন প্রায় চার লাখ, এর মধ্যে বহুতল ভবন প্রায় দেড় লাখ। সিলেটে দুই লাখের মতো পাকা ভবন, যার মধ্যে বহুতল ভবন এক লাখের বেশি। ভূতত্ত্ববিদদের শঙ্কা, যদি রিখটার স্কেলে ৭ বা ৮ এর কাছাকাছি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়, তাহলে রাজধানীর অধিকাংশ ভবন ধসে পড়বে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডক্টর সৈয়দ হুমায়ূন আখতার বলেন, ‘অবস্থানগত দিক থেকে ভূ-অভ্যন্তরের তিন প্লেটের মাঝখানে পড়েছে বাংলাদেশ। পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় মাটির নিচে একই রকম যে কাঠামো রয়েছে, সেই কাঠামো বলছে এই যে বিপুল পরিমাণ শক্তি হাজার বছর ধরে সঞ্চিত হয়ে থাকে, সেই শক্তিটা ৬০ থেকে ৮০ ভাগ একবারে বের হয়ে যায়। তার আগে কিছু মৃদু ভূমিকম্প হয়। এরপর মাঝখানে মেইন শক যেটাকে বলা হয় সেটাই বিপুল পরিমাণ শক্তি নিয়ে নির্গত হয়। পরবর্তীকালে কয়েক বছর ধরে ছোট ছোট ভূমিকম্প হতেই থাকে।’

তিনি বলেন, ‘সিলেটে আমরা যেটা জানি সব গ্যাসক্ষেত্র সেখানে। এরপর রয়েছে আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি। পাওয়ারপ্ল্যান্ট রয়েছে। যেগুলো একদম ভূমিকম্পের উৎসের ওপরে অবস্থিত। স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যায়, শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে এগুলোর অস্তিত্ব তখন আর থাকবে না।’

ফায়ার সার্ভিস বলছে, অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে। এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় মাটির নিচ দিয়ে সেবা সংস্থাগুলোর (গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ) বিভিন্ন লাইন গেছে। ভূমিকম্পের ফলে কোনো ভবন ধসে পড়লে সেসব সেবা লাইন উপড়ে যাবে। সেগুলো তখন জনজীবনের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন বলেন, ‘অনেকেই বলছেন ঢাকা শহরে যেকোনো সময় ভূমিকম্প অনুভূত হতে পারে। সেসব বিষয় মাথায় রেখেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি কিনেছি। জনবল প্রশিক্ষিত করা হচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন আমাদের জন্য ঝুঁকি। পুরান ঢাকার মতো যেসব সরু রাস্তা রয়েছে, কোনো ঘটনা ঘটলে সেসব জায়গায় পৌঁছানো কতটুকু সম্ভব হবে, তা এখনই চিন্তা করা উচিত।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও জলবায়ু সহনশীল বিভাগের অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, ‘শহর এলাকায় রেসকিউ অপারেশন চালানোর জন্য যে ধরনের দক্ষতা থাকতে হয় সে ধরনের দক্ষতা এখনো আমাদের নেই। তুলনামূলক অনেক কম। এর জন্য দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল নেই। রিস্কি অপারেশন করতে গিয়ে মানুষের যেন কোনো অঙ্গহানি না হয়, মানুষ যেন আরও বিপদের মুখোমুখি না হয়, সেগুলো খেয়াল রাখতে হয়।’

বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানলে উদ্ধারকাজ চালানো কঠিন হবে বলে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন।

(ঢাকাটাইমস/১৫ফেব্রুয়ারি/আরআর/আরকেএইচ)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
চেয়ারম্যানসহ ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক
রাত ২টায় মুখোমুখি হচ্ছে নেদারল্যান্ডস-জাপান
বিমানবন্দর না, শপিংমল থেকে গ্রেপ্তার হন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ
৮০তে পা রাখলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা