নগরজুড়ে মশার রাজত্ব: স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মানসিক চাপ বাড়ছে

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে মশার তীব্র উপদ্রবে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জমে থাকা পানি, জলাবদ্ধতা, অপরিষ্কার নর্দমা ও অস্বাভাবিক গরম আবহাওয়ার কারণে মশার সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। দিন-রাত মশার কামড়ে অতিষ্ঠ নগরবাসী শান্তিতে ঘুমাতেও পারছেন না। এতে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে বলে সতর্ক করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
রাজধানীর উত্তরা, মিরপুর, পল্লবী, রমনা, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, মগবাজার, ইস্কাটন, রাজাবাজার, সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জনসহ বিভিন্ন এলাকায় সন্ধ্যার পর মশার উপদ্রব চরম আকার ধারণ করছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঘর বন্ধ রাখলেও মশা ঢুকে পড়ছে; মশারি, কয়েল ও স্প্রে ব্যবহার করেও পুরোপুরি স্বস্তি মিলছে না। অনেকেই বলছেন, রাতের ঘুম এখন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতকাল স্বল্পস্থায়ী হওয়া, ড্রেন ও খাল নিয়মিত পরিষ্কার না হওয়া এবং শহরের বিভিন্ন উন্নয়নকাজে জমে থাকা পানি মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশনগুলোর সমন্বয়হীনতা ও কার্যক্রমে শিথিলতাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীতে মশার ঘনত্ব ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। নমুনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৫০ মিলিলিটার পানিতে জানুয়ারিতে গড়ে ৮৫০টি লার্ভা পাওয়া গেলেও ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৫০টিতে। একই সময়ে একজন মানুষের শরীরে প্রতি ঘণ্টায় মশার কামড়ের সংখ্যা ৪০০–৬০০ থেকে বেড়ে প্রায় সাড়ে ৮শতে পৌঁছেছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় বহু গুণ বেশি।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, রাজধানীতে বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশই কিউলেক্স প্রজাতির মশা, যা নর্দমা ও দূষিত পানিতে জন্মায় এবং ফাইলেরিয়া ও জাপানি এনসেফালাইটিসের ঝুঁকি তৈরি করে। পাশাপাশি বৃষ্টিপাত শুরু হলে এডিস মশার বিস্তার দ্রুত বাড়তে পারে, যা ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, চলতি মৌসুমে কিউলেক্স মশার উপদ্রব মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং বড় ধরনের বৃষ্টি না হলে পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক জি এম সাইফুর রহমান জানান, এ বছর ফেব্রুয়ারিতেই কিউলেক্সের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়া অস্বাভাবিক এবং তা কালবৈশাখী মৌসুম পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
নগরবাসীর অভিযোগ, সিটি করপোরেশন নিয়মিত ওষুধ ছিটানোর কথা বললেও বাস্তবে কার্যকর কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক এলাকায় উন্নয়নকাজ থেমে থাকায় ড্রেন ও খালে জমে থাকা পানি মশার প্রজননস্থলে পরিণত হয়েছে। এমনকি মেট্রোরেলের ভেতরেও মশার উপস্থিতি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা।
এদিকে মশার উপদ্রব বন্ধ ও উৎসস্থল ধ্বংসে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। সাত দিনের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে উচ্চ আদালতে রিট করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
গত এক দশকে মশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন প্রায় ১ হাজার ১২ কোটি টাকা ব্যয় করলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। চলতি অর্থবছরেও বিপুল বাজেট বরাদ্দ থাকলেও তার সুফল পাচ্ছেন না নাগরিকরা।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে এবং নগর পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা হবে। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, উন্নয়নকাজ দ্রুত শেষ করে মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কীটনাশক প্রয়োগ নয়, উৎসস্থল ধ্বংস, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নাগরিক সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তা না হলে সামনে বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
(ঢাকাটাইমস/২৮ ফেব্রুয়ারি/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































